পশ্চিমা মুসলিম আধ্যাত্মিকতা : বিশ্বায়নে যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে তাসাউফ

পশ্চিমা মুসলিম আধ্যাত্মিকতা : বিশ্বায়নে যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে তাসাউফ

মুজাহিদুল ইসলাম :

যোগাযোগে বিশ্ব আজ ‘একগ্রামে’ রূপান্তরিত। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছুর আন্তর্জাতিককরণের যুগ চলছে। পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি এখন শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্র-পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ধর্মীয় চিন্তাভাবনার গূঢ় রহস্য ও শাস্ত্রীয় আধ্যাত্মিকতায় নিজেদের উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তারা। আধ্যাত্মিকতার পাশ্চাত্যায়নের সূচনা বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই। ভারত থেকে রফতানীকৃত সুফীবাদের নতুন ও পরিবর্তিত এ তত্ত্ব দিয়ে চলছে ইসলাম প্রতিরোধের বিকল্প প্রকল্প।

ড. আব্দুল ওহহাব মাসিরী বলেন, ‘ইসলামের সাথে লড়াইরত পাশ্চাত্য বিশ্ব সুফী আন্দোলনে উৎসাহ যুগিয়ে চলছে। পাশ্চাত্যের সর্বাধিক প্রচারিত বইসমূহের মধ্যে মুহিউদ্দিন আরাবী ও জালালুদ্দিন রুমির কবিতা অন্যতম। আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট কংগ্রেসের বিশেষ কমিটি আরব দেশগুলোতে সুফী আন্দোলন জোরদার করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে থাকে। দুনিয়ার প্রতি বিরাগ ও রাজনৈতিক বিমুখতা বাড়ানোর প্রতি জোর দেয় তারা।’

জন্ম ও বিকাশ

সুফীবাদের স্বাভাবিক চর্চা বহু আগে থেকেই। কিন্তু নতুনভাবে নিজেদের স্বার্থবিবেচনায় মুসলিম আধ্যাত্মিকতাকে কাজের লাগাবার মানসে গড়ে ওঠে এই নতুন ট্রেন্ড। সুইজারল্যান্ডের সবুজ শ্যামল ভূমি থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ খান ইনায়েতের হাত ধরে শুরু হয় আধ্যাত্মিকতার নতুন পাশ্চাত্য ভার্সন। পাশ্চাত্যের সাম্রাজবাদী চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়াতে তা বেশ দ্রুত প্রচার-প্রসার পায়।

গান-বাজনা, সহাবস্থান, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ তত্ত্ব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সুফী-পরিষদ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এবং হল্যান্ড, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, কানাডা ও আমেরিকায় এর বিভাগও খোলা হয়।

সুফীবাদের প্রতি পাশ্চাত্যের সমর্থন

আমেরিকান ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ম্যাগাজিন তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, আমেরিকান অনেক থিঙ্ক-ট্যাংক বর্তমানে খুবই বিশ্বাস করছে, বিশ্বজুড়ে
সুফীবাদের প্রচার আমাদের অনুকূলে একটি মোক্ষম অস্ত্র। এজন্য পাশ্চাত্য প্রকাশ্যে সুফী আন্দোলনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বৃ্দ্ধি করছে। আমেরিকার প্রস্তাবিত সুপারিশে বিভিন্ন দেশের মাজার মেরামত, মধ্যযুগের মরমী পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও অনুবাদে অর্থায়ন করার পাশাপাশি সরকারগুলোকে
সুফীবাদের উন্নয়নে উৎসাহ প্রদানের অনুরোধ করা হয়।

ইজরাইলের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক সালেহ নাআমী বলেন, ‘ইজরাইল বিশ্বজুড়ে সুফী তরীকার মাশায়েখদের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরী করছে। অন্যদিকে মিসরে ব্রিটিশ প্রতিনিধি সেখানে সুফীবাদের সর্বোচ্চ পরিষদ তৈরী করে বিশাল অবদান রাখছে।
পাশ্চাত্য সুফীবাদের প্রবক্তা লেখিকা ফারিনা আলাম বলেন, ‘ক্লাসিকাল ইসলামী ধর্মশিক্ষা ধর্মীয় ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরী করে।’

ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মাজারসহ ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত বিভিন্ন স্থাপনাকে মুসলিম ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরে এটাকেই ইসলাম বলে পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ইসলামের পূর্ণ রূপরেখা থেকে দৃষ্টি অপসারণের মৌলিক লক্ষ্য হিসেবে বোদ্ধা মহলে এটা বেশ আলোচিত।

ইসলামী বিশ্বের সেক্যুলার প্রশাসনে সুফীবাদ

ফ্রেঞ্চ মুসলিম প্রাচ্যবিদ ইরিক বলেন,‘আরব সরকারগুলো রাজনৈতিক ইসলাম প্রতিহত করতে প্রশাসনে সুফীবাদ অন্তর্ভুক্ত করছে।উজবেকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্টের সুফীবাদের সাথে গভীর সম্পর্কের কথা সুবিবিদিত। সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন,’ ‘তিনি পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া। যারা তার সাথে বিরোধিতা করবে, সে ফাসিক ও কাফির।’ তার একটি ফতোয়া, ‘মুসলমানের জন্য কালিমায়ে শাহাদাত যথেষ্ঠ। তার জন্য নামাজ, রোজা আবশ্যক নয়। ইসলাম অন্তরে থাকে। আর এটাই যথেষ্ঠ। হিজাব না পরাতে কোন সমস্যা নাই।’ এক্ষেত্রে তাকে উজবেকিস্তানের শায়েখ কোবানী সমর্থন করেন। আর তৎকালীন প্রশাসনই মূলত তালেবান শাসন উৎখাতে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিকচেনির সাথে বারবার সাক্ষাৎ করেন।

সুফীবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ইলমী ব্যক্তিরাই মূলত মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করাকে হারাম এবং প্রেসিডেন্ট মুরসির উৎখাতপরবর্তী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এমনকি মিসরীয় সেনাবাহিনীর সাথে বসে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উৎসাহ যুগিয়েছেন। অথচ ইয়ামানে বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে সালেহ ও হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থনে সুফীবাদের বিশাল প্রভাব আছে বলে খবরে বলা হয়।

মরক্কোর শাসকপরিবার সুফীবাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা কারো অজানা নয়। ২০১২ সালে আরব বসন্তের সময় সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভের বিপরীতে রাবাতের রাস্তায় কাদেরীয়া তরীকার অনুসারীরা বিশাল পদযাত্রা বের করে।

অন্যদিকে আলজেরিয়ায় ক্ষমতার মূল গোলক সেনাবাহিনীর সুফীবাদেরকে সহযোগিতা তো সুবিদিত। এমনকি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পদ তৈরী করে সেখানে পাশ্চাত্য চিন্তাধারার সুফীবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়। তাছাড়া লিবিয়া, আরব আমিরাত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে কথিত পাশ্চাত্যায়িত সুফীবাদের প্রতি সফটনেস তৈরীতে সরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যায়।

ইসলামী বিশ্বে সার্বজনীন ইসলামের রূপরেখার বিপরীতে বিশ্বয়ানের অনুগত এবং কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের রেখে যাওয়া তাসাউফের বিপরীতে নতুন তাসাউফ দাঁড় করাবার প্রচেষ্ঠা বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান।

নতুন তাসাউফের আমলের কিছু নমুনা

মিসরসহ বিভিন্ন দেশেই পাশ্চাত্যায়িত দৃষ্টিভঙ্গির তাসাউফের ধ্যান ও আমলের মধ্যে দেখা যায়, ফাতেহা পাঠ ও সঙ্গীতের তালে তালে কিছু জিকির আযকার, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ ও বৈশ্বিক রূপ দিতে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সহনীয় নয় বরং চ্যালেঞ্জ জানানোর মাধ্যমে নিজেদের মুসলিম পরিচয়কে অনেক সময় চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক সময় কাউন্সিলিংয়ের পরিবর্তে একেক জলসায় দেড়ঘণ্টা ধ্যান করানো হয়। বিভিন্ন দেশে অর্থের বিনিময়ে ধ্যানের ব্যবসায়িক কেন্দ্রও খোলা হয়েছে।

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জায়গায় সুগন্ধিযুক্ত শীতাতাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে গুরু নিজের পূর্ববর্তী মানব উন্নয়নমূলক অভিজ্ঞতার আলোকে শিষ্যদের বিভিন্ন সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেন। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক মানুষ কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক ধারার বাইরে এই আধুনিক প্যাটার্নে স্বস্তিবোধ করে। তাদের দৃষ্টিতে সেকেলে মৌলভিদের অনুসরণ মানে তাদের নিকট আত্মসমর্পণ।

ইসলামের শ্বেতশুভ্র আত্মশুদ্ধির ঐতিহ্যবাহী ক্ল্যাসিকাল ধারার চর্চাই মূলত এ অবস্থার বিপরীতে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। আধ্যাত্মিকতার পরম স্থান বিকৃত হওয়ায় তা ছুড়ে ফেলা নয়, বরং প্রকৃত ধারার চর্চাই পরিবর্তনের হাতিয়ার।

আগের সংবাদবেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করায় বেসরকারি ৩ বিশ্ববিদ্যালয়কে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা
পরবর্তি সংবাদপ্রজাতন্ত্র দিবসে পরপর চারটি বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল আসাম রাজ্য