
আবু জর
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলেন। ছিলেন ধার্মিক পরিবারের লোক। তাঁর বংশও ছিল ধার্মিক বংশ। তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে একজন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। কমিউনিস্ট কিংবা সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। ইসলাম ধর্মের প্রতি আস্থা ও ভক্তি তাঁর বহুল কর্মমুখর জীবনের পদে পদে পরিলক্ষিত হয়৷
বঙ্গবন্ধু ছিলেন গণমুখী, নির্বাচনমুখী এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির কর্ণধার৷ বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের ভাষা তিনি পড়ে ফেলতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি শুধু কেতাবি রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের মুক্তির শ্লোগানের প্রতিশব্দ। ছিলেন ভীষণ-জনপ্রিয়, নিজের সময়ের সবচেয়ে বেশি ভোট ও সিট পাওয়া নেতা।
কাজকর্ম ও আকিদা বিশ্বাসে ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর আনুগত্য ও ভালবাসা ফুটে উঠেছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সেসময় প্রখ্যাত আলেম ওলামাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন। একই গ্রামের মানুষ আল্লামা শাসমসুল হক ফরিদপুরী রহ.-কেও তাঁরা পারিবারিকভাবে শ্রদ্ধা করতেন। বঙ্গবন্ধুর গায়ের মুজিব কোট সদর সাহেব হুজুর তাঁকে প্রথম পরিয়ে দিয়েছিলেন। এটাকে তিনি সারা জীবনই শ্রদ্ধার সঙ্গে বহন করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু এবং অতি ঘনিষ্ঠজন ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (তিনি ছিলেন দেওবন্দ মাদরাসার ছাত্র)। আরেকজন ছিলেন তাত্ত্বিক আলেম ও তাঁর পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ। তিনি জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোর থেকে ইসলামি উচ্চতর পড়াশোনা সম্পন্ন করে এসেছিলেন। তিনিও উলামায়ে দেওবন্দের অন্তর্ভুক্ত। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন মাওলানা ইয়াকুব শরীফ। আরেকজন ছিলেন মাওলানা শহিদ ওয়ালিউর রহমান। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর ও শহিদ বুদ্ধিজীবী।
১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টে যোগদান করেন। তাঁর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও নেজামে ইসলামের নেতা শহীদ আতহার আলী রহ. ও ফজলুল হক সাহেব এ ফ্রন্ট গঠন করেন। এটাকে বলা হতো হক-ভাষাণী-আতহার আলী ফ্রন্ট। ওই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রথম এমপি হন। যে সংসদে ৩৬ জন আলেম-উলামা নেজামে ইসলাম থেকে এমপি হয়েছিলেন। ওই যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় জীবনের প্রথম বঙ্গবন্ধু প্রতিমন্ত্রীর পদ পান। সে সময় তিনি মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেবের খলিফা আতহার আলী রহ.-এর ভক্ত ও অনুচর ছিলেন। মাওলানা সাহেবকে তিনি দাদা ডাকতেন। বলতেন ‘দাদা ছাহেব’।
বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর অবদান আছে অনেক। তিনি নিজে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি আলিয়া মাদরাসার বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে তাবলিগ জামাত প্রেরণ করেন। যেখানে ইসলাম প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তিনি কাকরাইল মসজিদের জায়গাটিও বরাদ্ধ দেন। টঙ্গির মাঠ কেয়ামত পর্যন্ত বরাদ্ধ দিয়েছেন ইজতেমার জন্য। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে তিনি পুনর্গঠন করেন ও সরকারি মর্যাদা দেন।
এছাড়াও ইসলাম, মুসলমান ও আলেম-উলামাদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। পাকিস্তানে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করার যে আন্দোলন হয়েছিল সেই সময় তিনি আইনগত সহায়তা করেছেন। ব্যারিস্টার ও লয়ারদের সহায়তা করেছেন। একজন গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিবিদের এই অবস্থান পরিস্কার করে দেয়, তিনি আকীদার জায়গায়ও অনেকখানি সচেতন ছিলেন।
তিনি যখন ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে এসে সর্বপ্রথম ভাষণে বলেছিলেন, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান দুইবার মরে না একবারই মরে। কথাগুলো বেশ গর্ব করেই বলেছিলেন।
তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন৷ পাকিস্তান স্বাধীন করার আন্দোলন করেছেন৷ কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ভাষণটি ছিল বঙ্গবন্ধুর মুখনিঃসৃত তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কথামালা। এই বক্তব্যের পর তিনি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেই ভাষণই বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে এগিয়ে আনে। এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর জীবন, আদর্শ ও তাঁর বিভিন্ন সময়ে প্রদান করা বক্তব্যকেও কৌশলে ইসলাম ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে দেয়া ভাষণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর কথায় কোনো ভীনদেশি আদর্শের প্রভাব ছিল না। তিনি জুলুমের বিরুদ্ধে সেই ভাষায়ই কথা বলেছেন, একজন বাঙালী মুসলিম বনেদী পরিবারের ছেলে যেই ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেছেন, মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব৷ এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেছেন, আমি রক্তের বিনিময়ে হলেও আপনাদের সঙ্গে বেইমানী করিনাই৷ আমাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দিয়েও নিতে পারে নাই। ফাঁসির কাষ্ঠের আসামি করেও নিতে পারে নাই। যেই রক্ত দিয়ে আপনারা আমাকে জেল থেকে বের করে এনেছিলেন, আমি বলেছিলাম আমার রক্ত দিয়ে হলেও এই রক্তের ঋণ আমরা শোধ করব। মনে আছে? আমি রক্ত দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। আমাদের মিটিং এইখানেই শেষ। আসসালামু আলাইকুম৷
বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবন বিশ্লেষণ করলে তাঁকে একজন বাঙালি মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং একজন অভূতপূর্ব নেতার বাইরে অন্য কোনো নেতিবাচক বিশেষণে ভূষিত করা যায় না। তিনি কখনই কমিউনিস্টপন্থী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। এদের আদর্শের প্রতি বরং তিনি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। সিরাজ শিকদারের ঘটনা থেকে বাম রাজনীতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর মনোভাব আরও পরিস্কার হয়ে ওঠে৷
তাঁর জীবনে তিনি বেশ কিছু সফল রচনা তৈরি করে গেছেন। তন্মধ্যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গুরুত্বপূর্ণ। এই জীবনীগ্রন্থ দুটিতে তিনি যত্নের সঙ্গে লিখে রেখেছেন অনেক প্রয়োজনীয় কথামালা। তাঁকে জানতে হলে এই গ্রন্থ দুটি অবশ্যপাঠ্য। আজ সাতই মার্চ। ঐতিহাসিক ভাষণের দিন। এই দিনে বাংলাদেশের মহান এ নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
