মুসান্না মেহবুব:
কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার চলতি শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা অত্যাসন্ন। ইতিমধ্যেই সবকয়টি মাদরাসায় ছাত্ররা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে বরাবরের মতো সকল কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আর অধিকাংশ মাদরাসার নিচের স্তরের অন্যান্য ক্লাসগুলোর পরীক্ষা নেবে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাক।
গত বছরের পরীক্ষায় বেফাকের মেশকাত জামাতের এবং হাইআতুল উলয়ার দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র একাধিকবার ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এ বছর প্রশ্ন নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। গত বছরের মতো আর যাতে এ ধরনের বিড়ম্বনার মুখোমুখি না হতে হয়, বেফাক ও হাইআ এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রশ্ন ফাঁস রোধে হাইআর দাওরায়ে হাদিসের এবং বেফাকের মেশকাত জামাতের পরীক্ষার প্রশ্ন প্রতিদিন পরীক্ষা শুরুর আগ মুহূর্তে প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠানো হবে। এ ছাড়া এ দুই জামাতসহ নিচের প্রতিটি বোর্ডপরীক্ষার জামাতের জন্য বিকল্প হিসেবে একাধিক প্রশ্নসেট তৈরি করা হচ্ছে।
প্রশ্ন পাঠানো হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে
হাইআতুল উলয়ার অন্যতম সদস্য ও বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজুর সঙ্গে কথা হয় এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, গত বছর একাধিকবার প্রশ্নফাঁসের পর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বশেষ যে তাৎক্ষণিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল, সেটাকেই এবার আরও গোছিয়ে করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন পরীক্ষা শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে হোয়াটসঅ্যাপ অথবা ইমেইলের সাহায্যে দাওরা এবং মেশকাতের প্রশ্নপত্র কেন্দ্রগুলোতে প্রেরণ করা হবে। তার আগে রাতে অথবা ভোরে প্রশ্নপত্র তৈরি ও নিরীক্ষণকারীরা কম্পোজের জন্য হাইআ ও বেফাকের দায়িত্বরত কর্মীদের হাতে নির্দিষ্ট দিনের প্রশ্নপত্র তুলে দেবেন। তাই পরীক্ষা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগ পর্যন্তও প্রশ্ন কমিটি ছাড়া এই প্রশ্ন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি জানার সুযোগ থাকছে না।
প্রতিটা কেন্দ্রে প্রিন্টার ও ফটোস্ট্যাট মেশিন বাধ্যতামূলক
মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু জানান, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে প্রেরিত প্রশ্নপত্র যাতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রিন্ট করে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিলি করা যায়, সে জন্য বেফাক ও হাইআর প্রতিটা পরীক্ষাকেন্দ্রে এ বছর থেকে প্রিন্টার ও ফটোস্ট্যাট মেশিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থাও রাখা হয়েছে আবশ্যকীয়ভাবে।
তিনি বলেন, যে সমস্ত মাদরাসায় প্রশ্নপ্রিন্ট ও বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকবে, সেখান থেকে কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া দাওরা ও মেশকাতসহ নিচের স্তরের বোর্ড পরীক্ষার জামাতগুলোর জন্য সম্পূর্ণ আলাদাভাবে একাধিক প্রশ্নপত্র তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু। তিনি বলেন, এতো সতর্কতার পরও যদি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে তাহলে বিকল্প প্রশ্নগুলো কাজে লাগানো হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের গত ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠলে পরীক্ষার চতুর্থ দিন হয়ে যাওয়া চার পরীক্ষা বাতিল এবং অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে দেয় বোর্ডটি। পরে ২৩ এপ্রিল থেকে আবারও নতুনভাবে পরীক্ষা নেবার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ২৩ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু হলে তৃতীয় দিনের মাথায় গতকাল ২৫ এপ্রিল আবারও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। হাইআতুল উলয়া সঙ্গে সঙ্গে ২৫ এবং ২৬ এপ্রিলের পরীক্ষা স্থগিত করে দেয়। এবং সারাদেশে বিতরণ করা অবশিষ্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও বাতিল ঘোষণা করে।
পরে পুরোনো রুটিনে ২৭ এপ্রিল থেকে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো নেয় বোর্ডটি। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্রে। প্রতিদিনের প্রশ্নপত্র বিশ্বস্ত বিশেষ একটি টিম আগের দিন রাতে প্রস্তুত করে। পরদিন সকালে পরীক্ষা শুরুর আধ ঘণ্টা আগে সারা দেশের কেন্দ্রগুলোতে কেন্দ্র-জিম্মাদারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয় এ প্রশ্নপত্রের কপি। কেন্দ্র-জিম্মাদার সম্ভব হলে সেটা আধঘণ্টার ভেতরে প্রিন্ট করে ছাত্রদের হাতে হাতে পৌঁছে দেন অথবা প্রশ্নগুলো ছাত্রদের সামনে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দেন। ব্ল্যাকবোর্ড থেকে দেখে দেখে ছাত্ররা প্রশ্নের উত্তর লেখে।
গত বছর প্রশ্নফাঁস রোধে সাময়িকভাবে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল হাইআতুল উলয়া। এ বছর থেকে পদ্ধতিটিকে আরও গোছিয়ে স্থায়ী করে নিয়েছে কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ এ প্রতিষ্ঠানটি।
