
|| তাসনিফ আবীদ ||
ভ্রমণ মানুষের মন প্রফুল্ল রাখে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি আনে, হৃদয়ে যোগায় সামনে চলার প্রেরণা। আবহমান কাল ধরে মানুষ সফর বা ভ্রমণ করে থাকে। বর্তমানে এটিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নানা দেশে তৈরি হয়েছে পর্যটন ব্যবস্থা। যান্ত্রিক জীবনে মানুষ নিজেকে একটু নির্ভার করতে ভ্রমণে মনোযোগী হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বেড়েছে পর্যটনে আগ্রহ। বিশেষ করে বর্তমানে হালাল পর্যটনে আগ্রহীদের তালিকা বাড়ছে বলেই লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশে হালাল পর্যটন নিয়ে গত দুইবছর ধরে কাজ করছে ‘সহযাত্রী।’ ‘সহযাত্রী’র যাত্রা শুরু হয় আলেম উদ্যোক্তা ও লেখক রোকন রাইয়ানের হাত ধরে।
ফাতেহের সঙ্গে আলাপচারিতায় রোকন রাইয়ান বলেন, ভ্রমণকে বলা যায় আনন্দময় ইবাদত। বিশেষ করে সেটা যদি ইসলামের দেখানো পথ অনুযায়ী হয় এবং সুন্নাহ মোতাবেক হয়। কিন্তু আজকাল আমরা ভ্রমণ করে থাকি নিছক বিনোদনের জন্য। সেখানে সুন্নাহর কোন ভালাই থাকে না। আল্লাহপাকের নিদর্শন দেখার কোন উদ্দেশ্য থাকে না। তাই ভ্রমণগুলো হয়ে ওঠে হাসিঠাট্টা, তামাশা আর অশ্লীলতায় ভরপুর। যার ফলে পর্যটন যে একটা বড় ইবাদতের জায়গা সেটা আমরা ভুলতে বসেছি। নানা কারণে আমরা এখন এটা অনুধাবনও করতে পারি না।
‘পর্যটন বা ভ্রমণকে ইবাদতময় করে তুলতে, হালাল পর্যটনকে বিকশিত করতে আমি উদ্যোগ নিই ‘সহযাত্রী’র। আলহামদুলিল্লাহ ‘সহযাত্রী’র ব্যানারে সারাদেশে প্রতিমাসে দুই তিনটি করে গ্রুপ যাচ্ছে। এছাড়া দেশের বাইরেও ট্যুর হচ্ছে। যেখানে আমাদের উদ্দেশ্য থাকে হালালভাবে বিনোদনের জায়গা খোঁজা।’ –জানান তিনি
রোকন রাইয়ান যুক্ত করেন, আমরা টানা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যাই। এই ক্লান্তিকে দূর করতে একটা অবসরের প্রয়োজন হয়। যাতে আবার ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে কাজে ফেরা যায়। পাশাপাশি যেন আল্লাহর অপার সৃষ্টি দেখে আমার ঈমানটা মজবুত হয়, ঈমান তাজা হয়। সেজন্য আমরা ‘সহযাত্রী’র মাধ্যমে ভ্রমণের আয়োজন করে থাকি।
‘আলহামদুলিল্লাহ আমাদের ভ্রমণ পুরোপুরি সুন্নাহ মোতাবেক হয়। নামাজ কাজা হয় না। যে সফরে নারীরা থাকেন তাদের সম্পূর্ণ পর্দা মেইনটেইন করা হয়। তাদের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা হয়। খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সম্পূর্ণ শরিয়া ভিত্তিক আয়োজন থাকে আমাদের। এভাবে আমরা হালাল পর্যটনকে ছড়িয়ে দিচ্ছি।’ –তথ্য দেন তিনি
তিনি জানান, আমরা অল্প সময়ে এতো ভালো সাড়া পাবো ভাবিনি। সুন্নাহর মাঝে নিশ্চয়ই একধরণের ভালো লাগা কাজ করে। সেই ভালো লাগা থেকে মানুষ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। হালাল পর্যটনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে।
এদিকে বরিশাল জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া মাদ্রাসার উস্তাজুল হাদিস মুফতি মুহাম্মদ জাকারিয়া ভ্রমণ বা সফর বিষয়ে ইসলামের আলোকে বেশকিছু পরামর্শ ও নির্দেশনা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, শান্তির ধর্ম ইসলাম মানুষকে ভ্রমণ বা সফর বিষয়ে উৎসাহ জোগায়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি রহস্যের নানা উপকরণ। প্রতি মুহূর্তে মানুষকে তা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মন প্রফুল্ল রাখতে ও শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখতে এবং জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। তাইতো প্রতিনিয়ত মানুষ বিশাল এ ধরিত্রীর নানা অংশে ছুটে যায় সৃষ্টির বিশালতা আর প্রকৃতির রূপকে আপন করে দেখতে। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ভ্রমণের মাধ্যমে তাঁর অসীম ক্ষমতা ও সৃষ্টির বিশালতা অবলোকন করে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীজুড়ে বিশ্বাসীদের জন্য আছে অসংখ্য নিদর্শন।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ২০)
তিনি বলেন, তবে ভ্রমণের বিষয়ে ইসলাম যেমন উৎসাহিত করে, তেমন নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিকে মাথায় রাখার পরামর্শ দেয়। যেমন- সফরের সিদ্ধান্ত হলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সফরকারী তার পরিবারের জন্য দুই রাকাত নামাজের চেয়ে ভালো কিছু রেখে যায় না। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা, হাদিস : ৪৯১২)
যতটা সম্ভব একাকী সফর পরিহার করা। একাকী সফর নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই ভালো কাউকে সফরসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সঙ্গীহীনতায় কত কী সমস্যা! আমি যেমন জানি, তোমরাও জানলে রাতে একাকী কখনো সফর করার সাহস পেতে না। (বুখারি, হাদিস: ২৯৯৮)
অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউকে গ্রুপ লিডার নির্বাচন করা। যিনি পরামর্শের ভিত্তিতে সফরের দায়িত্বগুলো সম্পন্ন করবেন। অন্যদের কাজ হবে তার নির্দেশনা মেনে চলা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সফরে তোমরা যদি তিনজন হও, একজনকে আমির (গ্রুপ লিডার) নিযুক্ত করো। (আবু দাউদ, হাদিস, ২৬০৯)
