
মুসান্না মেহবুব :
সম্প্রতি সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলইয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের আগে কওমি মাদরাসা থেকে যাঁরা দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের আগে যাঁরা বেফাকসহ ছয় শিক্ষাবোর্ডের যেকোনো একটার অধীনে দাওরায়ে হাদিসের ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁরা ১৪৪০ থেকে ১৪৪৫ হিজরি, অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরের যেকোনো বছর হাইআর পরীক্ষায় পূর্বের পরীক্ষার নম্বরপত্র জমাদানপূর্বক প্রাইভেটভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এবং হাইআতুল উলয়ার সরকার স্বীকৃত সনদপত্র গ্রহণ করতে পারবেন। ছয় শিক্ষাবোর্ড ছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক কেউ যদি বহির্বিশ্বের কোনো কওমি মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরাও আগামী পাঁচ বছর এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন।
হাইআতুল উলয়ার নতুন এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন এবং এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করছেন।
সমালোচকরা বলছেন, হাইআ প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠার আগে যাঁরা ফারেগ হয়েছেন, তাঁরা তো যথামাফিক পরীক্ষা দিয়েই ফারেগ হয়েছেন। পূর্বের পরীক্ষার সঙ্গে হাইআর বর্তমান পরীক্ষা-কাঠামোর তো বিশেষ কোনো ফারাক নাই, তবে পুনরায় কেন তাঁদেরকে পরীক্ষা দিতে হবে? পরীক্ষা ছাড়া নম্বরপত্রের ওপর ভিত্তি করেই তো সনদপত্র দেওয়া যায়।
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল হাইআতুল উলয়ার অন্যতম সদস্য ও জামিয়া গহরপুরের মুহতামিম মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু’র সঙ্গে। তিনি বলেন, পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা দেবার সিদ্ধান্তটা হাইআতুল উলয়ার সর্বোচ্চ অথোরিটির সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তটা মূলত নেওয়া হয়েছে পূর্ববর্তী ফারেগিনদের পরীক্ষাদানকে একটা সিস্টেমের ভেতর নিয়ে আসার জন্য।
মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, হাইআ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত তিন বছর যাবত পূর্ববর্তী ফারেগিনদের অনেকেই নতুন সনদ লাভের জন্য বিভিন্ন মাদরাসা থেকে নিয়মিত ছাত্রদের মতো রেজিষ্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিয়ে আসছেন। তাঁদের অনেকাে দেখা গেছে ১০/১২ বছর ধরে বুখারি পড়াচ্ছেন বা অন্যান্য বড় বড় কিতাব পড়াচ্ছেন, কেউ কেউ বড় কিতাব না পড়ালেও দীর্ঘ দিন দরস-তাদরিসের সাথে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে ইলমি ইসতেদাদ অনেক বেশি। এখন তাঁরা যদি নতুন ছাত্রদের সাথে বসে পরীক্ষা দেন, এবং কম্পিটিশন করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন ছাত্ররা তাঁদের সঙ্গে পেরে উঠবে না। গত তিন বছরে আমরা এটা প্রত্যক্ষ করেছি। মেধাতালিকায় স্থান করে নিচ্ছেন পুরাতনরা। তাছাড়া, নিয়মিত ছাত্রের মতো এভাবে কোনো মাদরাসা থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার প্রক্রিয়াটাও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও অস্বচ্ছ।
তিনি বলেন, মূলত এই বৈষম্য এবং অস্বচ্ছতা দূর করতেই পুরাতন ছাত্রদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা এখন থেকে কোনো মাদরাসার অধীনে নয়, প্রাইভেটভাবে পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। তাঁদের রেজাল্টও বিশেষ কোটায় প্রকাশিত হবে। নতুনদের সঙ্গে তাঁদের রেজাল্ট ধর্তব্য হবে না। তবে সনদ একই থাকবে। আর এ সুযোগ আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ১৪৪৫ হিজরির পর পুরাতন কেউ আর পরীক্ষা দিতে পারবে না।
হাইআতুল উলয়ার অন্যতম এ সদস্য আরও জানান, এ আইন কারও জন্য বাধ্যতামূলক নয়। বরং কেউ যদি মনে করেন তাঁর হাইআর সনদের দরকার, তিনি এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সনদ নিতে পারেন। এর বাইরে পুরাতনদের পূর্বের সনদপত্র কওমি ঘরানায় পূর্বের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর থাকবে।
তিনি বলেন, কওমি মাদরাসার কোনো কাজে হাইআর নতুন সনদপত্রের সাথে এর বিশেষ কোনো ফারাক নাই। বরং আমাদের এই ধারায় সনদের চেয়ে যোগ্যতার মূল্যায়নই তো অগ্রাধিকার লাভ করে এসেছে সবসময়। এ নিয়ম এখনও অব্যাহত আছে, থাকবে। হ্যাঁ, কেউ যদি কওমি মাদরাসা পরিমণ্ডলের বাইরে কোনোকিছু করতে চান, তখন হাইআর সনদপত্রের হয়তো দরকার লাগতে পারে। আর এজন্য হাইআও সনদপত্র সংগ্রহের সেই ব্যবস্থা রেখেছে।
পূর্বের নম্বরপত্র জমাদানের মাধ্যমেও তো সনদপত্র দেওয়া যায়, সমালোচক মহলের এমন প্রশ্নের জবাব জানতে চাইলে মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, এটা একটা হাস্যকর প্রক্রিয়া। সবকিছুই একটা সিস্টেমের ভেতর দিয়ে নিতে হয়। হাইআ কওমি মাদরাসার সম্মিলিত, গ্রহণযোগ্য ও সর্বৃহৎ একটা শিক্ষাবোর্ড। বোর্ড কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে!
তিনি বলেন, হাইআর প্রতিটা সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ অথোরিটির ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা এবং চিন্তা-গবেষণার পর গৃহীত হয়। এসব সিদ্ধান্তদাতাদের সিংহভাইগই দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, কওমি ঘরানার সকল মতপথের পুরোধা ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের যেকোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে হুট করেই সমালোচনা ওঠানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
