বিক্ষুব্ধ ইরাক ও লেবানন : আরব বসন্ত ফিরে আসছে?

বিক্ষুব্ধ ইরাক ও লেবানন : আরব বসন্ত ফিরে আসছে?

মুনশী নাঈম :

আরব বসন্তের আট বছর পর আবারও সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয় উঠছে মধ্যপ্রাচ্য। বেকারত্ব আর জীবনমান উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে ইরাক ও লেবাননে। নতুন করে বিক্ষোভের চেষ্টা হয়েছে মিশরেও। মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদাল ফাত্তাহ আল সিসির পুলিশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনতার বিক্ষোভ চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। মিশরে বিক্ষোভ থামানো গেলেও থামানো যায়নি ইরাক ও লেবাননে।

ইরাক, লেবানন এবং মিশরের মধ্যে ভিন্নতা প্রচুর। কিন্তু আরব মধ্যপ্রাচ্য-জুড়ে বিরোধীদের ক্ষোভের চিত্র অভিন্ন এবং তাতে লাখ লাখ লোকের অংশগ্রহণ ঘটেছে, বিশেষ করে তরুণদের। মোটামুটিভাবে ধারণা করা হয় যে, এই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। লেবানন, ইরাক অঞ্চলের এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই গ্রাস করছে হতাশা, যা সহজেই পাল্টে রূপ নেয় ক্ষোভে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও’র তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় মধ্যপ্রাচ্যে তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত এক দশকে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় এখানে বেকারত্ব আরও বেশি বেড়েছে। আরব ও উত্তর আফ্রিকার তরুণদের প্রায় ৩০ শতাংশই কোনো কাজ পাচ্ছে না।

ইরাকে বিক্ষোভ

চাকরির সংকট ও জীবনমানের অবনতিতে প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদির সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে ইরাকি জনগণ।

এই বিক্ষোভ আচমকা হয়নি। বরং ইরাকে কয়েক বছর ধরে বড় দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং জনসেবা খাতের ব্যর্থতার প্রতিবাদে কিছুদিন পরপরই বিক্ষোভ হয়ে আসছে। ইরাকের প্রেক্ষাপটে মর্মান্তিক এক বাস্তবতা হলো, যখন বিক্ষোভকারীরা বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন, রাজপথ দখল করে বিক্ষোভ দেখান, তা খুব একটা স্থায়িত্ব পায় না। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি চালানো হয়।

তবে কয়েক বছর ধরে যে ধরনের বিক্ষোভ বা আন্দোলন হচ্ছে, এবারের আন্দোলন সেগুলো থেকে অনেকটাই আলাদা। তা এ কারণেই যে এবারের বিক্ষোভ হয়েছে সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এই বিক্ষোভ কারও ডাকে হয়নি। কোনো সংগঠন, কোনো দল বা গ্রুপ এর আয়োজন করেনি।

ইরাকের এলিট কাউন্টার টেররিজম বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল ওয়াহাব আল সাদির পদাবনতির ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এই বিক্ষোভ শুরু হয়।

দুই বছর আগে মসুলকে আইএসমুক্ত করার কারণে আল সাদি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। জাতীয় বীর হিসেবে জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠা আল সাদি জাতিগত বিভেদ দূর করে ইরাকি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। আল সাদির পদাবনতিকে জনগণ ইরাকের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার একটি ‘সিম্পটম’ বা রোগলক্ষণ হিসেবে নিয়েছে।

অন্যদিকে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের চাকরির সংকট। চাকরির দাবি নিয়ে তারা আগে থেকেই বিক্ষোভ করে আসছে। এর বিপরীতে সরকার চাকরির ব্যবস্থা না করে কঠোর হস্তে তাদের দমন করেই গেছে।

ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন–পীড়ন আগেও চালিয়েছে, কিন্তু এবার যা করেছে তা একেবারে নজিরবিহীন। বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ২৮০ জনের ওপর বেসামরিক ইরাকি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি। সরকারের অকার্যকর ব্যবস্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রতিবাদ করতে আসা নিরপরাধ ইরাকিদের খোদ ইরাকি নিরাপত্তাকর্মীরা গুলি করে মেরেছেন।

প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও থামেনি বিক্ষোভ।

লেবাননে বিক্ষোভ

অন্যদিকে মার্কিন ডলারের সংকট, বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে দ্রব্যপণ্যের উপর মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি, হোয়াটস অ্যাপের কল রেট বৃদ্ধি ও বর্তমান সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে লেবাননের জনগণ। ঘটনার প্রক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি হোয়াটস অ্যাপের কল রেট বৃদ্ধি না করার ঘোষণা দিলেও থামেনি বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীরা সরকার পতনের দাবিতে অটল থাকে। ফলে প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি পদত্যাদ করতে বাধ্য হয়।

লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদ আরাইসি বলেন, তরুণরা যদি কাজ না পায়, সেদেশের অর্থনীতিতে যদি ভূমিকা না রাখতে পারে, তাহলে তারা কোথায় যাবে? তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়বে। সমাজে নতুন নতুন অপরাধ বাড়বে। যেকোনো দেশের জন্য বেকারত্ব ভয়াবহ একটি সামাজিক সমস্যা।

আরব বসন্ত ফিরে আসছে?

তাহলে কি আবার আরব বসন্ত ফিরে আসছে মধ্যপ্রাচ্যে? ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর নিজের গায়ে আগুন দিয়ে যে বসন্ত এনে দিয়েছিল দিয়েছিলো তিউনিসিয়ার নাগরিক সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ বুয়াজিজি। দেশটির সরকারের ঘুষ, দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তা ছিল এক জ্বলন্ত বিদ্রোহ।

গণঅভু্যত্থানে শেষ পর্যন্ত দেশটির তিন দশকের স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে। স্বৈরশাসনের দীর্ঘ অন্ধকার শেষে উদিত হয় গণতন্ত্রের সূর্য। এরপর বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরববিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে। তিউনিশিয়ার পর মিসরেও গণবিদ্রোহ সফল হয়। পতন হয় আরেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হলেও ফের স্বৈরশাসনের জাঁতাকল চেপে ধরেছে দেশটিকে।

আরব বসন্তের স্পিরিট নিয়ে গত বছরই বিক্ষোভ শুরু হয় সুদানে। গণঅভু্যত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল বসির। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে আলজেরীয় বিপ্লব। নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলনে পদত্যাগের ঘোষণা আসে ২০ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকার পক্ষ থেকে।

এরপর ইরাকে, লেবাননে, মিশরে এই বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মিশরে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমন করে। লেবাননে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে। ইরাকে এখনও বিক্ষোভ চলছে। বেড়ে চলছে হতাহতের সংখ্যা।

যেসব ঘটনা ২০১১ সালের আরব বসন্তকে উসকে দিয়েছিল সেখানে তা এখনো বহাল। কোথাও কোথাও আরও গভীর হয়েছে। একটি বিশাল এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদাগুলি পূরণে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার ব্যর্থতার নিশ্চয়তা দেয় যে, বিক্ষোভের পেছনে কাজ করা ক্রোধ এবং হতাশা সহসা দূর হচ্ছে না।

আগের আরব বসন্ত এবং এবারের বসন্তে পার্থক্য কোথায়?

প্রথম আরব বসন্তে তুলনামূলক নিরাপদ ছিল ইরান, তুরস্ক ও কাতারের শাসকেরা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ, তুরস্কের রজব তাইয়্যেব এরদোগান এরই মধ্যে একটি অভ্যুত্থান–প্রচেষ্টা সামলেছেন। কাতার রয়েছে অবরোধের মধ্যে। দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তাঝুঁকিও রয়েছে। ইরান আবারও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে।

আবার আট বছর আগে কাতারভিত্তিক সম্প্রচার চ্যানেল আল-জাজিরা হয়ে উঠেছিল আরব বসন্তের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রচারকেন্দ্র। কিন্তু আরব বসন্তের পর প্রতিটি দেশ সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের ক্ষেত্রে সৌদি নেতৃত্বাধীন চার দেশ যে ১৩টি শর্ত দিয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে আল-জাজিরা বন্ধ করা। আরব অঞ্চলের প্রতিটি দেশে সংবাদপত্র ভীষণভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। দেশগুলোর তথ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে সংবাদ শিরোনাম। নিষিদ্ধ করা হচ্ছে বিদেশি সাংবাদিকদের। আর স্থানীয়দের এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টানা যায়।

তারপরও থেমে থাকছে না আন্দোলন। ইকোনমিস্ট বলছে, আগেরবারের মতো এবারও অন্যতম চালিকা শক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে এবারে আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন জনপ্রিয় করতে এখনো কোনো জনপ্রিয় হ্যাশট্যাগ চালু করতে পারেনি।

আগের সংবাদবাংলাদেশে বন্ধ থাকলেও মালদ্বীপে ঠিকই পেঁয়াজ রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে ভারত
পরবর্তি সংবাদবাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয় : ধর্মীয় পরিসরেও সচেতনতা প্রয়োজন