রাগিব রব্বানি:
বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে ‘ইসলাম-বিদ্বেষে’র অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। একাডেমির অনেক কর্মকাণ্ডে এই বিদ্বেষ ফুটে উঠছে প্রকটভাবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে ব্যাপারটা আবারও সামনে এসেছে। একুশে গ্রন্থমেলায় অভিজাত ইসলামি প্রকাশনীগুলোকে কোনো স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় না বিগত অনেক বছর ধরে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে একাডেমি প্রকাশিত আধুনিক বাংলা অভিধানে নানাভাবে ইসলাম বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে বলে অভিযোগ বোদ্ধা মহলের। ফলে ইসলাম-সম্পর্কিত এসব ব্যাপারে বাংলা একাডেমির অনীহাকে অনেকেই পরিকল্পিত ও বিদ্বেষমূলক বলে আখ্যায়িত করছেন।
ইসলামি প্রকাশনীগুলোকে স্টল না দেওয়া
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় লটারির ভিত্তিতে। সাধারণত মেলা শুরুর পনেরো-বিশ আগে এই লটারির আয়োজন করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। তার আগে প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত নিয়মনীতি অনুসরণ করে বাংলা একাডেমিতে স্টলের জন্য আবেদন করে, নিয়মনীতি ঠিকটাক মতো যারা অনুসরণ করে লটারির জন্য সেসব প্রতিষ্ঠানের নামই কেবল বাছাই করা হয়।
সাধারণ ধারার প্রকাশনীগুলোর সাথে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামি প্রকাশনীও স্টলের জন্য আবেদন করে। কিন্তু অজানা কারণে এ প্রকাশনীগুলোকে স্টল দেওয়া হয় না।
ইসলামি ঘরানার প্রকাশনীগুলো অভিযোগ করে আসছে, কেবল ইসলাম-সম্পর্কিত বইপত্র ছাপার কারণেই তারা স্টল পায় না। নয়তো ইসলামি ঘরানার এতগুলো প্রকাশনী প্রতি বছর আবেদন করে, প্রায় প্রত্যেকেই বাংলা একাডেমির যাবতীয় নিয়মকানুন অনুসরণ করেই আবেদন করে, প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ হয়ে থাকে তাহলে লটারিতে অন্তত একটা প্রকাশনীর তো নাম ওঠার কথা। কিন্তু ওঠে না।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রকাশনী মালিক জানিয়েছেন, বাংলা একাডেমি আরবি নামের কোনো প্রকাশনী দেখলে তাকে স্টল দেয় না। এটা তাদের অঘোষিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরবি নামের বাইরে বাংলা এবং ইংরেজি নামের যে সমস্ত প্রকাশনী ‘ইসলামি প্রকাশনী’ রূপে আছে, এবং যাদের অধিকাংশ বইই ইসলাম সম্পর্কিত, তাদেরকেও বাদ দেওয়া হয় বাছাই থেকে।
আধুনিক বাংলা অভিধান থেকে অনেক আরবি-ফারসি শব্দ মুছে ফেলা হয়েছে
২০১৬ সালে বহুল চর্চিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়ে বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ নামে পরিমার্জিত নতুন একটি অভিধান প্রকাশ করে। অভিধানটি নিয়ে শুরু থেকেই ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
পরিমার্জিত এই নতুন অভিধানে ইসলাম ও মুসলিমদের বিশেষ ভাষা ও পরিচয়গত প্রচুর শব্দ কাটছাট করার অভিযোগ আছে। সচেতন মহল বলছেন, অনেকাংশে বাদ দেওয়া হয়েছে ইসলাম ধর্মীয় ও স্থানিক পরিচয়।
বাংলা একাডেমির প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ এবং নতুনভাবে প্রকাশিত ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ ঘেঁটে দেখা গেছে, পুরনো অভিধানে আরবি-ফারসিজাত শব্দের অনেক বাড়তি সংস্থান ছিল, যেগুলো অভিধানভুক্ত থাকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিদ্যমান। কিন্তু নতুন প্রকাশিত আধুনিক অভিধানে সেই শব্দগুলোর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মুছে ফেলা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন এই অভিধানে আরবি-ফারসি শব্দের ক্ষেত্রে ‘মূল’ শব্দের উল্লেখ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে করা হয়নি; অর্থাৎ এ শব্দগুলোর উৎস জানালেও বুৎপত্তি নির্দেশ করা হয়নি। অথচ সংস্কৃত ও ইংরেজি শব্দের ক্ষেত্রে প্রতিটা শব্দে উৎসের সঙ্গে বুৎপত্তিও নির্দেশিত হয়েছে। ব্যবহারিক অভিধানে এই অসমতাটা ছিল না।
নতুন অভিধানে হিন্দুত্ববাদের উৎকট গন্ধ
আরবি-ফারসি, ইসলাম ও মুসলমান মানেই বিদেশি, আর হিন্দু ধর্ম, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান মানেই দেশি এবং সর্বজনীন—বাংলা একাডেমির আলোচ্য অভিধান পরিমার্জনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এমন একটি সাম্প্রদায়িক ধারণায় প্রাণিত কিংবা প্রতারিত হয়েছেন বলে মন্তব্য করছেন বোদ্ধা মহলের অনেকেই।
কারণ, নতুন অভিধানে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস আর আচারের সাথে সম্পর্কিত ভুক্তিগুলোতে সাধারণভাবে ‘হিন্দু’ কথাটার উল্লেখ নাই। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমান-সংক্রান্ত শব্দগুলোর ক্ষেত্রে তা নিয়ে আসা হয়েছে। ‘দীপাবলি’, ‘পূজা’, ‘পূজার্চনা’, ‘একাদশী’, ‘দুর্গাপূজা’, ‘পুনর্জন্ম’, ‘সন্ন্যাস’, ‘মনসা’ ইত্যাদি ভুক্তিগুলো পড়লে কিছুতেই বোঝা যাবে না, এর সাথে হিন্দু ধর্ম বা সংস্কৃতির বিশেষ কোনো যোগ আছে। কিন্তু ‘ইদ’, ‘ইদুল আজহা’, ‘ইদুল ফেতর’, ‘অজু’, ‘রোজা’ প্রভৃতি শব্দের পরিচয়ে ব্যতিক্রমহীনভাবে মুসলমান বা ইসলামের কথা বলা আছে। ‘গয়া’ ও ‘কাশী’র ক্ষেত্রে কোনো বর্ণনা না থাকলেও ‘মক্কা’ যে মুসলমানের তীর্থস্থান তা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই, ভাষা-জাতীয়তাবাদের খুব কাঁচা আর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আছে (বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানের) এই কাজে।
তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে এটা সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়াশীলতা, আর অভিধানের দিক থেকে চরম পশ্চাৎপদতা। কারণ, স্থান-কাল-সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়-নিরপেক্ষতা আমাদের দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা হতে পারে, কিন্তু ভাষার স্বভাব নয়।
