বাংলাদেশে কেন নবজাতককে ফেলে দেয়ার ঘটনা বাড়ছে?

ফাতেহ ডেস্ক:

ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গত ৬ বছরে ২১০ জন নবজাতককে পরিত্যক্ত ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে এক হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। এরমধ্যে শুধুমাত্র গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই উদ্ধার করা হয়েছে ২০টি নবজাতকের মরদেহ। মূলত বাংলাদেশের শীর্ষ ১৫টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তারা এই তথ্য দিয়েছে।

এসব ঘটনায় পুলিশ সাধারণ ডায়রির পাশাপাশি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠালেও এখন পর্যন্ত কোনো ঘটনার সুরাহা হয়নি।

ময়লার ভাগাড়ে, নালা নর্দমায়, ব্যাগে বন্দি অবস্থায় রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়, যানবাহন, শৌচাগার থেকে উদ্ধার হওয়া এসব নবজাতকের বেশিরভাগ থাকে গুরুতর আহত নাহলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেসব শিশু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়, তাদের স্থান হয় নিঃসন্তান কোন দম্পতির পরিবারে নাহলে সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে।

সাধারণত এসব শিশুকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের কাছে শিশুর নমুনা পাঠানো হয়। সেই নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে শিশুটির প্রোফাইল তৈরি করেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।

যদি কেউ শিশুর মা অথবা বাবা হিসেবে পরিচয় দাবি করে, তাহলে তাদের সাথে সেই শিশুর ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করা হয়। কিন্তু এই শিশুদের অধিকাংশকে স্বেচ্ছায় ফেলে যায় তাদের বাবা মা। এজন্য এর তদন্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান সিআইডির পুলিশ সুপার রুমানা আক্তার।

এছাড়া বহির্বিশ্বের মতো বাংলাদেশের সব মানুষের যদি ডিএনএ ডাটাবেজ থাকতো, তাহলে সহজেই শিশুর ডিএনএ ওই ডাটাবেজের সাথে মিলিয়ে মা-বাবাকে শনাক্ত করা যেতো বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘আমাদের যে ডিএনএ ব্যাংক আছে সেখানে শুধুমাত্র অপরাধীদের প্রোফাইল করা আছে। যেটার পরিসর অনেক সীমিত। যদি এই ডাটাবেজে বাংলাদেশের সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতো, তাহলে মুহূর্তেই বেরিয়ে যেতো এই শিশুর বাবা মা কে।’

সাধারণত বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক, স্বামী পরিত্যক্ত কিংবা ধর্ষণ থেকে জন্মানো শিশুগুলোর ক্ষেত্রেই এমন পরিণতি বেশি হচ্ছে বলে জানান অপরাধবিজ্ঞানীরা। এছাড়া ছেলে শিশু প্রত্যাশা করার পর মেয়ে শিশু জন্মানোর কারণেও অনেক পরিবার শিশুদের রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে বলে তারা জানান।

অপরাধবিজ্ঞানী ফারজানা রহমান বলেন, বাংলাদেশে সরকারিভাবে এসব শিশুর আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকলেও সচেতনতার অভাবে বা পরিচয় ফাঁস হয়ে সামাজিকভাবে হয়রানির মুখে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে বেশিরভাগই কোন ঝুঁকি নিতে চান না।

এমন অবস্থায় পারিবারিক বন্ধন ও নৈতিকতার শিক্ষা দৃঢ় করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। রহমান বলেন, ‘আমাদের সামাজিক কাঠামোতে অনেক বড় ধরণের প্রভাব পড়েছে, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বেড়ে গেছে, বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে, প্রযুক্তির অনেক বড় একটা প্রভাব আছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা জন্ম নিরোধ বিষয়ে সচেতনতার অভাবও একটা বড় কারণ। এছাড়া এই শিশুদের যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আশ্রয় দেয়া যায় সেটা জানা না থাকার কারণেও অনেকে এসবের দিকে ঝুঁকছে।’

বাংলাদেশের আইনানুযায়ী, কোনো শিশু মাতৃগর্ভে ৪ মাস পার করলে শিশুটি পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য হয়। এবং জন্ম হওয়ার আগে তার নামে সম্পত্তিও লিখে দেয়া যায়। তাই এই শিশুগুলোকে কারা ফেলে গেছে সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বলে তারা মনে করছেন।

সূত্র : বিবিসি

আগের সংবাদশতবর্ষ পূর্ণ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ
পরবর্তি সংবাদরাংগুনিয়ায় নায়েব সাহেব হুজুরের ইন্তেকাল, মুফতি ফয়জুল্লাহর শোক