খেলাফত বিলুপ্তির ৯৪ বছর : ফিরে দেখা চূড়ান্ত পরাজয়

বিশেষ প্রতিবেদক

আজ থেকে ৯৪ বছর আগে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ খেলাফতের সর্বশেষ ধারা উসমানি খেলাফতের বিলুপ্তি ঘটেছিল। তারও আগ থেকে যদিও মুসলিম পরাশক্তির ক্ষমতা কমে আসছিল, কিন্তু খেলাফতের মসনদ থাকায় বিশ্ব মুসলিমের একটা ভরসা ছিল। উসমানি খেলাফতের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সে ভরসাটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্ব হয়ে পড়ে অভিভাবকহারা। আর পৃথিবীর দিকে দিকে মুসলিম নিপীড়ন বাড়তে থাকে ভয়াল মাত্রায়। খেলাফত বিলুপ্তির প্রায় শতবর্ষ পর আজও যা কেবল বেড়েই চলেছে।

৬৩২ সালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্ষমতাসীন হয়ে যে পদের সূচনা করেছিলেন, তা প্রায় ১৩০০ বছর পর ১৯২৪ সালের আজকের দিনে তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল পাশা কর্তৃক বিলোপের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে অটোমানদের মহান রাজধানী কনস্টান্টিনোপল থেকে বহিষ্কার করে প্যারিসে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

তবে আবদুল মজিদ শেষ খলিফা হলেও শেষ সুলতান ছিলেন না। কারণ দুই বছর আগে ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর কামাল পাশা অটোমান সালতানাতের বিলোপ করেন। ১৭ নভেম্বর সিংহাসনচ্যূত সুলতান ষষ্ঠ মোহাম্মদ যখন শেষবারের মতো প্রাসাদ ছেড়ে মাল্টার উদ্দেশ্যে নির্বাসনে যাচ্ছিলেন, প্রাসাদের ফটকের সামনে পদস্থ কর্মকর্তারা সবাই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে বিদায়ী সুলতানকে শেষ সালাম জানান, আর ষষ্ঠ মোহাম্মদ মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান নির্বাসনের জীবনে—খেলাফতের ইতিহাসে এটাই বোধহয় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক দৃশ্য।

অথচ উসমানি খেলাফত হলো মুসলিমদের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের খেলাফত। পৃথিবীর বিশাল একটি অঞ্চল প্রায় ৬২৫ বছর তাদের অধীনে ছিলো। এর অন্যতম একটি কারণ হলো, উসমানী খেলাফতের আইন, কানুন ও বিচার ব্যবস্থা ছিলো তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত।

ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ তৎকালীন ইউরোপের অনেক দেশ উসমানী খেলাফতের আইন-কানুন ও বিচার ব্যবস্থা শেখার জন্যে ইস্তাম্বুলে আসতো, এবং নিজেদের দেশে গিয়ে সেসব আইন-কানুন প্রয়োগ করতো।

উসমানী খেলাফতের অধীনে ইহুদি ও খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মাবলম্বীর পূর্ণ স্বাধীনতা ছিলো। অমুসলিমদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে বিবেচনা করা হতো। এবং মুসলিম ও অমুসলিমদেরকে সমান অধিকার প্রদান করা হতো।

মক্কার শাসক হোসেন বিন আলী উসমানি খেলাফতের বিলুপ্তির পর নিজেকে খলিফা বলে ঘোষণা করেন। তার আগ থেকে পশ্চিমাদের মদদে তিনি খেলাফতের বিরোধিতা করে উসমানিদের সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন।

কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে শরিফ হোসেন নজদের ব্রিটিশ সমর্থনপুষ্ট আমীর আবদুল আজিজ বিন আবদুর রহমানের নিকট পরাজিত হয়ে জর্দানে নির্বাসিত হন, যেখানে তার এক পুত্রকে ব্রিটিশরাই সিংহাসনে বসিয়েছিলো। বাগদাদে শরীফ হোসেনের আরেক ছেলেকে বাদশাহ হিসেবে বসিয়ে অধুনা ইরাকের জন্ম দেয়া হয়। এদিকে মরু আরবের অধিকাংশ এলাকা জয় করে আবদুল আজিজ পত্তন ঘটান অধুনা সৌদি আরবের।

দেখা যাচ্ছে, এতো প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মীয় ঐক্যের প্রতীকসম শাসনধারাটি অবলুপ্তের পেছনে মুখ্য অনুঘটক ছিল নব উন্মেষ লাভ করা শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান সভ্যতা, যাদের অর্থনীতি বাঁধা ইহুদিদের হাতে। এই সমীকরণ খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে ইসলাম-বিরোধী এক অযৌক্তিক আঁতাত ও হিস্যাদারীর জন্ম দেয়, যা আজও চলমান।

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ইসলাম-বিরোধী এ আঁতাতের বাইরে এসে বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্ব আজ যেভাবে একতাবদ্ধ হতে পারছে না, তেম্নি বিশ্বের নানা দেশে চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মুসলমানেরা। এ থেকে উত্তরণের কোনো দায় কিংবা চেষ্টাই যেন নেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর। অথচ ইসলামি খেলাফতের পুনরোজ্জীবন ছাড়া মুসলমানদের আজকের এই নির্মম পরিণতি থেকে উত্তরণের দোসরা কোনো উপায় নেই।

আগের সংবাদসুবর্ণচরে ধর্ষণের পর গৃহবধুর আত্মহত্যার ঘটনায় হাইকোর্টে রিট
পরবর্তি সংবাদবিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় বরখাস্ত ৫