মুজাহিদুল ইসলাম:
বছরের শেষে সচেতন মানুষ পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করে। ব্যর্থতার খতিয়ান মলাটবদ্ধ করতে নতুন বছরে নতুন উদ্যমে নতুন সফলতার জন্য আশায় বুক বাঁধে। তবে এটা সকলের ভাগ্যে জুটলেও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত কারাগার ফিলিস্তিনের গাজার জন্য নতুন বছর বলে কিছু নেই। তাদের জন্য নতুন বছরের আগমন ঘটে নতুন বিষাদ ও আশংকার কালো মেঘ নিয়ে। জীবন রক্ষাকারী পানির সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রসহ কোথাও আশার আলো তো দূরের কথা, বরং দুঃখ-দুর্দশা সামান্য লাঘবের ব্যপারেও তারা আশাবাদী হতে পারছে না। তাছাড়া ২০১২ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে গাজার ওপর অবরোধের অবসান ও তাদের জীবনমানের উন্নয়ন না ঘটাতে পারলে ২০২০ সালে গাজা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠার ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন তাদের চোখের সামনে। ২০২০ সাল গাজার মানুষের সামনে উপস্থিত। তাদের জবানিতেই উঠে আসছে ২০২০ সালে কেমন যাবে তাদের জীবন।
পরিবেশ ও খাবার পানির সংকট
গাজার ৯৫ শতাংশ পানি পানের অনুপযোগী। এমনকি সাধারণ কাজ-কর্মের জন্যও অনুপযোগী। অথচ মাত্র পাঁচ শতাংশ গাজার বাসিন্দার পরিশোধিত পানি ক্রয়ের সামর্থ্য আছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে চলে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে মানুষের নূন্যতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অর্থনৈতিক সংকট ও ইজরাইলের আগ্রসনের জন্য চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে বলে জানান পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আহমাদ বশির। আর ২০২০ সালের গল্পে হতাশার হাসি ঠোঁটে নিয়ে বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর জলাভূমিতে বাস করছি। আমাদের জীবনযাত্রার অবস্থা ও স্বার্থের প্রতি কারো কোনো মনোযোগ নেই। ২০২০ কেন ২০২৫ সালেও আমাদের চরম অবনতি ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন নেই।’
বেকারত্ব
গাজায় বেকারত্বের হার ৫০ ভাগ। এর মধ্যে অর্ধেকই উচ্চশিক্ষিত। ২০১৯ সালে পাঁচশোর বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এ যুগের ফুয়েল জ্বালানি। কিন্তু ফিলিস্তিনে বর্তমানে দিনের বেলায় মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য বিদুৎ দেয়া হয়। আর কলকারখানার কথা তো বাদ। আগে গাজা থেকে কাজের জন্য কারও পশ্চিম তীরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে নেই। অনেকে বেকারত্বের জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা
গাজার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা তো আছেই। ফিলিস্তিনি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, চিকিৎসক সংকট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ঔষধের ঘাটতিও রয়েছে।
৮০ বছর বয়সী নারী কারাচাহ জানান, ’২০১৯ আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। ১৯৬৭ থেকেেএ পর্যন্ত এমন বাজে সময় কাটাইনি। আমি দরিদ্র মানুষ। আমার ঔষধ ক্রয়ের পয়সা নেই। বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে আমার ঔষধ গ্রহণ। তাছাড়া গাজাতে প্রয়োজনীয় সকল ঔষধ ইজরাইল প্রবেশ করতে দেয় না।‘
অন্যদিকে তিন বছর আগে মস্তিস্ক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সন্তানের পিতা টেক্সি চালক আতাউল্লাহ বলেন, ’আমার ছেলে গাজায় ডায়ালাইসিসের অপেক্ষায় থেকে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু তাকে তো আবার গাজার বাইরেও নেয়া সম্ভব নয়, কারণ দখলদাররা সহজে অনুমতি দেয় না। অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার মধ্যেই আমার সন্তানের মৃত্যু হয়। আমরা মৃত্যুর এক স্বয়ংক্রিয় ভূমিতে বাস করি। বছরে বছরে আমাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে। আমরা আরো রোগাক্রান্ত হবো। কোনো সালই আমাদের কোনো পরিবর্তন আনবে না।’
শিক্ষা
২০১৯ সালে উচ্চশিক্ষাগ্রহণরত গাজার হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। কারণ, দিন দিন গাজার অর্থনৈতিক ক্রমাবনতি তাদের আর পাঠ অব্যাহত রাখার সুযোগ দেয় না। তাছাড়া কাজের সুযোগ না থাকায় গ্রাজুয়েশন সম্পন্নকারীরা অনুজদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনুৎসাহিত করেন।
২০১৩ সালে ভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্নকারী সামী আবু হাতাব ২০২০ সালে গাজা বসবাসের অনুপযুক্ত হওয়ার বিষয়ে বলেন, আশ্চর্যের কী আছে, ২০২০ সাল আমার মতো অনেক যুবককে ভবিষ্যতের সমাধান করতে না পারায় আত্মহত্যার চিন্তা করতে বাধ্য করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন নতুন শিক্ষার্থীকে দেখি, তারা তাদের পিতামাতাকে ভার্সিটির ব্যায় মেটাতে বাধ্য করে, অথচ সামনে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার, অনেক কষ্ট হয়। তাদের পড়াশোনায় উৎসাহ আর দিই না। আমাদেরকে ফিলিস্তিনি দলগুলোর বিভাজন ও স্থানীয় রাজনীতির বলি হতে হচ্ছে। বিশ্ব আমাদেরকে পরীক্ষার গিনিপিক বানিয়েছে। যুদ্ধ ও বিপর্যয়কর পরিবেশে বাস করা জনগোষ্ঠীর সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করছে বিশ্ব।’
সমুদ্রসীমা সংকোচন
ইজরাইলি অবরোধের পাশাপাশি আগে যেখানে উপকূলের জেলেরা ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত মাছ শিকার করতে পারতো, এখন তাদের এ বছর ১০ কিলোমিটারের অনুমতি দিচ্ছে ইজরাইল।
রাজনীতি
ফিলিস্তিনের রাজনীতি নিয়ে নাবলুস শহরের ব্যবসায়ী সাবের বলেন, তারা নির্বাচনের কথা বলছে। আমি মনে করি না যে, এটা নতুন বছরে হবে। মানুষের অবস্থা খারাপ। নির্বাচনের থেকে তাদের নিকট দৈনিক আহার্যের প্রতি মনোযোগ বেশি।
আমেরিকান ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স হোল্ডার নুর আহমাদ রাজনীতিতে কোনো ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব ও দলগুলোর রাজনৈতিক ভাষণে নতুন বছরে পাওয়ার মতো কোনো উপাদান পাওয়া যায় না।’
সমাধানের উপায়
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বলেন, ‘আমরা ফিলিস্তিনিরা মৃত্যুর অভাবে জীবিত।’ এ সমস্যা সমাধানের উপায় হলো, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গাজায় বাস্তুচ্যুতদের ফিরে আসতে দেয়া, ইজরাইলের অবরোধের অবসান ঘটানো, গাজায় নতুন নতুন বিনিয়োগ করা এবং হামাস ও ফাতাহের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সংকট উত্তরণ এবং গাজাকে বসবাসের উপযোগী করা সম্ভব।
তার মতে, গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের দায় সবচেয়ে বেশি। কারণ, তারা ২০১২ সালে সতর্কতা জারি করে গাজাকে উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যদি গাজার বাসিন্দাদের এটা করতে হয়, তবে জাতিসংঘের কোনো কিছু বলার দরকার হয় না।
সবশেষে বলা যায়, এই নির্যাতিত ভূখণ্ডের মানুষ নতুন বছর দখলদারিত্বের অবসানের আশা দিয়ে শুরু করেছে। এই আশাবাদই হয়তো তাদেরকে আরও কিছু দিন বাঁচিয়ে রাখবে। মৃত্যুর অভাবে তারা জীবত থাকবে। ২০২০ সালে তাদের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে না।
