বেফাকে ১৫ বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছয়গুণ বৃদ্ধি, মাদরাসাশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে মানুষের

রাগিব রব্বানি

১৫ বছর আগেও বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট ছাত্রের সংখ্যা যেখানে মাত্র ২২ হাজার ছিল, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে বোর্ডটির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৫৫ হাজারে। অর্থাৎ ১৫ বছরের ব্যবধানে ৬ গুণ পরীক্ষার্থী বেড়েছে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায়।

পরিসংখ্যানটা একদিকে যেমন বেফাকের গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রগামিতার নির্দেশক অপরদিকে এরদ্বারা মাদরাসাশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহবৃদ্ধির বিষয়টাও প্রতীয়মান হয়।

চলতি ও বিগত দশকে বাংলাদেশে মাদরাসাশিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একসময় এ শিক্ষাধারাকে অনেকে অপেক্ষাকৃত নিম্নবিত্ত ও গরিব ঘরের সন্তানদের শিক্ষাধারা হিসেবে বিবেচনা করলেও বর্তমানে এ বিবেচনা অনেকাংশেই ম্লান হতে শুরু করেছে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বাড়ছে মানুষের আগ্রহ। ফলে ধর্মপ্রাণ ও অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরাও ব্যাপক হারে আসছে মাদরাসায়।

ওলামায়ে কেরামের প্রচেষ্টায় গ্রামে-গঞ্জে গড়ে উঠছে অসংখ্য ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজধানীসহ দেশের মফস্বল শহরগুলোতেও প্রতিষ্ঠা লাভ করছে বিশেষায়িত মাদরাসা। বিশেষায়িত মাদরাসাগুলোতে নির্ধারিত ও নিয়মিত ফি’র মাধ্যমে পড়াশোনার ব্যবস্থা ও আনুষাঙ্গিক আরও নানাবিধ সুবিধা থাকার ফলে বিত্তবান অভিভাবকরা এসব মাদরাসার প্রতিই ঝুঁকছেন বেশি। আর নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত ও গড়ে ওঠা মাদরাসাগুলোর অধিকাংশ বেফাকের আওতাভুক্ত হচ্ছে বিধায় বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায়ও বাড়ছে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার।

তবে বেফাকের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা দ্রুততম হারে বাড়ার পেছনে কেবল মাদরাসা-শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াই কারণ নয়। এখানে বেফাকের কর্মতৎপরতা এবং দেশব্যাপী তাঁদের একটা গ্রহণযোগ্যতাও উল্লেখযোগ্য। এমনটাই মনে করছেন ইসলাম টাইমস টোয়েন্টি ফোর ডটকমের সম্পাদক ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ।

তাঁর মতে, কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বেফাক এখন সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিগত দুই দশকে নতুন করে যেসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটি বেফাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় মাদরাসা-শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনার মান বিষয়ে এখন প্রতিযোগিতামূলক একটা মনোভাব প্রতিষ্ঠা পাবার দরুণ প্রত্যেকটি মাদরাসা কর্তৃপক্ষই চান তাদের ছাত্ররা অপেক্ষাকৃত বড় প্লাটফর্মে গিয়ে অন্য মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। এতে মাদরাসার পড়াশোনার মান যেমন যাচাই করা যায় সহজে, তেম্নি মাদরাসায় যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন, তাদের কাছেও ছাত্রদের সফলতা তুলে ধরা যায়। আর বেফাক যেহেতু সবচেয়ে বড় শিক্ষাবোর্ড, তাই বেফাকের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটাই তারা অধিক মুনাসিব মনে করছেন।

বেফাকের কর্মতৎপরতা এবং কৌশলও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বেফাক প্রতিষ্ঠার পর আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন বোর্ড থাকার কারণে প্রথম দিকে খুব বেশি মাদরাসা এর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আঞ্চলিক বোর্ডের অধীনেই থেকে গিয়েছিল। তারপর আল্লামা গহরপুরি রহমতুল্লাহ আলায়হি যখন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, সিলেটের অধিকাংশ মাদরাসা তাঁর প্রচেষ্টায় বেফাকের অন্তর্ভুক্ত হয়। আল্লামা গহরপুরীর ইন্তেকালের পর আল্লামা আহমদ শফী যখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন, চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোও একে একে বেফাকের অধীনে চলে আসে। ফলে দেশজুড়ে বেফাকের অন্যরকম এক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় এবং এ গ্রহণযোগ্যতার ফলে ব্যাপকভাবে দেশের মাদরাসাগুলো বোর্ডটির অধীনে চলে আসে। ফলে কয়েকগুণ হারে বেড়ে যায় বেফাকের পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও।

মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, বেফাক এখন যে অবস্থানে আছে, সেখান থেকে কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার কল্যাণে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখা সম্ভব এবং দরকারি, এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা আছে, আমি সেটাকে একপাশে রেখে বলতে চাই, বেফাক এ পর্যন্ত যা করেছে, তাও অনেক কিছু। বাংলাদেশের অধিকাংশ মাদরাসাকে একই প্লাটফর্মে আসার একটা স্রোত তৈরি করা অনেক বড় ব্যাপার। বেফাকের মরহুম মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব জীবনভর এ চেষ্টাটা করে গেছেন। এবং তাঁর এই প্রচেষ্টার ফল আসতে শুরু করেছে একএক করে।

বেফাক পরীক্ষায় ছাত্রদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির অভাবনীয় এই হারকে বাংলাদেশে মাদরাসাশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার অন্যতম একটি কারণ হিসেবেও দেখছেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তাঁর মতে, মানুষের এই আগ্রহ আরও ব্যাপকতর করার জন্য মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নততর ও গতিশীল কীভাবে করা যায় সে-ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আরও তৎপর হওয়া জরুরি।

আগের সংবাদজাকির নায়েককে প্রত্যর্পণ করতে মাহাথিরকে মোদির আহ্বান
পরবর্তি সংবাদবিদেশী সব সাংবাদিককে আসাম ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ