
রাকিবুল হাসান :
চাকরির সংকট ও জীবনমানের অবনতিতে প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদির সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে ইরাকি জনগণ। তাদের দাবি এবং শ্লোগান একটাই—তারা এই সরকারের উৎখাত চায়। কিন্তু হঠাৎ করেই কেন তারা রাস্তায় নেমে এলো?
এর পেছনে দুটি ঘটনা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। এক. স্নাতক ডিগ্রিধারীদের চাকরির সংকট। চাকরির দাবি নিয়ে তারা আগে থেকেই বিক্ষোভ করে আসছে। এর বিপরীতে সরকার চাকরির ব্যবস্থা না করে কঠোর হস্তে তাদের দমন করেই গেছে। দুই. সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক কমান্ডার আবদুল ওহাব আস সাদীকে প্রতীরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানের দায়িত্বে স্থানান্তর। এই দুইটি ঘটনা জনসাধারণকে ক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাবেশের আহ্বান ক্রমেই জোরালো হয়।
বিক্ষোভের হালচাল
গত মঙ্গলবার বাগদাদ নগরীর প্রাণকেন্দ্র তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে ইরাকের জনগণ। এ সময় নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী রাজধানীর সব প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেয়। বিক্ষোভ দমনে কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালায় পুলিশ। মানবাধিকার কমিশনের মতে, এতে চারজন বিক্ষোভকারী নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হন। এই হতাহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানী সদর সিটি, জাফরানিয়াসহ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাগদাদের আশপাশের শহরগুলোও।
এদিকে বিক্ষোভ বানচাল করতে আজ বৃহস্পতিবার শহরজুড়ে কারফিউ জারি করেছে সরকার। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত কারফিউ জারি থাকবে বলে জানানো হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি বলেন, বৃহস্পতিবার স্থানীয় বিকাল ৫টা থেকে বাগদাদে সব ধরনের যান এবং মানুষ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। তবে এই কারফিউয়ের আওতায় বিমানবন্দরে আসা ভ্রমণকারী, অ্যাম্বুলেন্স, সরকারি হাসপাতালের কর্মচারী, বিদ্যুৎ ও পানি বিভাগ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা থাকবে না।
বিক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন
২০১৮ সালেও চাকরির সংকট ও জীবনমানের অবনতিতে এমন বিক্ষোভে নেমেছিল ইরাকিরা। কিন্তু এবারের বিক্ষোভ নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু প্রশ্ন। হঠাৎ করেই এই ধরনের বিক্ষোভ কতটুকু বৈধ ও যুক্তিসম্মত? বিক্ষোভের লক্ষ্যই-বা ঠিক কী? তাদের নেতৃত্বে নেই কোনো নেতা। কয়েকজন ব্লগার এই প্রশ্ন তুলেই লিখেছেন, ‘নেতৃত্বের অভাব এবং তরিৎ ঘোষণায় পরিকল্পনাহীন বিক্ষোভ কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।’
শেখ জাশআম ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘একটি গ্রহণযোগ্য আন্দোলনের প্রধান শর্ত হলো উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব থাকা। যে নেতৃত্ব তাদের দাবিগুলো সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরবে এবং আন্দোলনে সমন্বয় সাধন করবে। স্পষ্ট এবং যুক্তিসঙ্গত দাবি থাকাটাও আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ কিন্তু বর্তমান বিক্ষোভটিকে বলা হচ্ছে নেতৃত্ব এবং উদ্দেশ্যহীন বিক্ষোভ।
বিক্ষোভকারীদের প্রতিক্রিয়া
তবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী আলী ফায়েজ মনে করেন, ‘বিক্ষোভের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আর তা হলো—উন্নত জীবনমান নিশ্চিতকরণ।’ পুলিশের লাঠিচার্জ এবং গুলি থেকে পালিয়ে এসেছেন তিনি। হাঁপাতে হাঁপাতেই বললেন, ‘আমাদের এই বিক্ষোভের দাবি—প্রধানমন্ত্রী আবদুল মাহদি’র পদত্যাগ এবং এই বিক্ষোভে হামলার জন্য দায়ী সকলের বিরুদ্ধে মামলা করা।’
বাগদাদের কেন্দ্রে বাব আল-শার্কির ফ্লাইট ইয়ার্ডে বিক্ষোভে আসা এক ব্যক্তি তার হাতের ইরাকি পতাকা দুলিয়ে বললেন, সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না। এটি একটি যুবসমাজের আন্দোলন। কোনো পার্টির পদলেহন করে এর জন্ম নয়। এটিকে বিক্রি কিংবা ক্রয় করা যাবে না।’
বিক্ষোভ কি প্রভাব ফেলবে?
মুস্তানসিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. আথির আল জাসুর মনে করেন, এই বিক্ষোভ ইরাকের রাজনৈতিক দৃশ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আল জাজিরা অনলাইনকে জাসুর এই বিক্ষোভের তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ এই বিক্ষোভ তিনটি জিনিসকে খুব প্রকট করে তুলবে। ১. নাগরিকের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সরকারের অক্ষমতা। ২. বিক্ষোভ মেটাতে এবং মহাসড়কগুলোতে সরকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা। ৩. গণসচেতনতা।
কেউ কেউ বলছেন, এই বিক্ষোভ সরকারকে মারাত্মক সংকটে ফেলতে পারে।
আল জাজিরা অবলম্বনে
