
রাকিবুল হাসান
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলার পূর্বে সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট ৮৭ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার লিখে গিয়েছিল। ইশতেহারের শিরোনাম : নতুন সমাজের দিকে পদযাত্রা। ইউরোপীয় পত্রিকাগুলো এই ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘টারান্টের ম্যানিফেস্টো’। অস্ট্রেলিয়ান এই শ্বেতাঙ্গ তার ইশতেহারে পরবর্তী শ্বেতাঙ্গদের জন্য একটা পথরেখা এঁকে দিয়ে গেছে। বরং এঁকে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, নিজে করে পর্যন্ত দেখিয়ে দিয়ে গেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো ইউরোপ। নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের ব্যর্থতার পর গণতন্ত্রণকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো সাদরে। বর্ণবাদকে কেন্দ্র করে ধ্বংসযজ্ঞ বিভিষিকা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতেই তখন গঠিত হয়েছিলো ‘জাতিসংঘ’। কিন্ত এই বিংশ শতাব্দীতে এসে, সেই বর্ণবাদ-ই আবার হাওয়ায় হাওয়ায় উসকে দিচ্ছে শ্বেতাঙ্গরা। বর্ণবাদী বক্তব্য দিয়ে হোয়াইট হাউসে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সবশেষে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী টারান্টের ইশতেহার, দুটি মসজিদে নামাজরত ৫০ জন মুসল্লিকে হত্যা—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বর্ণবাদবিরোধী চিন্তার ওপর বিশাল আঘাত নিঃসন্দেহে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন, জনপ্রিয় বক্তৃতা এখন ইউরোপের মনস্তত্ত্বে একটা বিশাল জায়গা করে নিচ্ছে। এইসব বক্তৃতায় যেমন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে, তেমনি সিরিয়া বিপ্লবের পর ইউরোপীয় ইউনিউনের দেশগুলো বিশেষ করে জার্মান যে অভিবাসন নীতি গ্রহণ করেছিলো, সেসব নীতির বৈরিতাও প্রাধান্য পাচ্ছে। ৮৭ পৃষ্ঠার ইশতেহারে টারান্ট অভিবাসন নির্মূল করার আহবান জানিয়ে গেছে শ্বেতাঙ্গদের। নইলে সামনে তাদের গোলাম হয়ে বাঁচতে হবে—এই হুমকিও দিয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্ণবাদের পক্ষে কথা বলা খানিকটা থামলেও টারান্ট চেয়েছে এটা আবার উচ্চকিত হোক। এবং সেই উচ্চকিত করার কাজটা শুরু করেছে সে নিজেই।
টারান্টের ইশতেহার আসলে শ্বেতাঙ্গদের জাগ্রত করার এক মহামন্ত্র। এখানে সে ইউরোপের রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেছে। যারা শ্বেতাঙ্গ নয়, তাদের কেন ইউরোপ থেকে বের করে দেয়া উচিত, তা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে।
শ্বেতাঙ্গবাদ না উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা?
‘এটি জন্ম হার’
‘এটি জন্ম হার’
‘এটি জন্ম হার’
এই একটি কথা তিনবার উচ্চারণ করে ইশতেহার লেখা শুরু করেছে টারান্ট। তার আশঙ্কার জয়গাটি হচ্ছে—শ্বেতাঙ্গদের জন্মহার কমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে অন্য বর্ণ ও অভিবাসীদের জন্ম হার। সে লিখেছে, ‘জন্মহার বদলে গেছে। এমনকি যদি আগামিকাল সমস্ত নন-ইউরোপীয়ানদের বের করে দেয়া হয়, তাহলে ইউরোপীয়ানদের খুঁজে পাওয়া যাবে না অথবা তারা মারা যাবে। প্রতিদিন আমরা কমছি, তারা বাড়ছে। আমাদের দেশে আমাদের বিকল্প হয়ে উঠছে তারা। তারা আমাদের চাকরী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ভূৃমি সব দখল করে নিচ্ছে। গণ অভিবাসন এর জন্য দায়ী।’ টারান্ট এই অভিবাসনকে ‘শ্বেতাঙ্গ জেনোসাইড’ বলেও অভিহিত করেছে।
এই চিন্তাটা যে টারান্টই প্রথম করেছে এমন নয়, বরং ইউরোপীয় রেঁনেসার সময় থেকেই শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাটি তারা লালন করে আসছে। কারণ ইউরোপে তারাই ছিল একমাত্র অাধুনিক উদ্ভাবন সক্ষম জাতি। ফলে ইউরোপ এবং শ্বেতাঙ্গ দুটো এক জিনিস হিসেবেই দেখা হতো। এই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিক্রিয়ায় শ্বেতাঙ্গদের ভেতর জন্ম নেয় ইউরোপীয় অহংবোধ। ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই তারা মাপতে শুরু করে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান। আল জেরিয়ার দর্শনের শিক্ষক তাইয়েব বাওআযা বিষয়টি একটু স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ ‘শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপকে এক জিনিস হিসেবে দেখার চিন্তাটা ইউরোপের মনস্তত্ত্বে গেঁথে গেছে। এটা একটা অাধিপত্যবাদী চিন্তা। সবসময় শ্রেষ্ঠত্বের অহংবোধকে কেন্দ্র করেই এই চিন্তাটা ঘুরপাক খায়।’
আঠারো-উনিশ শতক থেকেই শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাটি প্রসারিত হয়। এই ধারণাটি ফরাসী জোসেফ অর্থারের ‘জাতিগত বৈষম্যের অনুসন্ধান ‘ গবেষণাপত্রটির মাধ্যমে একটা বৈশ্বিক রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করে। গবেষণা পেপারটিতে বিভিন্ন জাতির ভাগ দেখানো হয় এবং শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে জোসেফ অর্থারের এই গবেষণাপত্রের অনুকরণেই ইউরোপের অন্যান্য গ্রন্থগুলো লেখা হয়। যেমন ইংল্যান্ডের হিউস্টন স্টুয়ার্ট শমরলিন এবং জার্মানের লুডভিগ ভোল্টম্যান লিখেছিলেন। শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার ছিলেন এডলফ হিটলার। ইউরোপের অন্যান্য জাতিগুলোর ওপর শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে নৎসি বাহিনীকে উৎসাহিত করেছিলেন সমস্ত ইউরোপে আক্রমণ করার জন্য। ফলশ্রুতিতে সংগঠিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
শুধু জাতি হিসেবে শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণেই থেমে থাকে না কার্যক্রম। বরং শ্বেতাঙ্গরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক নেতৃত্বও অর্জন করতে চায়। এই ইচ্ছে থেকেই তারা সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর হস্তক্ষেপ করে। বিশেষ করে নৃতত্ত্ব ও প্রাচ্যবাদের ওপর। এওয়ার্ড সাঈদ তার ‘প্রাচ্যবাদ’ ও ‘সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদ’ গ্রন্থ দুটিতে বলেছেন, ‘প্রাচ্যবাদ শুধু প্রচ্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকেই মনোযোগী না, বরং প্রাচ্য এবং প্রাচ্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় কেন্দ্রীকরণের একটা ধূর্ত ষড়যন্ত্রের দিকেও মনোযোগী।’
ইউরোপীয়করণের এই চিন্তাটিই ছড়াতে চেয়েছে টারান্ট। যদিও ইউরোপীয়করণ করতে গিয়ে অন্য জাতিদের হত্যা করতে হয়, তবুও প্রস্তুত।
টারান্ট লিখেছে, ‘চাইনিজ হান জার্মানির মাটিতে জন্মগ্রহণ করে জার্মানি হতে চাওয়াটা পাগলের চিন্তা। যেমন জার্মানের কেউ যদি মঙ্গলগ্রহে জন্মগ্রহণ করে, তাকে মঙ্গলগ্রহী বলা যেমন পাগলের প্রলাপ। ইউরোপ ইউরোপ-ই। সংস্কৃতি, ভাষা, বর্ণ সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। যতদিন নন-ইউরোপীয়দের ইউরোপের একটি অংশ হিসেবেও গণ্য করা হয়, ততদিন ইউরোপ শুধু ইউরোপীয়দের হবে না।’
আরেকটু স্পষ্ট করে টারান্ট ইশতেহারের প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখেছে, যদি কেউ প্রশ্ন করে ‘তোমার দৃষ্টিতে শ্বেতাঙ্গ কে?’ উত্তর হবে—সংস্কৃতি ও জাতিগতভাবে যারা ইউরোপীয়ান। যদি জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে শ্বেতাঙ্গ নয় কারা?’। উত্তর হবে—সংস্কৃতি ও জাতিগতভাবে যারা ইউরোপীয়ান নয়।
লোকটি শুধুই শ্বেতাঙ্গ, নাকি নেকড়ে?
সাধারণ একজন শ্বেতাঙ্গ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছে টারান্ট। কিন্তু তার মধ্যে ও অন্যান্য শ্বেতাঙ্গের মধ্যে পার্থক্য হলো—সে তার জাতির নিরাপদ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মতে, অভিবাসীদের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে ইউরোপে, সে সম্পর্কে শ্বেতাঙ্গরা ওয়াকিব নয়। সে তাদের জাগাতে চাইছে, জানাতে চাইছে। খৃস্টান, রক্ষণশীল এবং অন্যান্যদের কাছে কিছু বার্তাও পাঠিয়েছে টারান্ট। তার বার্তা থেকেই প্রমাণিত, ইউরোপীয় সভ্যতায় খৃস্টানদেরও মিশ্রণ আছে। যদিও তাকে ‘আপনি কি খৃস্টান?’ জিজ্ঞেস করার পর হ্যা বা না বলে কোন উত্তর দেয়নি। বরং বলেছে, ‘ইটস কমপ্লিকেটেড। আমি জানলে জানিয়ে দিবো।’ কিন্তু এরপরই যখন জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি জাতীয়তাবাদী? কোন চিন্তা না করেই সরাসরি বলে দিলো, ‘হ্যা। আমি চূড়ান্ত পর্যায়ের জাতীয়তাবাদী।’
নন-ইউরোপীয়দের ইউরোপ থেকে তাড়ানোটাই ছিলো টারান্টের সর্বপ্রধান উদ্দেশ্য। অভিবাসীদের সে অভিহিত করতো ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে। এ বিষয়ে সে নিজেকে মনে করতো একাই একশো। রাজনৈতিক কোন দলের সাহায্য কিংবা সমর্থন কোনটাই চায়নি কিংবা নেয়নি। সে প্রমাণ করতে চেয়েছে—একাই প্রভাব ফেলতে সক্ষম। আক্রমণে আগ্নেয়াস্ত্র কেন ব্যবহার করবে, এর উত্তরে সে বলেছে, যেন জনগণের মাঝে আলোচনা হয়। আলোচনার জন্ম দেবার জন্যই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। মূলত এমন একটা ব্যথা দিতে চেয়েছে অভিবাসীদের, যার প্রভাব কয়েকবছর থাকবে।
ইউরোপীয় সংস্কৃতি এবং ভূমি রক্ষায় নিজেকে ইউরোপবাসীদের প্রতিনিধি মনে করতো টারান্ট। প্রশ্নোত্তরে সে বলেছে, ‘আমি মুসলিমদের ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা করি না। তবে যারা বাইরে থেকে এসে এখানে থেকে যেতে চায়, তাদের ঘৃণা করি। সেইসব ইউরোপীয় মুসলিমদেরও ঘৃণা করি, যারা ধর্ম বদলে মুসলিম হয়েছে। অন্য সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে।’
অভিবাসীদের ওপর এত ক্ষোভ তার, প্রশ্ন উঠবে—সে নিজেই তো অস্ট্রেলিয়ান। তাহলে নিউজিল্যান্ডের ভূমিতে সে-ও অভিবাসী। এর উত্তরে টারান্ট বলেছে, ‘নিউজিল্যান্ড হচ্ছে ইউরোপের হাতের আঙুল। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, রক্ত সব এক। সুতরাং আমার দ্বারা নিউজিল্যান্ডের কোন সংস্কৃতি পরিবর্তন হবার নয়। আঙুল কখনো হাতের বাইরের কিছু?’
কতটা বর্ণবাদী, জাতীয়তাবাদী—ইশতেহারের লাইনে লাইনে প্রকাশ করেছে তার। স্পষ্ট বলেছে সে, ‘আমি কট্টর জাতীয়তাবাদী। অভিবাসীদের অন্যরা ক্ষমা করতে পারলেও আমি ক্ষমা করতে পারবো না।
টারান্টের বার্তা, রক্ষণশীলদের প্রতি
টারান্ট মনে করে এই রক্ষণশীলরাই সব ধ্বংস করছে। তাই সে প্রশ্ন তুলে বলেছে, ‘রক্ষণশীলরা কী রক্ষণ করছে? ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করছে। জাতিগত স্বায়ত্তশাসন নষ্ট করছে অভিবাসীদের অল্প বেতনে চাকরী দিয়ে। ধর্ম নষ্ট করছে ফতওয়া দিয়ে। কী দোষ বিবাহ বিচ্ছেদে? তারা রক্ষা করছে কী? বরং ইউরোপীয়রা এখন সঙ্কটে পড়ে গেছে। ভাষা, সংস্কৃতি বাইরের লোকদের মিশেলে জগাখিচুরী হয়ে যাচ্ছে।’
খৃস্টানদের প্রতি
টারান্ট মনে করে খৃস্টানরা অন্যান্য জাতির সাথে সমতার কথা বলার জন্য উদগ্রীব। তাই সে তাদের অাভিজাত্যবোধ জাগিয়ে তুলতে বলে, ‘আমার ভাই ও বোনেরা, আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত। এই শতাব্দীতে বাইতুল মুকাদ্দাসকে খালি পড়ে থাকতে দেখছি। অনুতাপের আগুনে পবিত্র যুদ্ধের মশাল জ্বালাও। আমাদের জীবন মৃত্যু থেকে শক্তিশালী হোক। যেন আমরা খৃস্টান জাতির শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি।’
মার্কস ও কমিউনিস্টদের প্রতি
মার্কসবাদীরাও রক্ষা পায়নি টারান্টের আক্রমণ থেকে। জাতীয়বাদ থেকে চোখ ফিরিয়ে সমতার কথা বলার জন্য টারান্ট তাদেরকে বোকা বলে তিরস্কার করেছে। বলেছে, ‘আমার পাশে কিংবা চোখের সামনে তোমাদের দেখতে চাই না। বরং চাই তেমাদের মাথা থাকুক আমার পায়ের নীচে।’
তুর্কীদের প্রতি
টারান্ট হুমকি দিয়ে বলেছে, ‘বসফরাসের পূর্বে এশিয়া মহাদেশে তারা যেতে পারে। যদি বসফরাসের পশ্চিমে ইউরোপ মহাদেশে আসে, তাহলে হত্যা করা হবে।’ ইউরোপ এবং উসমানী খেলাফতের মধ্যে প্রাচীন ক্রসেডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, আমরা অচিরেই কনস্টান্টিনোপল আসছি। শহরের সব মসজিদ, মিনার ভেঙে দিবো। হায়া সুফিয়া মিনার মুক্ত হবে। কনস্টান্টিনোপল খৃষ্টানদের হাতে ফিরে আসবে, এককালে যার মালিকানাধীন তারাই ছিল।’
ইউরোপীয় সমাজও টারান্টের সমালোচনা থেকে রেহাই পায়নি। ইউরোপের উত্তর অধুনিক সমাজ এবং আরাম আয়েশে বসবাস করা ইউরোপীয় যুবকদের, যারা সংস্কৃতির ধারক বলে অনুসরণ করছে মাইকেল জ্যাকসন, মেরাডোনা এবং কুর্ত কুবিনকে, তাদের সমালোচনা করেছে। শুধু এই অনুসরণকে সে ‘মোহ’ বলে অভিহিত করেছে। এই মোহ শক্তি না। শক্তি হলো ইউরোপীয় জাতিগুলোর এক হয়ে থাকা। অন্য সংস্কৃতির অভিবাসীদের ভাগিয়ে শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতির জোয়ার ফিরিয়ে আনা।
এজন্যই টারান্ট ট্রাম্পের প্রসঙ্গ টানতে ভুলে যায়নি। ট্রাম্প কিন্তু অভিবাসী বিরোধী বক্তব্য দিয়েই হোয়াইট হাউসে এসেছিলো। ট্রাম্প কেমন, এই প্রশ্নের উত্তরে টারান্ট বলেছে, ‘রাজনীতির দিক দিয়ে সমর্থন করি না। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ হিসেবে সমর্থন করি।’
অপরদিকে জার্মানের এঙ্গেলা মার্কেল, যিনি অভিবাসীদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলেন, টারান্ট তাকে হত্যা করার আহবান জানিয়েছে।
টারান্টের ভাষায় তুর্কী প্রেসিডেন্ট, রজব তাইয়েব এরদোগান যিনি ইউরোপের বৃহত্তম ইসলামপন্থিদের নেতা এবং ইউরোপের শত্রু, তাকেও হত্যা করতে হবে। তাকে হত্যা করলেই তুর্কী ও ন্যাটোদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি হবে। এতে করে এই অঞ্চলে তুর্কীদের দখল দুর্বল হয়ে পড়বে।
মুসলিমদের কেন আক্রমণ?
টারান্ট তার ইশতেহারে হামলার পর যত ধরণের প্রশ্ন উঠতে পারে তাকে নিয়ে, তার সম্ভাব্য সব প্রশ্নোত্তর সে লিখে গেছে। প্রশ্নের উত্তর দেয়া তার উদ্দেশ্য না, বরং শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসবাদকে পথ দেখানোই আসল উদ্দেশ্য। শ্বেতাঙ্গদের পক্ষ হয়ে যারা লড়বে, তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নগুলো উঠতে পারে। তারা যেন চমকে না যায়, তাই একটা পথরেখা লিখে গেলো সে।
২০১৭ সালেই হামলার চিন্তা মাথায় এসেছিল তার। শুধু এই লেখা লিখতে, পরিকল্পনা করতেই ২০১৯ পর্যন্ত দেরী করা।
সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসে তা হলো—ইউরোপের অভিবাসীদের মধ্যে মুসলমান, খৃস্টান, বৌদ্ধ, কমিউনিস্ট সবই তো আছে। তাহলে মুসলমানদের টার্গেট করেই কেন আক্রমণ চালালো।
এর উত্তরে টারান্ট তিনটি কারণ তুলে ধরেছে।
এক. ঐতিহাসিক কারণ। দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে চলে আসা মুসলিম এবং ইউরোপের খৃস্টানদের মাঝে যুদ্ধ চলে আসছে। এতে অনেক খৃস্টান মারা গেছে। এর প্রতিশোধ নিতে চায়।
খ. সামাজিক কারণ। এরা সংস্কৃতি বদলে দেয়। অন্য ধর্ম ছেড়ে মুসলিম হওয়া মানে সংস্কৃতি নষ্ট হওয়া। ইউরোপে ইসলাম গ্রহণ বাড়ছে, এজন্যই হয়তো সে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলো শ্বেতাঙ্গদের সংস্কৃতি যায় যায় বলে।
গ. পরিসংখ্যানগত কারণ। মুসলিমরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ মানে না। তাই এদের জন্মহার বেশী। এরা যত বাড়ছে, ইউরোপীয়দের সঙ্কটও তত ঘনীভূত হচ্ছে।
এখানে আরেকটা ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন জাগে। মুসলিমদের জন্মহার নিয়ে যখন এতই টেনশন, তাহলে বিয়ে করে সে জন্মহার বাড়ানো শুরু করলেই পারে। এর উত্তরও দিয়ে গেছে সে, ‘যতদিন মুসলিমরা এখানে থাকবে, ততদিন আমাদের দ্বারা কাজ হবে না। আমরা তাদের সঙ্গে পেরে উঠবো না। তাই আগে তাদের তাড়াতে হবে।’ কথাটা যেমন হাস্যকর, তেমনি এতে তার গোঁয়ার্তুমি টাও প্রকাশ পেয়েছে।
তাহলে টারান্ট কি ইসলামভীতু? এর উত্তরে সে বলেছে, ‘না। আমি ইসলাম ভীতু না। তবে তাদের জন্মহারকে ভয় পাই।’
অভিবাসীরা সব বেশি বেশি করছে; চাকরি, ভূমি দখল, জন্মহার। ইউরোপীয়রা পারছে না। তাহলে এর সলুশন কি গণতন্ত্র? যেখানে সবাই সমান থাকবে। জবাবে টারান্ট বলেছে, ‘গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি জনগণ। এখন আমাদের জনগণই তো অভিবাসীদের দ্বারা শোষিত হচ্ছে। সুতরাং গণতন্ত্র সলুশন নয়। বরং এর আগে অভিবাসীদের বের করতে হবে।
নয়া ক্রুসেডের শুরু
টারান্টের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিলো পরিকল্পিত। তার এই পরিকল্পনা পথ দেখাবে বেঁচে থাকা শ্বেতাঙ্গদের। ইতোমধ্যে তার পথ ধরে হাঁটা কয়েকজনের সর্বনাশী কাণ্ড দেখে ফেলেছি আমরা। শুধু গত আগস্টেই দু’বার শ্বেতাঙ্গ হামলার শিকার হয়েছে মানুষ। প্রথমবার টেক্সাসের অঙ্গরাজ্যের এলপাসো শহরের সিয়েলো ভিস্তা শপিংমলে। এই হামলায় নিহত হয় ২২ জন। দ্বিতীয়বার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মিডল্যান্ড ও ওডেসার মধ্যবর্তী এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে। এতে নিহত হয় ৫ জন। এই দুই শ্বেতাঙ্গও আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে অাগ্নেয়াস্ত্র। টারান্ট নিজেও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিলো। কারণ হিসেবে বলেছিলো, ‘এতে আঘাত বেশি দেওয়া যায়। মানুষের চোখেও পড়ে বেশি।’
আগস্টে যে দুজন শ্বেতাঙ্গ হামলা করেছিল, মানসিক রুগী বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদেরকে ডিফেন্স করতে চেয়েছিলো। হয়তো টারান্ট বেঁচে থাকলেও মানসিক রুগী বলে তাকে ডিফেন্স করতো। কিন্তু টারান্ট সে সুযোগ রাখেনি। মানসিক রোগ নয়, বরং ভেবেচিন্তে এটাকে সে বলেছে, ‘টেরোরিস্ট অ্যাটাক’। তাহলে কি আমরা বলবো এক নয়া ক্রুসেডের শুরু হচ্ছে আবার? শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসের ইশতেহার কি তা-ই বলছে আমাদের?
