পশ্চিমবঙ্গে যে কারণে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দিলেন মমতা ব্যানার্জী

মাহবুব কাজী

গত ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ভারতে যেন বাংলাদেশি চ্যানেল দেখা যায় সে বিষয়ে শিগগিরই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। এরই মধ্যে ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখানোয় রূঢ় মন্তব্য করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের চারটি জেলায় যেসকল বাংলাদেশি চ্যানেল অবৈধভাবে দেখানো হচ্ছে সেগুলি অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি৷

সম্প্রতি নবান্নে মাল্টিপল সিস্টেম অপারেটর (এমএসও) এবং কেবল অপারেটরদের তিনি বলেছেন, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুরে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি চ্যানেল বিনা অনুমতিতে দেখানো হচ্ছে। অবিলম্বে সেগুলো দেখানো বন্ধ করে দেয়া হোক। মমতা অভিযোগ করেছেন, এই সব বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল এমন সব স্পর্শকাতর বিষয় প্রচার করছে, যার ফলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হতে পারে।

ক্যাবল অপারেটররাও স্বীকার করেছেন যে, আইন না মেনেই বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশের কিছু টিভি চ্যানেল দেখানো হচ্ছে। আইডিয়াল ক্যাবল অপারেটর এসোসিয়েশনের পাপাস দাস বলেছেন, এর আগেও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখানো হয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতিটা কি তা জানা নেই। তিনি বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর আমরা এমএসও এবং ক্যাবল অপারেটরদের বলবো আইন মেনে চলতে এবং বেআইনিভাবে যেন বাংলাদেশি চ্যানেল দেখানো না হয়। ভারতে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল দেখানোর কোনো অনুমতি নেই।

অবশ্য বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছেন পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল দেখানোর জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের ক্যাবল অপারেটররা সেজন্য প্রচুর অর্থ দাবি করছেন। সম্প্রতি কলকাতা সফরে এসে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলে গেছেন, ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখানোর জন্য আলোচনা চলছে। কিছুদিন আগেই দিল্লিতে এ ব্যাপারে প্রসারভারতীর সঙ্গে বাংলাদেশ টিভির একটি মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই আলোচনার দরজা বন্ধ থেকে যায়। টিভি চ্যানেল নিয়ে বহুদিনের বিতর্ক থাকলেও দায়িত্বশীলরা সময়মত মুখ খুলেননি আলোচনার টেবিলে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, ভারতের ৩২টি পে-চ্যানেল এবং আটটি ফ্রি-চ্যানেল বাংলাদেশে সম্প্রচারিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতের চ্যানেল দেখা গেলেও ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল প্রবেশের সুযোগই নেই। গত প্রায় এক দশক ধরে বিষয়টি নিয়ে কেবল আলোচনাই হচ্ছে। সর্বশেষ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় ২০১৩ সালে এ বিষয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু যথারীতি বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই রয়ে যায়।

গত ৬ ও ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাবে, এটা চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে মর্মে আশাবাদ ছিল দুই পক্ষের মধ্যে। মোদির বাংলাদেশ সফরের একদিন আগে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান যাতে ভারতে দেখা যায়, সেই ব্যবস্থা করা হবে। তখন বিষয়টি বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করা হলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, “আমরা চাই বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠান এ দেশের মানুষ দেখতে পাক। কীভাবে করা হবে, তা কালই (৬ জুন ১৮) জানতে পারবেন।”

এই বক্তব্যের পর ধারণা করা হয়েছিল মোদির বাংলাদেশের সফরের সময় এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু দৃশ্যত কোনো আলোচনা হয়নি।

সরকারের বিগত টার্মের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু জানিয়েছিলেন, বিটিভি চ্যানেলটি ভারতে প্রদর্শনের কারিগরি কাজ চলছে। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু বিদেশি টিভি চ্যানেল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ডাউনলিংক ফি বেশি হওয়ায় ভারতীয় ক্যাবল অপারেটররা আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। বিষয়টি ভারতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের একটি দাবি হলো যেহেতু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে দেখা যায়, সেহেতু বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোও ভারতে দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হোক। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে না দেখানো হলে ভারতীয় চ্যানেলগুলোও বাংলাদেশে দেখানো উচিত নয়।

তবে এসব কিছুই কেবল আশা, আশ্বাস ও ইশতেহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। বাস্তবে পরিণত হয়নি কখনোই। বাংলাদেশি সাধারণ জনগণের ক্ষোভের ওপর নতুন মাত্রা যোগ করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য। অবিলম্বে বাংলাদেশ তথ্যমন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর কোনো সমঝোতায় আসা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাঁরা বলছেন, ভারত যদি তাদের দেশে বাংলাদেশি চ্যানেল সম্প্রচার করতে না দেয় তাহলে বাংলাদেশও যেন ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করে রাখে।

আর ধর্ম ও সমাজসচেতন শ্রেণির দাবি হলো, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারের কারণে এবং এর কুপ্রভাবে বাংলাদেশের তরুণ ও গৃহিণীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় নেমে আসছে। পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে ভাঙছে অসংখ্য সুখের সংসার। তাই ভারতে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারের অনুমতি মিলুক বা না মিলুক, বাংলাদেশে যেন অপসংস্কৃতি ও অশান্তি ছড়ানো ভারতীয় এসব চ্যানেলের সম্প্রচার জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করা হয়।

আগের সংবাদমেননের ইসলামবিরোধী বক্তব্য নিয়ে জাতীয় সংসদ মসজিদের সাবেক ইমামের তীব্র প্রতিবাদ
পরবর্তি সংবাদমেননের বক্তব্য ইসলাম ও রাষ্ট্র-বিরোধী, অনতিবিলম্বে প্রকাশ্যে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে : আল্লামা আহমদ শফী