
রাগিব রব্বানি
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে থাকলেও ধর্ম বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষক না থাকার কারণে দেশের প্রায় সবকয়টি প্রাইমারি স্কুলে ধর্মশিক্ষার বিষয়টি নিতান্ত অবহেলার শিকার। ইসলাম বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলেও সাধারণ শিক্ষকরা নিচ্ছেন এসব স্কুলের ইসলাম শিক্ষার ক্লাস। কোনো কোনো স্কুলে হিন্দু শিক্ষকদের মাধ্যমে নামকাওয়াস্তে পড়ানো হচ্ছে, আবার কোনো স্কুলে কার্যত বন্ধ রয়েছে ধর্ম শিক্ষা।
ধর্ম শিক্ষার এ সংকট দূর করার জন্য প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা ঘোষণা দিলেও, ১০ বছর পর আজও তা বাস্তবতায় রূপ নেয়নি।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ফলে সেখানকার মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম শিক্ষার ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দু শিক্ষকরাই। জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও আরও বেশ কয়টি স্কুল এমন আছে, যেখানে মুসলিম শিক্ষক না থাকার দরুণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্ম শিক্ষার ক্লাস হিন্দু শিক্ষকরাই নিচ্ছেন।
এদিকে ফরিদপুরের মানিকদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৭ ভাগ শিক্ষার্থী মুসলিম, কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সকলেই হিন্দু, ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মশিক্ষার ক্লাস সম্পন্ন হচ্ছে হিন্দু শিক্ষকদের মাধ্যমে। রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বারুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে ধর্ম বিষয়ক শিক্ষকের অভাবে ধর্ম শিক্ষার ক্লাস বন্ধ। স্কুলটিতে প্রায় তিনশো শিক্ষার্থীর অধিকাংশই মুসলিম পরিবারের সন্তান, কিন্তু শিক্ষকদের সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
এ ছাড়া দেশের অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্ম শিক্ষার ক্লাস মুসলিম শিক্ষকেরা নিলেও তাঁদের অধিকাংশই ধর্ম বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী না। ফলে নামকাওয়াস্তে দায়সারাগোছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে ধর্ম বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে।
প্রতিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে পাঁচজন করে শিক্ষক থাকেন। গণিত, ইংরেজি, বাংলাসহ অন্যান্য বিষয়ের মতো ধর্ম শিক্ষাও প্রাইমারির প্রতিটা ক্লাসে বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষক থাকলেও ধর্ম বিষয়ে পারদর্শী কোনো শিক্ষক থাকেন না প্রাইমারি স্কুলগুলোতে। ফলে ধর্মশিক্ষার বিষয়টা বরাবরই অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। স্কুলগুলোতে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিলে এই সমস্যা থেকে সহজেই উতরে ওঠা যেত বলে বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন সচেতন মহল।
বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে একটা ঘোষণা জারি করেছিল প্রায় ১০ বছর আগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁর সরকার সারা দেশে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে আরও নানাতর ঘোষণা বাস্তবায়িত হলেও এ ঘোষণা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
ধর্মশিক্ষার উন্নয়ন এবং ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে এই গড়িমসির পেছনে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের যথযথা ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব ও অবহেলাকে দায়ী করছেন ইসলাম বিষয়ক চিন্তাবিদ এবং সচেতন মহল।
ইসলাম টাইমস টোয়েন্টি ফোর ডট কমের সম্পাদক, ইসলাম বিষয়ক লেখক ও চিন্তাবিদ মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, শিক্ষাখাতে গত ১০ বছরে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের নির্বাহী ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঘোষণা আসার পরও প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে অনুদ্যোগী মনোভাব আমার কাছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির লোকের পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে। তাঁরা চাচ্ছে না, এ দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ধর্মের আলো নিয়ে বেড়ে ওঠুক।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে সোচ্চার হতে হবে। কোমলমতি মুসলিম শিশুদের জন্য ধর্ম শিক্ষা আবশ্যিক একটা বিষয়। বাংলা ইংরেজি গণিতের চেয়েও এ বিষয়টা ক্ষেত্রেবিশেষে তাদের জন্য জরুরি। অথচ বছরের পর বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়ে আসছে এ শিক্ষাটি। ব্যাপকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে আওয়াজ উঠিয়ে সরকারের উচ্চপদস্থদের দৃষ্টি আকর্ষণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারেও সরকারকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় আলিয়া মাদরাসা-শিক্ষিতদের। সরকার এখন কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ধর্মীয় আচার ও অনুশাসন শিক্ষাদানে কওমি মাদরাসা-শিক্ষিতরা তুলনামূলকভাবে নানা কারণে অগ্রগামী। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণাকে বাস্তবতায় রূপদান যেমন জরুরি, তেম্নি ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কওমি-শিক্ষিতদের মনোনয়নও সময়ের অপরিহার্য দাবি।
