বিদেশে নারী শ্রমিক প্রেরণ : ইসলাম কতটা সমর্থন করে?

রাগিব রব্বানি :

সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনে মারা যাওয়া নাজমা বেগমের লাশ এসেছে দেশে। বাবা-হারা এতিম দুই শিশুপুত্রের লালন-পালন ও ভবিষ্যৎ-চিন্তায় নাজমা বছর খানেক আগে দালাল মারফত পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। যাওয়ার পর থেকেই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন। পরিবারকে ফোনে আকুতি জানিয়ে বলেও ছিলেন বারবার, তাঁকে যেন ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু দালালের তালবাহানার কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অবশেষে লাশ হয়ে তাঁকে ফিরতে হয়েছে দেশে।

মৃত্যুর দুদিন আগেও নাজমা ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন পরিবারের কাছে। শেষবার জানিয়েছিলেন, নির্যাতন করে তাঁকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে তাঁর সৌদি মালিক। বলেছিলেন, ‘আমাকে আর বাঁচাতে পারলি না তোরা, আমাকে আর জীবিত পাইলি না।’

Image result for নাজমা বেগম

গত সাড়ে তিনবছর ধরে আমাদের দেশ থেকে ঢালাওভাবে নারীগৃহকর্মী নেওয়া হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে, প্রধানত সৌদি আরবে। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৬০ হাজার নারী। কেবল নাজমার বেলায়ই যে ঘটেছে এমন করুণ ও বর্বর ঘটনা, তা নয়। এই সাড়ে তিন বছরে একই কায়দায় নির্যাতন ভোগ করে সাড়ে তিনশোরও অধিক নারীকর্মীর কফিন এসেছে দেশে। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জন নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন, আর বাকিদেরকে নানাভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এ ছাড়া আরও কত নারী যে শরীর-ইজ্জত-অর্থ সব খুইয়ে দেশে ফিরেছেন, এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সৌদিতে আটকে পড়া অসংখ্য নির্যাতিতা নারীর আহাজারি হরহামেশাই দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন, অঝোর কান্নায় ভেসে যাওয়া সেসব মুখের নারীরা একটা কথাই বলে যান বারবার—আমাকে বাঁচাও, আমাকে ফেরাও’।

বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাজের জন্য নারীদেরকে এভাবে পাঠানোটাকে ইসলাম কীভাবে দেখছে জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম দেশের প্রখ্যাত দুজন আলেমের সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, ইসলাম তো নারীকে এভাবে কাজে পাঠানোকে কোনোভাবেই অনুমোদন করে না, পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা নিতান্ত নিন্দনীয়।

রাজধানীর শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ইসলাম নারী-পুরুষের কাজকে ভাগ করে দিয়েছে। নারী ঘরে থাকবে, ঘর-গেরস্থালির কাজ গোছাবে, সন্তানাদির দেখভাল করবে, এটাই তাঁর দায়িত্ব। আর পুরুষের দায়িত্ব বাইরে কাজ-কারবার করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করা। এই হলো স্বাভাবিক নিয়ম। ইসলাম কখনো নারীর ওপর জীবিকা নির্বাহের দায়িত্ব দেয় না। নারীর পিতা ভাই স্বামী সন্তান পর্যায়ক্রমে এদের ওপরই থাকে তাঁর জীবিকা নির্বাহের ভার। নারী যদি নিরুপায় হয়, এদের কেউই যদি তাঁর না থাকে জীবিকা নির্বাহের উপযোগী এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকে তাহলে তাঁর জীবিকা নির্বাহের দায়িত্ব রাষ্ট্রই সাধারণত বহন করে।

তিনি বলেন, এখন যেহেতু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত নেই, তাই নিরুপায় নারীরা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে কাজের জন্য বাইরে যেতে পারেন শালীনতার সাথে এবং পর্দা রক্ষা করে, তবে এ ক্ষেত্রেও বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটা হলো কর্মস্থল নারীর জন্য নিরাপদ হতে হবে এবং কাছাকাছি হতে হবে। দূর-দূরান্তে হলে মাহরাম (বাবা, স্বামী, ছেলে—ইসলাম যে সমস্ত নিকটাত্মীয় পুরুষের সামনে বের হওয়াকে অনুমোদন দিয়েছে) ছাড়া সেখানে যেতে পারবে না। এবং মাহরাম ছাড়া কর্মস্থলে থাকতেও পারবে না। বিদেশে আমাদের যে নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে এসব শর্তের কোনোটাই রক্ষা হচ্ছে না, তাই ইসলাম কোনোভাবেই কাজের জন্য এভাবে নারীদের বিদেশ গমনকে অনুমোদন করে না।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও মাসিক আত-তাওহীদের সম্পাদক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ইসলাম যেখানে হজ করার জন্যও নারীকে মাহরাম ছাড়া সফরের অনুমতি দেয়নি, সেখানে কাজের জন্য অনিরাপদভাবে বিদেশ গমনের অনুমোদনের তো প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি বলেন, আমি বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয়ে উদ্বেগের সঙ্গে ভাবছি। আমাদের নারীদের কীভাবে এমন অনিরাপদ পরিবেশে পাঠানো হচ্ছে! যেখানে কদিন পরপরই তাদের ওপর যৌন নিপীড়নসহ নানামাত্রিক নির্যাতনের খবর আসছে। অনেকে মারাও যাচ্ছে।

ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, প্রয়োজন থাকলে ইসলাম শালীনতার সাথে নারীদেরকে বাইরে যাবার অনুমতি দেয়, চাকরি-বাকরিরও অনুমতি দেয়। তবে বাইরের জগতটা নারীদের জন্য নিরাপদ থাকতে হবে এবং কর্মস্থলে নারীর সবধরনের নিরাপত্তা মওজুদ থাকতে হবে। পাশাপাশি দূরের কোনো জায়গায় কর্মস্থল হলে একজন মাহরামসঙ্গী থাকাও জরুরি। আমাদের দেশে প্রচুর বেকার পুরুষ আছেন, যাঁরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না, তাঁদেরকে বহির্বিশ্বে কীভাবে পাঠানো যায়, এ ব্যাপারে ভাবলে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভালোভাবে লিয়াজু করলে একটা ফলাফল আশা করা যায়।

তিনি বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে কেবল মানবতার জায়গা থেকেও যদি বলি, রেমিট্যান্সের জন্য নারীদেরকে এভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে পাঠিয়ে মানবেতর জীবনযাপন ও নানামাত্রিক নির্যাতনের মুখোমুখি করা সমীচীন নয়। বরং যেসমস্ত নারী কাজ করতে চান বা যাদের কাজের প্রয়োজন রয়েছে, দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, তাঁদেরকে দেশের ভেতরই শালীনতার সঙ্গে কাজের পরিবেশ যেন তৈরি করে দেওয়া হয়৷ আর রেমিট্যান্স আহরণের জন্য বেকার পুরুষদেরকে কীভাবে বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারে পাঠানো যায় সে ব্যাপারে যেন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

আগের সংবাদআশকোনা হজ ক্যাম্প সম্প্রসারণ ও সংস্কার কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ
পরবর্তি সংবাদআকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে মোদির আবেদন আবারও প্রত্যাখ্যান করল পাকিস্তান