প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারে

মুসান্না মেহবুব

বাংলাদেশে প্রতিবছরই কমবেশি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হন সাধারণ মানুষ। বিশেষত বর্ষাকাল এলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন যেন বন্যার সঙ্গেই বাঁধা থাকে। ভারতের অমানবিক নদী-নীতির দরুণ এ অঞ্চলের মানুষকে বর্ষাকালে পোহাতে চরম মাত্রার দুর্ভোগ। আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হলে এর দুর্ভোগ পুরোটাই তাদের ভাগ্যে জুটে।

বন্যার পানিতে ভেসে যায় নিজেদের সহায়-সম্পত্তি সবকিছু। অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনের মুখোমুখি হন তাঁরা। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাইরে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার কবলেও পড়েন সাধারণ মানুষ। রাজধানীতে কদিন পরপরই ঘটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। মানবিক সাহায্যের জন্য হাহাকার করেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।

এসব দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় মানবিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করে বিভিন্ন ঘরানা ও শ্রেণির মানুষ এগিয়ে আসেন। সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডি, চলতি বছর রাজধানীর চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, উত্তরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যার করাল গ্রাস—এসব মানবিক বিপর্যয়ে বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়ান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এগিয়ে আসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মাদরাসাসমূহও এসব বিপর্যয়ে ভূমিকা রাখে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না হয়ে ব্যক্তিউদ্যোগেই নেওয়া হয় ভূমিকা। বিপর্যয় যদি মাদরাসা এলাকার পাশে হয় তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগেও সর্বাত্মকভাবে এসব মাদরাসা উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যেমনটা দেখা গেছে।

সকাল ন’টার দিকে ভবনটি যখন ধসে পড়ে, ভবনের অপজিটে থাকা সাভার বাসস্ট্যান্ড মাদরাসা সর্বপ্রথম উদ্ধার কাজে তৎপর হয়ে ওঠে। এবং ট্রাজেডির সপ্তাহখানেক পর অবধি মাদরাসাটির ছাত্র-শিক্ষকরা মাদরাসার যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রেখে উদ্ধার কাজ, আহতদের সেবা, চিকিৎসা, মৃত লাশের পরিচয় সনাক্তকরণ ইত্যাদি কাজে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছিলেন। ট্রাজেডির ঘন্টাখানেকের মাথায় তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ফুলবাড়িয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরাও।

এ ছাড়া রাজধানী ও আশপাশের আরও অনেক মাদরাসা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ-পত্র ও সাহায্যসামগ্রী নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন দুর্ঘটনাস্থলে। পাশাপাশি আলেম সমাজ পরিচালিত বিভিন্ন সংগঠনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

রাজধানীর চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিস্তদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে ওলামায়ে কেরামের একটি অংশকে। তাছাড়া উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর যে বন্যা হয়, সেসব বন্যায়ও বন্যাদুর্গতদের পাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে আলেম সমাজের একটা অংশকে দাঁড়াতে দেখা যায়। হাফেজ্জি হুজুর রহ. সেবা সংস্থা, কওমিয়ানদের ফেসবুক গ্রুপ আসহাবে কাহাফসহ বিভিন্ন ব্যানারে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তাঁরা বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান।

কিন্তু রাজধানীর বড় বড় মাদরাসা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বা ছাত্রদের সংঘবদ্ধ প্লাটফর্মের ব্যানারে প্রাকৃতিক এসব দুর্যোগে খুব একটা ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট আলেম ও সমাজচিন্তক মাওলানা ইউসুফ সুলতানের সঙ্গে।

মাওলানা ইউসুফ সুলতান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক যেকোনো প্রয়োজনে মাদরাসাছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখা অতীব জরুরি। এ জন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুকাবেলায় বা সামাজিক প্রয়োজনে স্কুল কলেজ ভার্সিটির ছাত্ররা নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যেভাবে টিম গঠন করে স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে আসে, মাদরাসাছাত্রদেরকেও এভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও যাবতীয় সহযোগিতা করবে।

মাওলানা ইউসুফ সুলতান বলেন, সমাজসেবা, সমাজের যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ানো, ইলমে দীন অর্জনের অন্যতম লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এটাও একটি। তাই সমাজসেবা ও স্বেচ্ছাশ্রমে আমাদের মাদরাসাগুলোকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।

তিনি বলেন, যে সমস্ত অঞ্চলে বন্যা হচ্ছে, সেখানকার মাদরাসাগুলোর ছাত্রদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তাঁরা মাদরাসাগুলোকে একেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে রূপ দিতে পারেন। বন্যাকবলিত মানুষদেরকে তাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসে মাদরাসায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাদের গবাদি পশু বা আরও যা যা আছে তারও আশ্রয়স্থল হিসেবে মাদরাসাকে ব্যবহার করতে পারেন। এতে করে সাধারণ মানুষের সাথে ওলামায়ে কেরাম ও মাদরাসার ছাত্রদের সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাবে এবং মাদরাসাওয়ালাদের প্রতি তাদের আস্থার উন্নতি হবে।

আগের সংবাদডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এবার মারা গেলেন রাজধানীর এক মাদরাসাশিক্ষক
পরবর্তি সংবাদনওমুসলিম দ্বীন মোহাম্মদ শেখ : যাঁর দাওয়াতে ইসলামগ্রহণ করছেন লাখও অমুসলিম