বিদেশী ভাষায় ইসলামী সংগীত : সমকালীন ধারা ও সংস্কৃতি

আব ত্বোয়াহা

আজ থেকে প্রায় ১৯ বছর আগে, বৃটিশ-আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত, সদ্য ধর্মের প্রতি অনুরাগী হওয়া এক তরুণের একটি ইসলামি সংগীতের অ্যালবাম বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। সেই তরুণের নাম সামি ইউসুফ, আজ তার বয়স প্রায় ৪০। মুসলিম বিশ্বে ‘ইসলামী সংগীত’র জগতে আজ সামি বেশ পরিচিত মুখ। ২০০৫ সালে তার বেস্টসেলার অ্যালবাম ‘মাই উম্মাহ’ তাকে এনে দিয়েছিল ‘ইসলামের সবচে জনপ্রিয় রকস্টার’ উপাধি।

গত শতকের শেষদিক থেকেই, কিংবা ধরা যাক, ৯/১১-এর পর থেকেই, বিভিন্ন কারণে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমানরা সংগীতের ক্ষেত্রে ধর্মীয় একটা ধারার তালাশে ছিলেন। এর ফলে গোটা বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে ইসলামী সংগীতের এক বিশাল ইণ্ডাস্ট্রি।

যদিও ইসলামে ‘মিউজিক’ বা ‘সংগীত’ বেশ বিতর্কিত ও আলোচিত একটি বিষয়। ৯/১১ পরবর্তী ‘গুড মুসলিম’ প্রকল্পকে সন্দেহের চোখে দেখে মুসলিম স্কলারদের অনেকেই এর ব্যাপারে বেশ কঠোর মন্তব্য করেছেন। অনেক পিউরিটান মুসলিমও গান বা সংগীতের এই ইন্ডাস্ট্রিকে ভাল চোখে দেখেন নাই। ২০০৬ সালে, তালেবানদের হাতে ধরা পড়া এবং পরবর্তীতে মুসলমান হওয়া সাংবাদিক ইভন রেডলি সামি ইউসুফকে একটা খোলা চিঠি দিয়েছিলেন, যা সেসময় বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। সামি ইউসুফ এবং এই ধারার ইসলামি সংগীত মুসলিম নারীদের মধ্যে যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, ইভানের মতে সেটা ছিল খুব মারাত্মক একটা ব্যাপার। এই উন্মাদনা ‘মুসলিম বিশ্বকে বিষাক্ত করে তুলছে’, এমনই ছিল ইভানের মতামত।

তবে, ইসলামি সংগীতের এই প্রবল বিরোধিতাকে কেউ কেউ আরো একটা গভীর সমস্যার ফলাফল বলে মনে করেন। লণ্ডনের একজন ইমাম ও স্কলার ড. মুহাম্মদ ফাহিমের মতে, বিংশ শতকে ওয়াহাবিজম ও সালাফি ইসলামের যে বিপুল প্রসার, সেটি ইসলামে যেকোন ধরণের আর্ট বা শিল্পমনস্কতার বিরোধী একটি ব্যাখ্যা তৈরি করেছে। তার মতে, ইসলামে সংগীত খুবই সিদ্ধ একটি ব্যাপার, যদি গানে বা শিল্পীর পোশাকে অশ্লীল কিছু না থাকে। মিসসের বিখ্যাত ইসলামি স্কলার ড. ইউসুফ কারজাভি তার ‘ইসলাম ও শিল্পকলা’ গ্রন্থেও প্রায় একইরকম মতামত ব্যক্ত করেছেন। এমনকি, অসংখ্য দলিলের মাধ্যমে তিনি ‘মিউজিক’ বা ‘বাদ্যযন্ত্র’কেও ইসলামে সিদ্ধ বলে মত দিয়েছেন। থিওরিটিক্যালি ডিবেট জারি থাকলেও, মুসলিম বিশ্বের বেশ বড় একটি অংশ, কার্যত এই মতামতকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এমনকি ভারত উপমহাদেশেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বেশ আগে থেকেই। ২০০৮ সালে ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসায় পড়া অবস্থায়, সেই মাদ্রাসার মুফতি সাহেবের মোবাইলের রিংটোনে আমি সামি ইউসুফের বাজনাসহ সংগীত বাজতে শুনেছি। আজকাল কওমি মাদ্রাসাপড়ুয়া আলেমদের বড় একটি অংশই এই সংগীতগুলো শুনছেন।

আমেরিকান মিউজিশিয়ান মাহের যাইন, যিনি লেডি গাগার মত ইন্টারন্যাশনাল স্টারদের সাথে কাজ করেছেন, আজ তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। আমেরিকার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির চে কয়েকগুণ বেশি প্রসিদ্ধি তিনি লাভ করেছেন এই নতুন ধারার সংগীত চর্চায়। ফেসবুকে প্রায় ২০ মিলিয়ন ফলোয়ার, ইউটিউবে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ প্রমাণ করে, সেক্যুলার ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে এই ইসলামি সংগীতের ইন্ডাস্ট্রিতে আসা তার জন্য বেশ ফলপ্রসূই হয়েছে।

মাহির যাইনের কনসার্টগুলো সাধারণত জাকজমক ও সজ্জার দিক দিয়ে আধুনিক সেক্যুলার মিউজিকের স্ট্যান্ডার্ডই ফলো করে। সেসব কনসার্টে সাজসজ্জা কিংবা নারী ভক্তদের উল্লাস ও করতালির কমতি থাকে না। ইসলামি সংগীতের এই ধারাটি সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্বেশ জনপ্রিয়। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আজকাল পৃথিবীর প্রায় সকল মুসলিমপ্রধান দেশেই এই ধারার ইসলামি সংগীতের ভোক্তাশ্রেণী গড়ে উঠেছে।

ভারত উপমহাদেশের দৃশ্য অবশ্য একটু ভিন্ন। ভারতের ক্ল্যাসিকাল মিউজিকে মোগল ঐতিহ্যের ছাপ ও প্রভাব বেশ গাঢ়৷ প্রায় ১২ শ বছরের ইসলামি ঐতিহ্য ভারতের ক্ল্যাসিকাল মিউজিকে ইসলামি সংগীতের বেশ শক্তিশালী ধারা তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ কাওয়ালির নাম করা যায়। ভারত ও পাকিস্তানে জনপ্রিয় এই সংগীতের ধারাটিও বাদ্যযন্ত্রনির্ভর। তবে, একারণে এর আবেদন কমেনি মোটেও। কাওয়ালি ধারার ইসলামি সংগীত এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় অনেক ক্ল্যাসিকাল ঘরানার শিল্পী মূলত এ ধারারই সন্তান। বাঙলাদেশের আঞ্চলিক পর্যায়ে মুর্শিদি-মারফতি গানগুলোও কিছুটা কাওয়ালির সাথে তুল্য।

ভারতীয় উপমহাদেশে এই সংগীতের ধারাগুলি মূলত ইসলামি সুফিদের ধারাজাত। বৃটিশ ভারতে মুসলিম জাগরণের প্রেক্ষিতে ইসলামের এক ধরণের সংস্কারমূলক আন্দোলনও চালু হয়, যার প্রধান কেন্দ্র ছিল দেওবন্দ। দেওবন্দি ধারার অর্থোডক্স সংগীতচিন্তার সাথে এইসব সংগীতের একটা অন্তর্ঘাত অদ্যবধি চালু আছে। তবে ইসলামি সংগীতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ভোক্তাশ্রেণীর প্রভাব এড়ানো তাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের জুনাইদ জামশেদের উত্থান সকলেরই জানা। একসময় দর্শকপ্রিয় রকস্টার জুনাইদ জামশেদ সংগীতের যে ধারা চালু করেছিলেন, তা ‘নাশিদ’ নামে পরিচিত। মিউজিকবিহীন ইসলামি সংগীতের এই ধারাই মূলত এই অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে বেশি স্বস্তিদায়ক। কিন্তু, ‘নাশিদ’ ধারাটির মান ও যুগোপযোগের ব্যাপারে এদের অনেকেরই সন্দেহ ও অস্বস্তি আছে।

যদিও, মিউজিক ইসলামে সিদ্ধ কিনা, এই বিতর্ক এখনও বেশ জোরালো। তবে, ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামি সংগীতের ওয়েস্টার্ন মডার্ন ধারাটির ভোক্তাও বিপুল। এমনকি, যারা এই ধারার সংগীত নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন, তারাও আজকাল এগুলো বেশ স্বাভাবিকভাবেই শুনছেন। তাছাড়া বর্তমানে ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যস্থতায় যে পোস্টমডার্ন ইসলামের জন্ম হয়েছে, সেখানেও এই দুই ধারার সংগীতই বেশ আদরণীয়। সংগীত নিয়ে ধর্মীয় বিতর্কের শেষ হবে কিনা জানা নাই, তবে ইসলামি সংগীতের এই ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বাজার নিয়ে এদেশের ইসলামি মহলকে ভবিষ্যতে ভাবতে হবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আগের সংবাদ‘ইসলামী সংগীত’ : পরিভাষাটা কতটা সঠিক?
পরবর্তি সংবাদহজপালন শেষে এ পর্যন্ত দেশে ফিরেছেন ২৪ হাজার ৭৩৫ হাজি