বাংলাদেশে শিয়াদের তৎপরতা : সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই দাওয়াহ বিভাগগুলোর কাছে

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশে শিয়াদের কার্যক্রম ও তৎপরতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বর্তমান। শিয়া মতাদর্শের মাত্র ১০ লক্ষ মানুষের বসবাস এ ভূখণ্ডে, কিন্তু শিয়াদের রুসম-রেওয়াজ ও বিশ্বাসের প্রভাব দেশের বিপুল সংখ্যক সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ক্রিয়মাণ। জেনে না-জানে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ শিয়া মতাদর্শ ও বিশ্বাসের আনুকুল্যে নানা রুসম-রেওয়াজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। বিশেষত হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের প্রথম দশকে শিয়াদের নানাবিধ ভ্রান্ত কার্যক্রমে অসংখ্য সুন্নি মুসলমানদেরকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

সচেতন মহলের অভিযোগ, মহররমের প্রথম দশক ও কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়ারা প্রতি বছর যে অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে, এটাকে নানা কৌশল ও ধর্মের আবরণ পরিয়ে সার্বজনীনতার রূপ দানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে একটি গোষ্ঠী। যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারী মুসলমানদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশে শিয়া মতবাদের আগমন ও বিকাশ

খ্রিষ্ট অষ্টম শতাব্দীতে ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন ও প্রচার ঘটলেও শিয়া মতবাদের প্রচার ও বিস্তার ঘটে সতের শতকের প্রথম ভাগে। পারস্যের বণিক ও ভ্রমণকারীরা এ মতবাদ প্রচার করে।

বাংলার মুঘল শাসক শাহ সুজা সুন্নি হলেও শিয়া ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর মা মমতাজ বেগম ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী। তাঁর দরবারের অনেক আমির ছিলেন পারস্যের এবং শিয়া মতানুসারী।

শুধু তাই নয়, আঠারো শতকের প্রথমভাগের অধিকাংশ নবাবই ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতরাং এটা নিশ্চিত যে, তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার মুসলিম সমাজে শিয়া সম্প্রদায়ের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছিল।

ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁর অনুসারীদের শাহাদাতবরণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নবাব মুর্শিদকুলী খান মুহররম মাসের প্রথম দশদিন ছুটি ঘোষণা করেন। কালক্রমে মুহররম বাংলার অন্যতম বৃহৎ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। এমনকি, নবাবদের এবং শিয়া অভিজাত সম্প্রদায়ের সন্তুষ্টির জন্য হিন্দু জমিদাররাও জাঁকজমকপূর্ণভাবে মুহররম অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ নাটোর ও বর্ধমানের রাজাদের কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁরা সারা বাংলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় তাজিয়া নির্মাণ এবং তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করতেন। বড় বড় জমিদারদের প্রতিটি কাচারি থেকে সঙ্গীতসহ তাজিয়া মিছিল বের হতো। এসব তাজিয়া মিছিল বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত এবং তাঁদের অনেকেই এ মিছিলের ছবি এঁকেছেন।

ঢাকার নায়েব-নাজিমরা ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব বাংলার মুহররম অনুষ্ঠান অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যদিও এখানকার মুসলমানদের অধিকাংশই সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত। ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গণি ছিলেন সুন্নি সম্প্রদায়ের, কিন্তু তিনি তাঁর কাচারিতে ব্যাপকভাবে মুহাররম অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। নবাব পরিবারে মুহাররম অনুষ্ঠান পালনের এই ঐতিহ্য ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল।

বাংলাদেশে শিয়ারা সংখ্যায় কম এবং তারা প্রধানত ঢাকা শহরে বসবাস করে। ঢাকায় এখন শিয়া সম্প্রদায়ের মুহররম পালনের প্রধান কেন্দ্র ‘হোসেনে দালান’। এটি আঠারো শতকে জনৈক শিয়া বণিক নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু শিয়ারা দাবি করে এখানকার মাজার ১৪ শত বছরের পুরনো!

সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই দাওয়াহ বিভাগগুলোর কাছে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কিছু মাদরাসায় বাতিল ও ভ্রান্ত ফিরকার মোকাবেলায় উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র ‘দাওয়াহ বিভাগ’ আছে। বাতিল ও ভ্রান্ত ফেরকা এবং খ্রিষ্টান মিশনারিদের গ্রাস থেকে দেশের সরলপ্রাণ মুসলমান জনসাধারণকে বাঁচাতে এ বিভাগ কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশের শিয়া মতাদর্শীদের বর্তমান তৎপরতা ও কর্মকৌশল সম্পর্কে জানতে উল্লেখযোগ্য প্রায় সবকয়টি দাওয়াহ বিভাগে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিল ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে। কিন্তু শিয়া সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞাতির বাইরে কোনো দাওয়াহ বিভাগেই তাদের বর্তমান তৎপরতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসব দাওয়াহ বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, শিয়াদের তুলনায় অন্যান্য বাতিল ফিরকা ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতা বর্তমানে ভয়ংকর হয়ে উঠবার কারণে এ দিকটায় তারা খুব বেশি মনোযোগী হতে পারছেন না।

তরুণ দায়ী মাওলানা ইমরান হাবিবী জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় খ্রিষ্টান মিশনারিরা ভয়ানক মাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছে, শিক্ষা ও ধর্মের আলো থেকে দূরে থাকা সাধারণ শ্রেণির মুসলমানেরা দলে দলে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। দাওয়াহ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন বা করছেন, তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত অল্পসংখ্যক হবার কারণে খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতার মুকাবেলা করতেই হিমশিম খাচ্ছেন, ফলে শিয়াদের তৎপরতা বিষয়ে তাদের আলাদা কাজ করার সুযোগ হচ্ছে না।

তবে সচেতন মহল মনে করছেন, অন্যান্য বাতেল ফিরকার মুকাবেলার পাশাপাশি শিয়াদের মুকাবেলায়ও দেশের দাওয়াহ বিভাগগুলোর সচেতনতা ও ভূমিকা রাখা অতীব জরুরি।

আগের সংবাদমিসরে ইখওয়ানের সিনিয়র ১১ নেতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীরে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে পাক বাহিনীর ওপর ভারতের হামলা, নিহত ১