
রাকিবুল হাসান
পাণ্ডুলিপি থেকে কোনো ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাঠ নেয়া আর পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করে লেখা গ্রন্থ থেকে পাঠ নেয়া—দুটোর মাঝে বিস্তর ফারাক আছে। পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করে লেখা গ্রন্থগুলোতে যতটুকু ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্য আপনি পাবেন, তারচেয়ে গভীর এবং আস্থাশীল তথ্য পেতে হলে আপনাকে পড়তে হবে পাণ্ডুলিপি। ইসলামি জ্ঞান-ভাণ্ডারে তাই পাণ্ডুলিপির বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা আছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি যদি আন্দালুসের ইতিহাস পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে তিলমসানির ‘নাফহুত তাইয়্যেব’ পড়তে হবে। দামেশকের ইতিহাসে আগ্রহী হলে পড়তে হবে ইবনে আসাকিরের ‘তারিখে দিমাশক’। আর যদি বাগদাদ এবং বাগদাদের আলেমদের সম্পর্কে পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে পড়তে হবে খতীব বাগদাদীর ‘তারিখে বাগদাদ’। এই গ্রন্থগুলোতে লেখকগণ তাদের সময়ের কথা লিখে গেছেন। তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সিলসিলায় বয়ান দিয়েছেন। অন্য কারও গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে তারা ইতিহাস ও চিন্তা লিপিবদ্ধ করেন নি।
কিন্তু উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস যদি পড়তে চান, তাহলে আপনাকে পড়তে হবে—আহমদ আক কুন্দুজের ‘হারিয়ে যাওয়া উসমানি সাম্রাজ্য’ (অনূদিত), ইলমাজ ওসতুনার ‘তারিখুত দাওলাতিল উসমানিয়্যাহ’ (অনূদিত), খলিল ইনালজিকের ‘উসমানি সাম্রাজ্য : উত্থান থেকে পতন’ (অনূদিত)।
এগুলো আপনি মূল গ্রন্থ থেকে পড়ছেন না। পড়ছেন অনূদিত সংস্করণ থেকে। ফলে তাতে থেকে যাচ্ছে পক্ষপাত ও তথ্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া। ইসলামি সভ্যতায় উসমানী সাম্রাজ্যের বিশেষ প্রভাব আছে। কিন্তু উসমানি সাম্রাজ্যে তুর্কী এবং ফার্সি রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তাদের ইতিহাসগুলো লেখা হয়েছে এই ভাষাতেই। এই ভাষাগুলো জানি না বলে, আমরা মূল বই পড়তে পারি না। আঠারো শতকের পর থেকে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা ইসলামি ইতিহাসের এই মৌলিক গ্রন্থগুলো তাদের ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করে। যেমন ভারতে মোঘলদের ইতিহাস, উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস—এগুলো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেছে। অনুবাদ কখনো মূলের বিকল্প হতে পারে না। আবার এই অনূদিত গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে তারা বয়ান করেছেন মোঘল ও উসমানী সাম্রাজ্যের পশ্চিমা ভাষ্য, যাতে থেকে যাচ্ছে পক্ষপাত ও বিদ্বেষ।
এজন্য মৌলিক গ্রন্থ থেকে পড়া আর অনূদিত কিংবা তার ওপর নির্ভর করে লেখা গ্রন্থ থেকে পড়ায় থাকে পার্থক্য। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ভারতবর্ষে অযত্ন ও অবহেলায় মুসলিম পাণ্ডুলিপিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ইসলামি ইতিহাস ও চিন্তার সুলুক সন্ধান।
ভারতবর্ষে মুসলিম পাণ্ডুলিপি
মুসলিমদের লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এই ভারতবর্ষেও কম নয়। ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক, সরকারি লাইব্রেরিগুলোতে ছড়িয়ে আছে এসব পাণ্ডুলিপি। তাফসীর, হাদিস, চিকিৎসা, ইতিহাস—সব বিষয়ের পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান।
ভারতবর্ষে সংরক্ষিত কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সংক্ষিপ্ত হিসাব দেখে নেই। প্রদেশ ভিত্তিক লাইব্রেরির গ্রাফ দেয়া হলো।
উত্তর প্রদেশের পাণ্ডুলিপি
১. রামপুর শহরে ‘মাকতাবাতু রেজা আশ শা’বিয়্যাহ’। এতে ১৪০০ পাণ্ডুলিপি আছে। ১৯৬৩-১৯৭৭ সালে ৬ খণ্ডে এর সূচীপত্র প্রকাশ করা হয়েছিলো।
২. মাকতাবাতু দারুল উলূম দেওবন্দ। এতে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপির সূচী দুই খণ্ডে প্রকাশ হয়েছিলো ১৯৬৯-১৯৭২ সালে।
৩. আলিগর ইউনিভার্সিটির মাকতাবাতু মাওলানা আসাদুল্লাহ আজাদ। ১৯৭৩ সালে এর আরবি পাণ্ডুলিপির সূচী প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৯৮০-১৯৮৫ এই সময়ে সব পাণ্ডুলিপির সূচী প্রকাশ করা হয় দুই খণ্ডে।
৪. লখনৌর মাকতাবাতু নদওয়াতুল উলামা। তারা ১৯৬৮ সালে ফার্সি ভাষায় প্রকাশ করে পাণ্ডুলিপির সূচী।
৫. রামপুরে মাকতাবাতু সুলাত। আরবি এবং ফার্সি উভয় ভাষায় পাণ্ডুলিপির সূচী প্রকাশ করে তারা ১৯৬৬ সালে।
এমন আরও অনেক লাইব্রেরী আছে উত্তর প্রদেশে। যাদের কাছে পাণ্ডুলিপি আছে।
হায়দ্রাবাদ অন্ধ্র প্রদেশের পাণ্ডুলিপি
৬. হায়দ্রাবাদ শহরে ‘মাকতাবাতু দায়েরাতুল মাআারিফিল উসমানিয়্যাহ’। ১৯৫৪ সালে এর কিছু পাণ্ডুলিপির সূচী করেছেন নিজামুদ্দিন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাণ্ডুলিপির সূচী করেছেন আজিজ পাশা।
৭. অন্ধ্র প্রদেশের ‘মাকতাবাতু মাখতুতাতিশ শারক্বিয়্যাহ আল হুকুমিয়্যাহ’। এতে আরবি হরফে লিখিত প্রাচ্য ভাষার পাণ্ডুলিপি রয়েছে ২৩ হাজার। আরবি পাণ্ডুলিপি রয়েছে ৬৩৩৭টি।
৮. মাকতাবাতু বিলায়াতি হায়দ্রাবাদ। এতে আছে প্রাচ্য ভাষার ১৭ হাজার এবং আরবি ভাষার ৬৩৩৭টি পাণ্ডুলিপি।
৯. মাকতাবাতু সালারজঙ্গ মীর ইউসুফ আলী খান তৃতীয়। এতে প্রাচ্য ভাষার ৮৯২০টি, আরবি ভাষার ২৬২০টি পাণ্ডুলিপি আছে। ১৯৫৭-১৯৮১ সালে চার খণ্ডে পূর্ণ হয় এর সূচীপত্রের কাজ।
১০. হায়দ্রাবাদের ‘মাকতাবাতু জামেয়া উসমানিয়া’। উসমানি আলী খান এর প্রতিষ্ঠাতা। এতে প্রাচ্য ভাষার ৬৪২৪টি, আরবি ভাষার ১৬৭৩টি পাণ্ডুলিপি আছে।
১১. হায়দ্রাবাদের জামেয়া নেজামিয়া। ১৮৭৫ সালে শায়খ মুহাম্মদ আনওয়ারুল্লাহ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এতে প্রাচ্য ভাষার ১ হাজার, আরবি ভাষার ৬৩৫টি পাণ্ডুলিপি আছে।
১২. হায়দ্রাবাদের মাকতাবায়ে সাঈদিয়া। এতে ৭ হাজার পাণ্ডুলিপি আছে। আরবি ২৫০০টি, বাকিগুলো অন্যভাষার।
১৩. হায়দ্রাবাদের মাকতাবাতু রওজাতিল হাদিস। এতে ৮০০টি পাণ্ডুলিপি আছে।
তামিলনাড়ু প্রদেশের পাণ্ডুলিপি
১৪. মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাকতাবাতুল হুকুমাত লিল মাখতুতাতিশ শারক্বিয়্যাহ’। এতে প্রায় ৪০ হাজার পাণ্ডুলিপি আছে। তন্মধ্যে অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় লিখিত। আরবি ভাষার আছে ৩৪১টি পাণ্ডুলিপি। ১৮৯৩ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশ করে সূচীপত্র। আরবি, ফার্সি এবং উর্দু পাণ্ডুলিপির সূচী প্রকাশ করে ১৯৬৩ সালে।
১৫. মাদ্রাজের মাদরাসায়ে মুহাম্মাদিয়ার আঙিনায় তিনটি লাইব্রেরি আছে। মাকতাবাতু মাদরাসায়ে মুহাম্মাদিয়া, মাকতাবায়ে রহমানিয়া, মাকতাবাতুল আমানাত। এই তিনটি লাইব্রেরিতে ১২ হাজার পাণ্ডুলিপি আছে। এরমধ্যে আরবি ভাষার পাণ্ডুলিপি ৭ হাজার।
১৬. টঙ্কের আরব ও পারস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরিতে আছে ৩ হাজারের বেশি পাণ্ডুলিপি। এরমধ্যে ১৭৫৭টি আরবি ভাষায় লিখিত।
নয়াদিল্লি এবং তার চারপাশের পাণ্ডুলিপি
১৭. দিল্লির জাতীয় জাদুঘরের পাণ্ডুলিপি বিভাগে আছে প্রায় ১০ হাজার পাণ্ডুলিপি। এরমধ্যে তিন হাজার আরবি এবং বাকিগুলো সংস্কৃত ও প্রাচ্য ভাষায়। তবে কোন সূচীপত্র নেই।
১৮. নয়াদিল্লির হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। এতে চার হাজার আরবি এবং উর্দু ও ফার্সির এক হাজার পাণ্ডুলিপি আছে। তবে কোন সূচীপত্র নেই।
১৯. নয়াদিল্লির মাকতাবাতু জামিয়াতুল মিল্লাতিল ইসলামিয়্যাহ। এতে ৫০০ আরবি ভাষার পাণ্ডুলিপি আছে। সূচীও আছে।
কলকাতার পাণ্ডুলিপি
২০. জাতীয় গ্রন্থাগার। এতে ৬৮১টি আরবি, ২৩২০টি প্রাচ্য ভাষার পাণ্ডুলিপি আছে। ১৯২৩ সালে এর সূচীপত্র প্রকাশ করা হয়।
২১. কলকাতা এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। এতে ৩৫০০টি আরবি এবং অন্য ভাষার ৩৬ হাজার ৫০০টি পাণ্ডুলিপি আছে। ১৯৩৯ সালে সূচীপত্রের প্রথম খণ্ড প্রকাশ হয়। ১৯৪৯ সালে প্রকাশ হয় দ্বিতীয় খণ্ড।
এখন কেমন আছে পাণ্ডুলিপিগুলো?
সূচীপত্র প্রকাশের তারিখগুলো দেখলেই বুঝা যায় বিন্যাসগুলো অনেক আগের। কিন্তু এখন কেমন আছে পাণ্ডুলিপিগুলো। আদৌ ঠিক আছে কি নেই? আলজেরিয়ান ইসলামি গবেষক, হেড অফ স্টাডিজ এন্ড পাবলিশিং দুবাইয়ের ইযযুদ্দিন বিন যুগাইবা কিছুদিন আগে ভারতে এসেছিলেন পাণ্ডুলিপির খোঁজে। এক সেমিনারে তিনি তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি হায়দ্রাবাদ এবং তামিলনাড়ু প্রদেশের লাইব্রেরিগুলোর কথা বেশি বলেছেন। তিনটি লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপি খোঁজার গল্প শুনলেই বুঝে উঠতে পারবেন—এখনকার পাণ্ডুলিপির হালচাল। তার বয়ানে শোনা যাক বর্তমান অবস্থা।
ক. মাদরাসায়ে লতিফিয়া, তামিলনাড়ু।
১৭৫০ সালে আবদুল লতিফ কাদরী প্রতিষ্ঠা করেছেন এই প্রতিষ্ঠান। এর তিনটা রুম পাণ্ডুলিপিতে ভরা। অনেক পাণ্ডুলিপি ক্ষয়ে গেছে, মাটির মতো ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। ধরলেই ভেঙে পড়ে যায়। তিনবস্তা পাণ্ডুলিপি, যা পচে গেছে, ফেলে দিতে হয়েছে। তিনদিন খোঁজাখুঁজি করে এখান থেকে উদ্ধার করা গেছে ৭৫৭টি পাণ্ডুলিপি।
কিছু কিছু পাণ্ডুলিপি পাথরের মতো হয়ে গেছে। পাতা উল্টানো যায় না। এত শক্ত হয়ে একপৃষ্ঠার সঙ্গে আরেকপৃষ্ঠা লেগে গেছে।
খ. আনওয়ারুল উলূম বিশ্ববিদ্যালয়, তামিলনাড়ু।
১৭৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। লাইব্রেরিতে ঢুকে কোনো পাণ্ডুলিপি পেলাম না। যখন বেরিয়ে আসছি, একজন ছাত্র এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, পাণ্ডুলিপি খুঁজছেন? আমি বললাম, হ্যা। সে বললো, পাণ্ডুলিপি ছাত্রাবাসের কার্ণিশে আছে। আমার সঙ্গে চলেন।
ছাত্রাবাসে এসে দেখি সব ছাত্র ঘুমুচ্ছে। তারা যেখানে বেডিং, ট্রাঙ্ক রাখে, সেখানেই কার্নিশে জটবাঁধা কিছু পাণ্ডুলিপি। অযত্নে অবহেলায় দম যায় যায়। টেনে টেনে বের করলাম। ১৮১টি সুরক্ষিত পাণ্ডুলিপি পেয়েছি এখান থেকে। আরও কত নষ্ট হয়ে গেছে, যত্নের অভাবে ছিড়ে হারিয়ে গেছে! সবচে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এখান থেকে পাওয়া পাণ্ডুলিপিগুলো অধিকাংশই কুরআন তাফসীরের।
গ. আল কুল্লিয়াতুত তিব্বিয়্যাহ, হায়দ্রাবাদ।
এখানের সব পাণ্ডুলিপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের। একজন বললো, লাইব্রেরির নীচে কুঠুরী আছে একটা। আমাদের অপ্রয়োজনীয় টেবিল, বই সব ওখানে রেখে দেই। আমি বললাম, দেখতে চাই। পরিচালক বললেন, স্ট্যাম্পে আগে সাইন করতে হবে, যা পাওয়া যাবে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। নীচের কুঠুরী থেকে বের করলাম ৫৭০টি পাণ্ডুলিপি। সবই চিকিৎসা বিদ্যার। এরমধ্যে ইবনে সিনার ‘আল কানুন ফিত তিব্ব’ এর পাণ্ডুলিপিও ছিলো।
শুধু এই তিনটি নয়, অধিকাংশ লাইব্রেরীগুলোর অবস্থা এমন। অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সব পাণ্ডুলিপিগুলো। শুধুই কি অযত্ন আর অবহেলার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এগুলো নাকি অন্য কারণও আছে?
কেন হারিয়ে যাচ্ছে পাণ্ডুলিপিগুলো
পাণ্ডুলিপিগুলো হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া, তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার পেছনে ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন এই আলজেরিয়ান গবেষক।
১. অধিকাংশ লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপি এবং নতুন লেখা গ্রন্থের মধ্যে কোন পার্থক্য করে না। হয়তো পাণ্ডুলিপি ছেপে দিয়েছে, কিন্তু এমন কোন লিস্ট নেই তাদের কাছে—কোনটা পাণ্ডুলিপি আর কোনটা পাণ্ডুলিপি না। সুতরাং সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। যারা জানে না তারা বুঝবেই না, কোনটা পাণ্ডুলিপি।
২. পাণ্ডুলিপি আছে যেসব লাইব্রেরিগুলোতে, তার অনেকগুলোর কাছে মানুষ যেতেই পারে না। লাইব্রেরি মালিক দিনে হয়তো একঘণ্টার জন্য আসে। পাঠকরা এসে পায় না। তাহলে তারা পাণ্ডুলিপির সঙ্গে পরিচিত হবে কিভাবে?
৩. কিছু পাণ্ডুলিপি শুরুর অংশ পাওয়া যায়। কিছুর শেষ অংশ পাওয়া যায়। কোনটার শুরু এবং শেষ কোনোটাই পাওয়া যায় না, মাঝের অংশটুকু পাওয়া যায়। অথচ এই অসম্পূর্ণ অংশকেই লাইব্রেরি মালিক মনে করছেন পূর্ণ অংশ।
আমি দেখেছি—এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে পাণ্ডুলিপির অংশ। এখান থেকে ওখান থেকে তুলে এনে যখন মিলালাম, তখন পূর্ণ হয়ে গেলো। এটা করতে কেউ রাজি না। পড়ে আছে তো পড়ে আছেই।
৪. পাণ্ডুলিপির যত্ন এবং সম্মান নেই।
মাদ্রাজের মাকতাবায়ে মুহাম্মাদিয়াতে ১২ হাজার পাণ্ডুলিপি আছে। চারটি গোডাউন ভরা। এগুলো দেখা শেষে যখন বেরিয়ে আসবো, কোণায় দেখি একটা স্তুপ। জিজ্ঞেস করলাম—এগুলো কী? বললো, পুরাতন পাণ্ডুলিপি। সময় নেই বিন্যাস করার। জিজ্ঞেস করকাম কতদিন হলো এভাবে আছে? বললো, অনেক বছর। অনুমতি চাইলাম, আমরা গুছিয়ে দেই। বললো, সরকারের অনুমতি লাগবে। এখানে কত গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি আছে কে জানে? একদিন এভাবেই এগুলো ফেলে দিবে নষ্ট হয়ে গেছে বলে।
৫. পাণ্ডুলিপির সূচীপত্র নেই। সূচীপত্র নেই মানে হিসাবও নেই। যদিও কেউ কেউ সূচীপত্র করেছে, তা-ও উর্দুতে কিংবা ফার্সিতে। আরবিতে খুব কম। কিছু সূচীপত্র হাতে লেখা, এখনো টাইপ হয়নি।
৬. অধিকাংশ লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য যেসব ব্যবস্থাপনা দরকার, যেমন পোকা তাড়ানোর ওষুধ, গিলাফ বা ঢাকনা, ক্রমিক নং—এসব নেই। ফলে পাণ্ডুলিপিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আরও তাড়াতাড়ি।
তামিলনাড়ুর এক লাইব্রেরিতে দেখলাম, পাণ্ডুলিপির মধ্যে গাছের পাতা দেয়া। জিজ্ঞেস করলাম, কেনো? বললো, এতে নাকি পোকা খায় না, পাতা ভালো থাকে। আমি গাছের পাতা টান দিতেই পৃষ্ঠার সব কালি উঠে এলো। পাতার সঙ্গে গাছের পাতা এমনভাবে মিশে গেছে। এই হলো করুণ অবস্থা।’
এসব হাজার হাজার পাণ্ডুলিপিতে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার মুসলিম মনীষার চিন্তা। পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া মানে, তাদের চিন্তাগুলো হারিয়ে যাওয়া। এগুলো যদি প্রাচীন পাতা থেকে তুলে আনা হয় কম্পিউটারের পাতায়, নিঃসন্দেহে নতুন এক জাগরণ শুরু হয়ে যাবে। কত অজানা কথা, কত অজানা ইতিহাস, কত না বলা অভিজ্ঞতা, কত না জানানো কৌশল ওইসব পাণ্ডুলিপিতে লুকিয়ে আছে, আমরা জানতেই পারছি না। ভারতবর্ষের আলেমদের পাণ্ডুলিপির বিষয়টা নিয়ে এখনই ভাবা উচিত মনে হয়। সময় গেলে হবে না সাধন।
