নোয়াখালী দাঙ্গার মিথ : ঐতিহাসিক মিথ্যাচার সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন?

সালাহউদ্দীন আহসান

নোয়াখালী দাঙ্গা অর্থ কী?

নোয়াখালী দাঙ্গা বা রায়ট অর্থ, দ্বিপক্ষীয় ধর্মভিত্তিক ও দেশীয় রাজনৈতিক এক বিশেষ মহাযজ্ঞ বা গণরণ কাহিনি। এই কাহিনির রূপকার ব্রিটিশ ভারতের উগ্র হিন্দু এলিট সমাজ। খুবই বাস্তব সত্য হলো, নোয়াখালী দাঙ্গা কাহিনি রূপায়ন ছিল বিশেষভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ কাহিনির বর্ণনা, এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং নোয়াখালী দাঙ্গার স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস পাবো এ প্রবন্ধে।

প্রচলিত ঘটনা

গণমাধ্যম ও লোকমুখে প্রচলিত আছে, বিংশশতাব্দীর মাঝে কলকাতা দাঙ্গার কিছুদিন পর অবিভক্ত নোয়াখালী ও অবিভক্ত ত্রিপুরায় মুসলিমজনতা কর্তৃক হিন্দুদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। যা ভারতবর্ষ স্বাধীনতার একবছর পূর্বে ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর সূচিত হয়ে প্রায় একমাস যাবত চলতে থাকে। অনুমান করা হয়, এতে প্রায় ৫,০০০ হিন্দু নিহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হয় এবং হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হয়।

মূল এই কাহিনির ভেতর দিয়ে জট বেঁধেছে আরও নানা কাহিনি। এগুলো এ পরিমাণ চর্বিত চর্বণ হয়েছে যে, এখন সহসাই কাউকে বিশ্বাস করানোই দায় হবে– নোয়াখালী দাঙ্গা আসলে কোনো এককদাঙ্গা নয়; এককদাঙ্গা হিসেবে যা বলা হয় কেবলই একটি মিথ বা কল্পিত আখ্যান। যাকে অন্য ভাষায় বলা যায় ‘প্রোপাগান্ডা’।

যেহেতু এটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তাই কাহিনিকারগণ যথেষ্ট প্রকারে ভয়ার্ত ও নৃশংসরূপে ঘটনার ঘনঘটা তৈরি করেছেন। মুসলিম জাতির প্রতি জিঘাংসা ও বিদ্বেষ রচনার প্রয়াস হিসেবে তারা নিজেদের চিরায়ত চরিত্রগুলো মুসলিমদের উপর লেপে দিয়ে রাজনৈতিক অবক্ষয়কে চূড়ান্তভাবে ডেকে এনেছেন। জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে পরিবেশ ভারি করেছে্ন। এ কারণে আজও পর্যন্ত দু’বাংলার উগ্র হিন্দুত্ববাদী, নরম হিন্দুত্ববাদী এমনকি স্যাকুলাররাও পর্যন্ত এটি নিয়ে সরব। তাই এর পেছনের কারণ ও তথ্যতত্ত্ব নিরীক্ষণ অতীব জরুরী হয়ে উঠেছে বৈকি!

পেছন ফিরে দেখি

ব্রিটিশরা তাদের ক্ষমতার শেষদিকে যখন বিপ্লবীদের (প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদের পরবর্তীতে, মুসলিম-হিন্দু সমন্বিত) তৎপরতা অবলোকন করল তারা ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়ে। সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ভারতকে দ্বিধাবিভক্ত করার প্রয়াসে মেতে ওঠে। হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির বিভাজনকে পুঁজি করে তারা হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে দ্বিপক্ষীয় বিদ্বেষের বীজ বুনে দেয়। যা সময়ে সময়ে বিশালাকার দাঙ্গায় রূপ নিতে থাকে। যদিও এরও আগ থেকে মুসলিম-হিন্দু সম্পর্ক খুব একটা সুবিধের ছিল–বলা যায় না।

মুসলিম-হিন্দু দ্বন্দ্বের হেতু

আসলে আরব, তুরস্ক, ইরান-তুরান প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের অাগমন শুরু হয় মধ্যযুগে। এ দেশকে তারা নিজের দেশ মনে করে দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবেসেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা এ দেশের হিন্দুদের সাথে পাশাপাশি বাস করে এলেও উভয়ের মধ্যে সবসময় একটা দূরত্ব বজায় ছিল। কারণ, এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্ম বিশ্বাস ও সমাজবিধান সম্পূর্ণ বিপরীত।

হিন্দু মুসলমানের বিরোধ ও সংঘর্ষের মূল কারণ প্রধানত রাজনৈতিক তাতে সন্দেহ নেই। এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হিন্দুরা ধর্মের নামে স্বজাতিকে ডাক দিয়েছে, প্রতিপক্ষকে ধর্ম বিনষ্টকারী, পরস্বার্থ অপহরণকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মুসলমানদের নারী ধর্ষণকারী, প্রতিমা ও মন্দির ধ্বংসকারী বলে চিহ্নিত করে স্বজাতির মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে। হিন্দুদের লেলিয়ে দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে অগুণিত মুসলিমদের।

হিন্দুত্ববাদকর্তৃক মুসলিম নিপীড়ন

বিশেষত মুসলিম শাসনের অবসান ও বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর, উপমহাদেশে মুসলমানদের উপর ধেয়ে আসে হিন্দুত্ববাদের সীমাহীন অত্যাচারের খড়গ কৃপাণ। মুসলিমদের অস্তিত্বই ছিল তাদের অসহনীয় ব্যাপার। তথাপি ভারতীয় মুসলমানরা যখন হিন্দুদের তাবেদারী না করে মুসলিম ঐতিহ্য ও তমদ্দুন প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে শুরু করেছে, তখন থেকেই এবং আরো খোলাশা করে বলা যায় মুসলমানদের স্থায়ী দাস তথা শুদ্র বানাবার ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্তের ফন্দি ফিকির যখন ফাঁস হয়ে যেতে লাগল, তখনই চক্রান্তকারী হিন্দুরা মুসলমানদের ওপর শুরু করলো পাশবিক নির্যাতন।

সাহিত্য যখন বিষবৃক্ষ

১৭৫৭ সালে সিরাজ-উদ-দৌলার পতন থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল চরম দুর্দিন। হিন্দু ও ইংরেজদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে ধরাপৃষ্ঠ থেকে মুসলমানদের উৎখাত করার সর্ব প্রকার চেষ্টা ও কৌশল আবলম্বন করা হয়। সে কৌশলের অন্যতম উপায় হিসাবে হিন্দু কবিগণ তাদের সাহিত্য ইসলাম ও মুসলমানদের কাল্পনিক কুৎসা রটনায় ভরপুর করে ফেলেন। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রংগলাল বন্দোপধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দোপধ্যায়, নবীন চন্দ্র এবং সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে ছোট-বড় সকল হিন্দু কবি সাহিত্যিক ইসলাম ও মুসলমানদের চরিত্র বিকৃত করণকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।

আবদুল মওদূদের ভাষ্যমতে, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের আটটি উপন্যাসে ইতিহাসের রঙ আছে কিন্তু ইতিহাস নেই। এই উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘রাজসিংহ’ ও ‘আনন্দমঠকে’ বলা যায় বঙ্কিমের উৎকট সাম্প্রদায়িক মন মানসের অতি জঘন্য অভিব্যক্তি। এই দুটিতে তিনি মুসলমান বিদ্বেষের যে বিষবহ্নি উদগীরণ করেছেন, সে বিষজ্বালায় এই বিরাট উপমহাদেশের দুটি বৃহৎ সম্প্রদায়ের মধ্যে যেটুকু সম্প্রীতির ফল্গুধারা প্রবাহিত ছিল, তা নিঃশেষে শুষ্ক ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’

বঙ্কিম তার আনন্দ মঠ, দুর্গেশনন্দিনী দেবী চৌধুরানী প্রভৃতি উপন্যাসগুলোতে মুসলমান কর্তৃক ‘হিন্দু মন্দির ধ্বংস’, ‘হিন্দু নারী ধর্ষণ’ প্রভৃতি উক্তির দ্বারা হিন্দু জাতির প্রতিহিংসার বহ্নি প্রজ্বলিতই করেছে। এর ফলে সৃষ্ট হিংসা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে হিন্দুরা মুসলমানের সাথে বিরোধের ছল ছুঁতো তালাশ করতো। উপমহাদেশে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধাবার ছুঁতো হিসেবে গরুকে হিন্দুর উপাস্য ও দেবতার আসনে স্থান দেয়া হয়। অতঃপর ‘গো হত্যা-নিবারণ সমিতি, ‘গোরক্ষিণী সমিতি ’প্রভৃতি স্থাপন করে মুসলমাসনদের সাথে কুরবানিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত করা হয়।
দাঙ্গা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানারকম মিথ্যা অপপ্রচার ও ছুঁতো তৈরিতে লিপ্ত ছিল একটি বিশেষ হিন্দু কবি সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক মহল। এরই ফলে কয়েক বছর অন্তর অন্তর ঘটে যেত দাঙ্গার ভয়ানক রূপ।

হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের অন্য ধাপ

‘গোটাদেশে নতুন করে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ শুরু হয় মূলতানে ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহরমের উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘটা দাঙ্গার মাধ্যমে। ১৯২৩ সালে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় সাহারানপুরে। এখানে নিহত হয় তিনশতের অধিক। পরবর্তী বছরে আঠারোটি দাঙ্গা-হাঙ্গামায় ৮৬ জন নিহত এবং ৭৭৬ জন আহত হয়। চরম সংঘর্ষ ঘটে কোহাটে। জনৈক হিন্দু কর্তৃক ইসলামবিরোধী কবিতা প্রকাশনাই এর মূল কারণ। দুইদিন ধরে সে দাঙ্গা চলে, তাতে ৩৬ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়। পরের বছর ১৯২৫ সালে অবস্থা কিছুটা শান্ত হলেও ১৯২৬ সালে আবার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। এ বছর সারা দেশে মোট ৩৬টি দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। যার ফলে ২ হাজার লোক নিহত হয়। এ বছর দাঙ্গার সূত্রপাত হয় কলকাতা শহর থেকে মসজিদের সামনে হিন্দুদের বাদ্য বাজনাকে কেন্দ্র করে। এ দাঙ্গায় ১৫০টি অগ্নিসংযোগ ঘটে এবং হতাহতের সংখ্যা দাঁড়ায় চৌদ্দশ।

১৯২৭ সালে একত্রিশটি দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং হতাহতের সংখ্যা ১ হাজার ৬০০। নিহতের সংখ্যা একশত চল্লিশ। ১৯২৮ সালে অবস্থা কিছুটা প্রশমিত হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বোম্বাই শহরে দাঙ্গা সংঘঠিত হয় যার ফলে হতাহতের সংখ্যা দাঁড়ায় এগারশ’তে। ১৯৩১ সালে কানপুরে প্রচণ্ড দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হয় এবং তিন দিন ধরে হত্যা, লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। জনৈক হিন্দু হত্যাকারীর সম্মানে বলপূর্বক দোকান পাঠ বন্ধ করতে গিয়ে হিন্দু মুসলিম সংঘর্ষ শুরু হয়। এ দাঙ্গায় চার কি পাঁচশ’ লোক নিহত হয়। বহু সংখ্যক মসজিদ মন্দির ধ্বংস করা হয় এবং বহু ঘরবাড়ি অগ্নিদগ্ধ হয়।” (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস- পৃঃ-১৩২ -৩৩; আব্বাস আলী খান)।

১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন চলাকালীন সারা ভারতে হিন্দু ধর্ম পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ‘ শিবাজী উৎসব’ পালন করা হয়। সকল হিন্দু সমাজ নেতা, রাজনীতিবীদ কবি, সাহিত্যিক এ উৎসবে সানন্দে যোগদান করেন। আর এভাবেই রাজনীতি ও হিন্দু ধর্ম পুনরুজ্জীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে গেল। মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দু মানসিকতা এমন অবস্থায় পৌঁছল যে, এশিয়াটিক রিভিউ পত্রিকার প্যাট্রিক ফ্যাগান তাঁর এক প্রবন্ধে লিখলেন, পরাধীন ভারতে মুসলমানদের দুটি মাত্র পথ খোলা আছে, একটি হিন্দু জাতিতে লীন হয়ে যাওয়া, অন্যটি দৈহিক শক্তি বলে ভারতের কোন এক অঞ্চলে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসৃষ্টি করা। অবশেষে ভারতের দশ কোটি মুসলমানদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠার প্রাণপণ সংগ্রাম ব্যতিত আর কোন পথ থাকল না।

কলকাতা মুসলিম নিধন

ভারতে বৃটিশ শাসনের বিষাদময় শেষ মাসগুলোতে যে রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ ঘটে ছিল সে সবের বর্ণনা দিয়েছেন জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস টুকার তাঁর While Memory serves নামক বইতে। বইখানার তিনটি অধ্যায়ে যথা ‘কলিকাতার ভয়ানক গণহত্যা’ (আগস্ট, ১৯৪৬), ‘বিহারে নিষ্ঠুর মুসলিম গণহত্যা’ (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৮৬) যে বিবরণ এসেছে তাতে আঁতকে উঠতে হয়।

তিনি এক জায়গায় লিখেন, ‘কলিকাতার অপরাধ জগতের লোকদের হাতে ক্ষমতা চলে গেল।… বাজার গুলো মরা মানুষে ভরে গেল। একটি কক্ষে ছিল পনেরটি লাশ এবং বাকী বারটিতে…. আমরা জীবন্ত দুটি শিশু উদ্ধার করলাম, উভয়টি ছিল আঘাত প্রাপ্ত যার একটি ইতোমধ্যে গ্রাংগ্রিণ আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তারা ছিল আধা পাগল অবস্থায়। শহরের আধিকাংশ মৃতের দূরতম ধারনা ছিল না যে তাদের কি ঘটতে যাচ্ছিল। কলিকাতার এ ঘটনায় চার হাজার মুসলমান ও হিন্দু নিহত হয়।’

কলকাতার এ ভয়ঙ্কর নরহত্যা ও ধ্বংসলীলার বিবরণ দিয়ে স্টিফেনস লিখেছেন, শ্যামপুর ও এর পার্শবর্তী অঞ্চলে মানুষের মৃত দেহের স্তুপ নিকটবর্তী বাড়িগুলোর দোতলার মেঝ বরাবর উঁচু হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর হিসাব মতে প্রায় ৫০,০০০ লোক হতাহত হয়েছিল। মেননের মতে ৫০০০০ নিহত ও ১৫০০০ আহত হয়েছিল। স্টেটসম্যানের হিসাব অনুযায়ী হতাহতের সংখ্যা ২০,০০০ কিংবা কিছু বেশি ছিল।

কলকাতা নিধনের ডাটাবেজ নোয়াখালি দাঙ্গায় উপস্থাপন

কলকাতায় মুসলমানদের হত্যার খবর পূর্ববাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অক্টোবর মাসে নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলায় মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এতে ভয় পেয়ে হিন্দুগণ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে কলকাতার হিন্দু সংবাদপত্রগুলো ও রিপোর্টারগণ ঘটনাস্থলে না গিয়েই তাদের স্বভাবজাত মুসলমান কর্তৃক হিন্দু হত্যার অতিরঞ্জিত খবর সরবরাহ করতে থাকে। পূর্বেকার মত কাহিনি রচনা করতে থাকে। প্রচার করতে থাকে মুসলিম কর্তৃক মন্দির ধ্বংসীকরণ, হাজার হাজার নারী ধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের মত বানোয়াট তথ্য। এর উদ্দেশ্য ছিল দাঙ্গাকে আরও বেগবান করা। ফলশ্রুতিতে নোয়াখালি দাঙ্গার মিথকে ভিত্তি করে হিন্দু সম্প্রদায় উন্মত্ত হয়ে মেতে ওঠে বিহার মুসলিম নিধনযজ্ঞে। যার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাসের রক্তলাল পাতাগুলো।

নোয়াখালি ও ত্রিপুরায় সংঘর্ষ একেবারেই হয়নি তা নয়। যা হয়েছিল সেটা কলকাতা দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট এক সংঘর্ষ। কেননা সরকারি হিসাব থেকে জানা যায়, নোয়াখালীতে ২২০ জন এবং ত্রিপুরায় ৬৫ জন নিহত হয়।

এই নোয়াখালী গোলযোগের ঘটনাকে কলকাতা দাঙ্গার সাথে গুলিয়ে হিন্দুত্ববাদী সমাজই তৈরী করেছে নোয়াখালী দাঙ্গা নামের এক ভয়ানক মিথ।

উপসংহার

মূলত নোয়াখালীতে যা হয়েছিলো তা যে দাঙ্গা ছিলো না, উপরে স্পষ্ট হয়েছে। এটা একটা মিথ, যা তৈরি হয়েছিল কলকাতার হিন্দু সংবাদপত্র ও রিপোর্টারগণের ঘটনাস্থলে না গিয়েই তাদের স্বভাবজাত অতিরঞ্জিত খবর সরবরাহের কারণে। নোয়াখালীর হিন্দুদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়নি। বরং তারা নিজেরাই কলকাতায় মুসলমানদের ওপর তাদের স্বজাতির হিংস্রতা দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল এবং নিজেদের উদ্যোগেই ঘরবাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল। সুতরাং কলকাতা দাঙ্গার সাথে নোয়াখালীর হিন্দুদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে ঠিক, কিন্তু এটাকে ‘নোয়াখালী দাঙ্গা’ -যার উদগাতা মুসলিমরা- বলে চালিয়ে দেয়া যায় না।

আগের সংবাদবাংলা সাহিত্যে দেশবিভাগ : যেভাবে চিত্রায়িত হয়েছে
পরবর্তি সংবাদআগামী দু’মাস ব্রাজিলে আগুন জ্বালানো বন্ধ