নাইজেরিয়ায় কেন স্কুল শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনা ঘটে?

মুনশী নাঈম:

কয়েকদিন পরপরই বিশ্ব মিডিয়ায় খবর হয়, উত্তর নাইজেরিয়ায় স্কুল শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনা। কখনো একশ, কখনো দুইশ, কখনো তিনশ। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর থেকে এই পর্যন্ত নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলে শিক্ষার্থী অপহরণের কমপক্ষে ৬টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮০০ এর বেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের অপহরণ করা হয়। বারবার নাইজেরিয়ায় কেনো স্কুল শিক্ষার্থী-ই অপহৃত হয়? এই লেখায় এই প্রশ্নটিরই উত্তর খোঁজা হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দস্যুরাই এসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। বিশেষ করে নাইজার, কদুনা এবং জামফারা রাজ্যে। পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এসব দস্যুরা ফুলানি জাতিগোষ্ঠীর। যারা ঐতিহ্যগতভাবে যাযাবর; গবাদি পশুপালক হিসেবে কাজ করে।

কেউ কেউ বলছেন, এসব দস্যুরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল, কারণ তারা অনুভব করেছিল, নাইজেরিয়ান সরকার তাদের সম্প্রদায়কে বছরের পর বছর অবহেলা করেছে। কেউ কেউ বলেছেন, মুক্তিপণের অর্থ থেকে অর্থ উপার্জন করার জন্য তারা এই অপহরণ ঘটায়। কর্তৃপক্ষ বলছে, দস্যুরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার জন্য মুক্তিপণের অর্থের অর্থ ব্যবহার করেছে; যার মধ্যে কিছু অস্ত্র এখন নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের চেয়ে আরও ভয়ংকর।

নাইজেরিয়ার সাংবাদিক আবদুল আজিজ কয়েকজন দস্যুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। দস্যুরা স্বীকার করেছে, উত্তর-পশ্চিমে প্রত্যন্ত বনভূমিতে কয়েক ডজন ক্যাম্প স্থাপন করেছে। প্রত্যেকটিতে তাদের শত শত কর্মী রয়েছে।

উত্তর নাইজেরিয়ায় স্কুল অনেক কম। তাই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বাড়ি থেকে দূরে বোর্ডিং স্কুলে পাঠায়। অন্যদিকে নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনী অনেক কম সৈন্যকে সেই এলাকায় পোস্ট করেছে। দস্যুরা বুঝতে পারে যে শিশুদের গণ অপহরণ করলে কর্তৃপক্ষের ওপর মুক্তিপণ দেয়ার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা যায়। তাই একে অর্থ অর্জনের নিশ্চিত উপায় বলে তারা ধরে নেয়।

নাইজার রাজ্যের সালিহু ট্যাঙ্কো ইসলামিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুবকর আহসান বলেন, শিশুদের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ৩০ মিলিয়ন নায়রা (প্রায় ৭৩০০০ ডলার) এর বেশি অর্থ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ অর্থ দিয়েছে পরিবার। বাকিগুলো মাদরাসার জমি ‍বিক্রি করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং নাইজেরিয়ার গোপন পুলিশ স্টেট সার্ভিস বিভাগের প্রাক্তন কর্মকর্তা ওলুওয়াসেই আদেতাও বলেন, দস্যুরা শিশুদের অপহরণ করাকে অনেক লাভজনক বলে মনে করেছে। তাদের জীবনে যা তারা কল্পনা করতে পারে তার চেয়েও বেশি অর্থ তাদেরকে প্রদান করা হয়েছে।

তবে এসব ঘটনা বন্ধ করতে সরকারের কোনও কৌশল আছে বলেও মনে হয় না। সরকার বলেছে যে তারা অপরাধীদের সাথে কোন আলোচনায় বসবে না। জামফারা রাজ্যের আইনপ্রণেতারা পরামর্শ দিয়েছেন যে, যেসব অপহরণকারী অনুতপ্ত তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা করে, তাদের আর্থিক উপার্জনের জন্য টেকসই সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এটি একটি বিতর্কিত কৌশল কিন্তু নাইজার ডেল্টা এর কিছু ইতিবাচক ফল পেয়েছে। ২০০৯ সালে সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির পরে সেখানে অপরাধ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

অপহরণ রুখতে “নিরাপদ স্কুল উদ্যোগ” কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। এর আওতায় নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্কুলগুলোর আশেপাশে বেড়া তৈরি করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তিন বছরের এই প্রকল্পের জন্য অন্তত দুই কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যাতে সহায়তা দিয়েছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন। এই স্কিমের অংশ হিসাবে অনেকগুলো কন্টেইনারে স্কুল তৈরি করে অস্থায়ীভাবে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কোনও বেড়া দেয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

সূত্র: বিবিসি, ডেইলি ট্রাস্ট

আগের সংবাদদেড় বছর পর স্কুল-কলেজে পাঠদান শুরু
পরবর্তি সংবাদবিজিবির প্রতিবাদে স্থাপনা সরিয়ে নিলো বিএসএফ