‘ বামপন্থী আন্দোলন কখনো পার্লামেন্টে বসে সফল হতে পারে না’

গত ২৪ জুন, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি গবেষণারত ভারতীয় ছাত্র তমোঘ্ন হালদার ‘দ্য ডেথ অফ দ্য ইন্ডিয়ান লেফট’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল লেখেন। আর্টিকেলটিতে বলা হয়, ইন্ডিয়ায় লেফট মুভমেন্টের মৃত্যু আগেই হয়েছিল, এই ইলেকশনে লেফট অ্যালায়েন্সের ব্যাপক ভরাডুবি তার অফিশিয়াল ঘোষণামাত্র। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পাঠকদের জন্য লেখাটির সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেছেন  তুহিন খান।

ভারতের সর্বশেষ ইলেকশনে বামজোটের ভরাডুবি হয়েছে। আজ থেকে ১৫ বছর আগে যারা ছিল ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ জোট, লোকসভার ৫৪৩ টি আসনের ৫৯ টি আসনে যারা বিজয়ী হয়েছিল, ১৫ বছর পর আজকের দৃশ্যপট হল, মাত্র ৫ টি আসনের জন্যও এখন তাদের লড়াই করতে হচ্ছে। বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান বা নির্বাচনী স্ট্রাটেজির সাফল্য না, বামদের এই ভরাডুবির জন্য দায়ী তারা নিজেরাই। ভারতে বাম রাজনীতির মৃত্যুর অফিশিয়াল ঘোষণা এই নির্বাচন।

ভোটে জেতার জন্য ‘শ্রেণীসংগ্রাম’ বিক্রি

ভারতের ক্ষমতায় যাওয়া বাম দলগুলি, যেকোনো কারণেই হোক, কম্যুনিজমের আদর্শ্চ্যুত হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছে বারবার। ব্রিটিশ ভারতে ১৯২৫ সালে এম এন রায়ের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা সিপিআই। বৃটিশ সরকারের চাপে এবং তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাবল্যে বৃটিশ ভারতে সিপিআই তেমন কোন সাফল্য পায় নাই।

১৯৪০ এর তেলেঙ্গানা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিল কম্যুনিস্টরা। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে সেই তেলেঙ্গানায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দী হিশেবে আবির্ভূত হয় সিপিআই। ১৯৫৭ সালে কেরালায় বিজয়ী হয় সিপিআই, স্বাধীন ভারতের প্রথম দল হিশেবে কংগ্রেসের সাথে জোট ছাড়াই তারা একটি রাজ্যে সরকার গঠন করে।

তারপর দলে ভাঙন ধরে। ১৯৬৪ সালে সিপিআই ভেঙে সিপিআই (এম-মার্ক্সিস্ট) নামে আরেকটি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে । ভোটের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে এই নতুন অংশটি।

খুব দ্রুতই, মাত্র তিন বছরের মাথায়, ১৯৬৭ সালে সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করে। পশ্চিমবঙ্গে কম্যুনিজমের জোয়ার ওঠে। ওই বছরই নকশালবাড়িতে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে কৃষকেরা জোতদার ও জমির মালিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকলে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের হোম মিনিস্টার জ্যোতি বসু ক্র্যাকডাউনের আদেশ দেন।

নকশালবাড়ির সেই আন্দোলন ছিল সিপিএমের পরবর্তী রাজনৈতিক চরিত্রের নির্ধারক–এই ঘটনার পরেই সিপিএম ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলি নিজেদের পলিটিকাল আইডিওলজির বদলে ধীরে ধীরে ক্ষমতার রাজনীতির নীতিতে অভ্যস্ত হতে শুরু করে।

এই নীতিতে পরবর্তী প্রায় ৩০ বছর , ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ছিল, ত্রিপুরায়ও ছিল প্রায় ২৫ বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতায় থাকা তাদের প্রতি মানুশের বিতৃষ্ণাই কেবল বাড়িয়েছে।

ভূমিব্যবস্থার পুনর্বন্টন এবং জমিদারতন্ত্রের উচ্চছেদই মূলত কৃষক ও সাধারণ মানুশের কাছে সিপিআই-কে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। কিন্তু এও সত্য, সিপিআই এর এই ব্যবস্থা সকল কৃষকের ভাগ্য বদলাতে পারে নাই। নিম্নবর্গের হিন্দু কৃষক, যারা ছিল তুলনামূলক বেশি দরিদ্র, তারা এই ব্যবস্থার বিশেষ কোন সুবিধা পায়নি।

দ্বিতীয়ত, তাদের রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী এই দীর্ঘ সময়ের শাসন তারা চালায় নাই। কম্যুনিজমে যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল তারাই হয়েছিল বঞ্চিত। ভূমিহীন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ব্যাপকভাবে, কৃষকদের জমি কেড়ে নিয়ে তুলে দেয়া হয়েছিল বড় বড় পুঁজিপতিদের কাছে।

নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে পেশিশক্তি ও ছলচাতুরি করে থাকে অন্যান্য দলগুলি, তারাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ২০০৯ সালে লালগরের আদিবাসী বিদ্রোহ দমন করতে অস্ত্রসহায়তার জন্য তারা ইজরাইলের কাছে পর্যন্ত ধর্না দিয়েছিল। আর এই গতবছরেই, জোরপুর্বক ছিনিয়ে নেওয়া জমির মালিকানা ফেরতের দাবিতে কেরালায় আন্দোলনরত কৃষকদের তাঁবু ও বিশ্রামাগার জ্বালিয়ে দিয়েছিল তাদের ক্যাডাররা।

কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন দূরে থাক, বাম আদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠাও এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও, তারা করতে পারে নাই। এর ফাঁকতালে আর এস এস গ্রাম ও শহরতলীগুলোতে অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল খুলে নিজেদের আদর্শের প্রচার করেছে, একদম সিপিএমের নাকের ডগায়।

উচ্চবর্ণের, উঁচুশ্রেণীর পুঁজিপতি বাম (?!)

বহুবছর ধরেই সিপিএমের নেতারাই বামফ্রন্টের নেতৃত্বে আছেন। বামপন্থার বিপ্লবী আদর্শ আর চেতনা বাস্তবায়নে সদাজাগ্রত এই নেতাদের অনেকেই নিজেরা হয়ে গেছেন বিশাল পুঁজিপতি, অনেকেই আঁকরে থেকেছেন কেবলই ক্ষমতা।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথাই ধরা যাক। সিপিওএমের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী তার শাসনামলে কর্পোরেশন-ফ্রেন্ডলিই কেবল হন নাই, তাদের পক্ষে ট্যাক্স সিস্টেম পর্যন্ত সংস্কার করেছেন। SEZ এক্টের মত শ্রমিকবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছেন।

ভারতের নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের কাছে পৌঁছতেও ব্যর্থ হয়েছে সিপিএম। সিপিএমের সর্বোচ্চ ডিসিশন মেকিং বডিতে একজনও দলিত নেতা না থাকা এটাই প্রমাণ করে। এমনকি কেরালা, যেখানে তারা ক্ষমতায়, দলিত ও উপজাতিদের উপর রাষ্ট্রীয় হামলা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পার্টির নেতৃত্বে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিম ও নারীদের ক্ষেত্রেও ক্ষমতায়ন ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

জাতীয় স্বার্থ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতেও বারবার ডাবল গেম খেলেছে বামেরা। ২০০৭-এ ভারত-আমেরিকা নিউক্লিয়ার চুক্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেও, উইকিলিকসের ফাঁসকৃত নথি থেকে জানা যায় যে, তারা সংসদে এ সংক্রান্ত কোন বিলেরই বিরোধিতা করে নাই। কাশ্মীর ইস্যুর ব্যাপারও তাই। প্রকাশ্যে সিভিলিয়ানদের উপর আক্রমনের সমালোচনা করলেও, কখনই তারা কাশ্মিরিদের স্বাধিকারের ব্যাপারে মুখ খলে নাই।

বাম আন্দোলন কি আবার প্রাণ ফিরে পাবে?

সমালোচনা করলেও, ভারতে বাম আন্দোলনের সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করে দিচ্ছেন না হালদার। তার মতে, যদিও ভারতে আবারও রাজনৈতিকভাবে বামদের উত্থান অনেকের কাছেই হাস্যকর মনে হতে পারে, তবে এটা সম্ভব। এটা সম্ভব কেবলমাত্র ভারতের প্রান্তিক জনগণ, ভূমিহীন অতিদরিদ্র কৃষক এবং দলিতশ্রেণীর মাধ্যমেই। ভারতে এরাই সবচে বেশি নিপীড়িত এবং এরাই সবচে বড় বিদ্রোহী। নিজেদের জীবন আর জমিটুকু বাঁচাতে যুগের পর যুগ জমিদার, ভূমিদস্যু, বৃটিশ বেনিয়া, মাইনিং কর্পোরেশন বা ডান-বাম যেকোন সরকারের সাথে এরাই যুগে যুগে লড়াই করেছে, এ লড়াই আজও চলছে।

ভারতের এলিট ও নব্য এলিট বুর্জোয়া শ্রেণী, যারা নির্বাচন, পার্লামেন্ট, টিভি দেখা আর সোশাল মিডিয়ার কিউট কিউট প্রতিবাদকেই সবকিছু পরিবর্তনের নিয়ামক ভাবেন তাদের কাছে একথা শুনতে ইউটোপিয়ান মনে হলেও, হালদারের মতে, বাম রাজনিতির পুনরুত্থান সম্ভব, এবং তা হতে হবে প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন দলিত মানুশদের তাদের ভূমি ও অধিকারের লড়াইয়ে সঙ্গ দেওয়া ও ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমেই।

হালদারের মতে, ভারতের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন আর বিগত পাঁচ দশকের রাজনীতির শিক্ষা এটিই যে, বামপন্থার আন্দোলন কখনও পার্লামেন্টে বসে সফল হতে পারে না।

আগের সংবাদডেঙ্গু রোগে পরামর্শ দেবে ডিএনসিসি : কল করুন ০১৯৩২-৬৬৫৫৪৪
পরবর্তি সংবাদবেসরকারি হজ এজেন্সিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জরুরি চিঠি