ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবারও উগ্র সহিংসতা

বিশেষ প্রতিবেদক :

ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবারও উগ্র সহিংসতা শুরু হয়েছে। মুসলিম-বিদ্বেষী বিতর্তিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গত ক’মাস ধরেই উত্তাল ভারত। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিজেপির ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশের নৃশংস আক্রমণে প্রায় তিরিশ জনের মতো মুসলিম নাগরিকের প্রাণ গিয়েছে। তারপর গত কিছুদিন ধরে এ নৃশংসতা বন্ধ থাকলেও গতকাল সোমবার আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল দিল্লি। এতে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ নিহত হয়েছেন আরও সাত আন্দোলনকারী। আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক। নিহত আন্দোলনকারীদের প্রায় সকলেই মুসলিম।

জানা যায়, গতকাল সোমবার ক্ষমতাসীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি’র ক্যাডার বাহিনী দিল্লির উত্তরপূর্বের মৌজপুরে বিক্ষোভরত আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথম হামলা চালায়। পুলিশের ছত্রছায়ায় চালানো এ হামলার পর পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আন্দোলনকারীরা। ফলে মৌজপুর এলাকায় তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। এই সংঘর্ষের জেরে যানবাহন ও স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের ভজনপুর ও চান্দ বাগ এলাকাতেও। দিনভর এসব সহিংসতায় অন্তত ৭ জন নিহত ও প্রায় ৫০ জন আহত হন।

ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, এসব সহিংসতার নেপথ্যে উসকানি দিয়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র।

বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে অবস্থান নিয়ে টানা দুই মাস ধরে বিক্ষোভ করে আসছেন মুসলিম নারীরা। ওই অবস্থানের কারণে বন্ধ হওয়া সড়ক কর্তৃপক্ষ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পর গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে জাফরাবাদ মেট্রোস্টেশনে একই ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জবাবে পরদিন (রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল তিনটায় প্রায় এক কিলোমিটার দূরের মৌজপুর চকে বিজেপি সরকারের সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে টুইট করেন দিল্লির বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। ওই দিন সাড়ে চারটা নাগাদ হিন্দু সন্ত্রাসীরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরতদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।

২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। ওই ভিডিওতে তাকে দিল্লির উত্তরপূর্ব পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ভেদ প্রকাশকে পাশে নিয়ে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতাকারীদের হুমকি দিতে দেখা যায়। ওই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, তার সমর্থকেরা শুধুমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে আর তারপর তারা দিল্লি পুলিশের কথাও শুনবে না এবং বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতাকারীদের অবরোধ করে রাখা রাস্তা পরিষ্কার করে দেবে।

রবিবার রাতে ছড়িয়ে পড়া অপর এক ভিডিওতে ওই অঞ্চলের রাস্তায় ট্রাক থেকে ইট নামিয়ে রাখতে দেখা গেছে। এসব ট্রাকের আশেপাশে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়।

সোমবার জাফরাবাদ ও মৌজপুরে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ শুরু হয়। এদিন সকালে বিজেপি সরকারের সমর্থকদের মৌজপুর চকে লাউডস্পিকারে গান বাজাতে দেখা যায়। এসব গানের মধ্যে ছিলো ‘যারা আজাদি (স্বাধীনতা) চায়, তাদের পাকিস্তানে পাঠানো উচিত’, ‘হিন্দুরা ভারতের গর্ব, গেরুয়াধারীরা আসবে, ভারত মাতার ডাকে রক্তের রঙে সাজবে গুলি’।

মৌজপুর ও জাফরাবাদের আশেপাশে মোতায়েন করা হয় পুলিশ। তবে মৌজপুর চকে উসকানিমূলক গান বাজানো হতে থাকলেও তা থামাতে পুলিশের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।

তবে এর দুই ঘণ্টা পর বেলা দুইটার দিকে বিজেপি সরকারের সমর্থকেরা জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের দিকে রওনা দেয়। আর জাফরাবাদ থেকে নাগরিকত্ব আইনের বিরোধীরা মৌজপুর চকের দিকে রওনা দেয়। জাফরাবাদ ও মৌজপুর এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হবার পরে আশেপাশের এলাকাতেও হিন্দু সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে।

গতকালের এ সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে রয়েছেনহেড কনস্টেবল রতনলাল, শহিদ, মুহাম্মদ ফুরকান, রাহুল সোলাঙ্কি এবং নাজিম। এ ছাড়া আরও দু’জন নিহতের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি।

গতকালের এ সংঘর্ষের পর জাফরাবাদ, মৌজপুর-বাবারপুর, গোকুলপুরি, শিব বিহার ও জোহরি এনক্লেভ মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো ট্রেন দাঁড়াবে না। ওই এলাকায় ১৪৪ ধারাও জারি হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ৫৫ বছরের পুরনো নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন করে ভারত। সংশোধিত আইনে প্রতিবেশী তিন দেশ (বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) থেকে যাওয়া মুসলিম ব্যতিত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, পার্সি ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হিন্দু সন্ত্রাসী দল বিজেপি সরকারের প্রণীত এই আইনটিকে মুসলিমবিরোধী ও ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়। এসব বিক্ষোভে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় সোমবারের আগেই নিহত হন প্রায় ৩০ জন।

সূত্র : এনডিটিভি, আনন্দবাজার পত্রিকা

আগের সংবাদমিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মুবারক মারা গেলেন
পরবর্তি সংবাদমোদিকে সাথে নিয়ে ‘ইসলামিক সন্ত্রাস’ রুখতে চান ট্রাম্প!