পরাজিত হয় না কবিরা

তুহিন খান

বাঙলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি বলা হয় তাঁকে। বলা হতো ‘বাঙলা কবিতার জীবন্ত কীংবদন্তি’। জীবন্তই বটে! সেই পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি আধুনিকতাবাদের জোয়ারে উত্তাল কাব্যশহর ঢাকায় সেই যে একটি মাত্র ট্রাংক নিয়ে নামলেন ১৮ বছরের এক গ্রাম্য তরুণ, তারপর কেটে গেছে প্রায় ছয়টি যুগ! বন্ধুরা একে একে চলে গেছে সব। শামসুর রাহমান চলে গেছেন ২০০৬-এ, ঐ যে তিনি লিখেছিলেন–‘আজও দাঁড়িয়ে আছি/এ আমার একধরনের অহংকার!’ শ্যামলীতে তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কতবার চোখ ভিজে গেছে, কত সকালে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি সেই নিঝুম বাড়িটিতে, বারান্দায় ঝোলানো তার প্রতিটি ছবি কত ভরাট, সার্বভৌম, আমি তাকে পছন্দ করিনা, তবু, তিনি কবি ছিলেন, এইকথা কে না জানে! শামসুর রাহমান নেই। শহীদ কাদরী কী এক অপত্য অনুচ্চারিত নিস্পন্দ অভিমানে প্রবাস বনবাসে কবিজীবনের ইতি টেনেছেন, কিংবা কে জানে, কবিতা হয়ত তিনি লিখেছেনও অজস্র, সেইসব অনাহুত দিনে। তিনিও চলে গেলেন ২০১৬-তে। ফজল শাহাবুদ্দীনও চলে গেছেন বেশ আগেভাগেই। কে রইলো? আল মাহমুদ। আর গত ফেব্রুয়ারিতে, এই দীর্ঘ দীর্ঘতর, গভীর গভীরতর জীবনের মোহ কাটিয়ে তিনিও চুলে গেলেন জীবনের ওইপারে। তবুও কী জীবন্ত নন? বটেই!

‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে, চুলখোলা আয়েশা আক্তার!’ এই একটি লাইন ছিল আমাদেরর কৈশোরিক প্রেমের সম্বল। তারপরে, যখন এলো বিচ্ছেদ, তখন আমরা আনমনে আউড়ে গেছি–‘ভোল না কেন, ভুলতে পারো যদি?’ তারপর এলো সেই মহাবিদ্রোহের কাল, বিষাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকেই আবার নির্মাণ। আমরা পারছিলাম না। একদিন, ঐশীবাণীর মতই কানে বেজে উঠলো–‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা!’ সেই থেকেই আমরা পুনঃনির্মিত, অপরাজিত এবং কবি। এমন একটি পংক্তি যে একবার পড়ে, তার কবি না হয়ে উপায় কী? আমাদেরও ছিল না। এই একটি লোকের একটি উচ্চারণ–’আমি কবি হতে চেয়েছিলাম, কবিই হয়েছি’–এই মন্ত্রবলেই যে একদা আমরাও তার মতই কুয়াশাঘেরা কবিতার স্টেশনে কাঁপতে কাঁপতে নীলবর্ণ আলোর সংকেতে বিভোর হয়েছিলাম–সেকথা অস্বীকার করি কীভাবে?

আল মাহমুদকে নিয়ে কী লেখা যায়? একটা সময় ছিল, যখন আমি ছড়া পড়তাম। একটা বইয়ের কথা আমার মনে পড়ে–পাখির কাছে ফুলের কাছে। সেও এক ইতিহাস। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর গজলগুলি শুনতাম। একদিন অবাক হয়ে গেলাম এক গজল শুনে। ‘আব্বু বলেন পড় রে সোনা/আম্মু বলেন মন দে/পাঠে আমার মন বসেনা/কাঁঠালচাপার গন্ধে/সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে/কর্ণফুলির গোলটায়/দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি/ফেরেশতারা ওল্টায়!’ আমি অবাক আনন্দে আচ্ছন্ন হলাম। তারপর থেকে একটা দিনও এমন যায়নি যেদিন পড়তে বসে এই গানটা মনে পড়েনি! আসলে এটা গান না। ঐ ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ বইয়ের একটি ছড়া। আল মাহমুদের।

ঐ বইটাতে এত অসাধারণ কিছু ছড়া লিখেছেন তিনি, এই একটা বই বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত সম্পদ। কী তার ছন্দ-গন্ধ, কী তার ভাষা-বক্তব্য! তারপর আরেকটু যখন বড়, তখন পড়ি তাঁর কবিতা ‘বিশ্বাসের চর’। ‘আজ শুধু হাওয়া থাক/একটি মাস্তুল শুধু ভেসে ভেসে দূরে চলে যাক’–এই অনবদ্য চিত্রকল্প আমাকে ঐ ছোটবয়সেই ভীষণ আনমনা করে দেয়। ‘কোনদিকে, কোনদিকে বিশ্বাসের চর?’–জীবনগন্তব্যের প্রতি এই ব্যাপ্ত আকুলতা নিশ্চিন্ত শৈশব থেকে আমাদের একটানে দাঁড় করিয়ে দেয় বিহ্বল কৈশোরের সামনে, যেন পড়ার টেবিল ছেড়ে সহসাই বড় হয়ে ওঠা। আমি আল মাহমুদের ভক্ত হয়ে যাই।

এইসূত্রে মনে পড়ে জাহিদ ভাইয়ের কথা। আমরা একসাথে পড়তাম আল মাহমুদের ‘দৈনিক আমার দেশে’র সম্পাদকীয় পাতায় প্রতি মঙ্গলবার প্রকাশিত কলাম–সাহসের সমাচার। সত্তরোর্ধ্ব একজন কবির লেখা কতোটা ব্যাকুল আর্দ্র, কতোটা গভীর, কতোটা প্রাণপ্রাচুর্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে বর্ণাঢ্য–মূলত ঐ কলামগুলো পড়েই কবিকে চিনি আমরা। আমি টুকটাক যা লিখি তার সূচনাও সেখানেই।

তারপর তো কত পড়েছি। কবি আল মাহমুদ ও তাঁর কবিতার পাঠ ব্যাপক ও স্বতন্ত্র প্রবন্ধের কাজ। সংক্ষেপে বলে রাখি, আল মাহমুদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য স্বাতন্ত্র্য; ত্রিশোত্তর কবিতার প্রচলিত আধুনিক কাঠামোর মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম অসংকোচে অসামান্য সফলতায় আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার শুরু করেন, নগরজীবনের হতাশা, বঞ্চনা ও যন্ত্রণা তাঁকে কাবু করতে পারেনি, তিনি তো সেই কবি যিনি লিখেছেন–’পরাজিত হয় না কবিরা!’ তাই শহুরে যান্ত্রিকতার ভেতরেই প্রবল উচ্ছ্বাসে তিনি নিয়ে আসেন চিরায়ত গ্রামীণ জনপদের ছবি, চরাঞ্চলের দৃশ্য ও ইতিহাস, ভাটি বাঙলার মুসলিম কিষাণ পরিবারগুলির চিরায়ত গল্প এবং একান্ত বাঙলার ঘাসপাতার গন্ধ। আর ‘সোনালি কাবিন’ এর মতো কালজয়ী কাব্যের পরেই আল মাহমুদ আরও একবার আধুনিকতাবাদী কবিতাকে আমূল ভড়কে দিয়ে লেখেন ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ বা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র মতো কাব্য, যাকে এদেশের রাজনৈতিক মতান্ধ কবিরা না পারে গিলতে, না ওগড়াতে।

তাঁর কাব্যের মূল অনুষঙ্গ ৩টি–বাঙলার গ্রামীণ জনপদ, বিশ্বাস ও নারী। ‘কবির কাজ স্বপ্ন দেখানো’, প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই একথা বলেছেন আল মাহমুদ। করেছেনও তাই। ত্রিশের হতাশাবাদী আধুনিকতাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। জীবনানন্দ যেখানে লিখেছেন–‘মৃত্যুরেই তবে তারা হয়ত ফেলিবে বেসে ভালো’, সেখানে আল মাহমুদ বলেন–’জীবনের পক্ষে তাই সারাদিন দরজা ধরে থাকি!’ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের হতাশা, নৈরাজ্য ও বিনষ্টের চিত্‍কারের ধূসরতার মধ্যে তিনি লিখলেন–‘স্বপ্নের সানুদেশে আমরা শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেবো/বামদিকে বয়ে যাবে রুপোলি নদীর জল/ডানে তীক্ষ্ন তৃষিত পর্বত!’ এভাবেই চিরকাল বিংশ শতকী বিমানবিকতার বিরুদ্ধে স্বপ্ন আশা আর বিশ্বাসের জ্বলজ্বলে পংক্তি তুলে ধরেছেন আল মাহমুদ।

৮০বছর কম নয়। আল মাহমুদ বলেছেন-৮০টা দিন হেঁটে আসলে বোঝা যাবে ৮০ বছর কী জিনিস। কথাটা গভীর হয়ে গেঁথে আছে বুকে। এতদিন আল মাহমুদের কবিতা পড়েছি তাঁর জীবদ্দশায়ই। পড়ে কত কী ভেবেছি, ভেবেছি এই কবি আমাদের ধুলোকাদার পৃথিবীতে এখনো বেঁচে আছেন, লিখছেনও। প্রতি ঈদসংখ্যায় তাঁর কবিতা পেতাম, সেসব কবিতা একজন নিঃসঙ্গ কিন্তু তৃপ্ত মানুষের অন্তিম গন্তব্যের দিকে হাসিমুখে চেয়ে থাকা চোখের মতো টলটল করত আমাদের বুকে।

আজ যখন সোনালি কাবিন হাতে নিয়ে পড়তে থাকি–’কেন এত বুক দোলে? আমি আর আসব না বলে?’ তখন কবি সত্যিই আর আসবেন না। আল মাহমুদহীন পৃথিবীতে তাঁর কবিতা পড়তে হবে এই অনুভূতিতে আমাদের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। কাঁদি। এবারের পাতাঝরা ফেব্রুয়ারিতে এই পংক্তি সত্যি হয়ে গেল–আমার অনুপস্থিতি হাই তোলে ফেব্রুয়ারির গুমোট বাতাসে! ভাবলেই চোখমুখ ভিজে যায়। তবু আমাদের স্বপ্নে আর বিশ্বাসে তাঁর জ্বালিয়ে দেয়া অগ্নিমশাল চিরকাল জ্বলবে, সংসারের শত উপেক্ষাকে তুচ্ছ করে, জীবনের যাবতীয় জটিলতা-কুটিলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, এই মতাদর্শিক পৃথিবীর সকল মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, আমরা বলব–’পরাজিত নই, পরাজিত হয় না কবিরা!’

আল মাহমুদ, আপনাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা আপনি এখন আর উপলব্ধি করতে পারবেন না, একজীবনে এই দুঃখ আমাকে কোনো আয়েশা আক্তারের উদোম শরীরও ভুলিয়ে দিতে পারবে না। শুভ জন্মদিন।

লেখক : কবি ও ক্রিটিক

আগের সংবাদইসা ইবনে আবান : কাজি ও ফকিহ
পরবর্তি সংবাদরাজধানীতে পাঠাও-চালককে কুপিয়ে হত্যা