
রাগিব রব্বানি :
ভোলার বুরহানুদ্দিনে ধর্মানুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ তৌহিদি জনতার ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও দুই মাদরাসাছাত্রসহ চার মুসল্লির শাহাদাত বরণের ঘটনায় জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নিয়ে সচেতন মহলে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।
সচেতন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অনেকেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন ঘটনার দিন রোববার থেকে। ঘটনার দিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত ঘটনার পর বুরহানুদ্দিনের পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে এই ঘটনার কী ব্যাখ্যা দিতে হবে, তা শিখিয়ে দিচ্ছেন সাংবাদিকসারিতে থাকা একজন। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
রিয়াজ শরীফ নামে এক ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্ট তাঁর টাইমলাইনে ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, সাংবাদিকদের যেখানে প্রশ্ন করে পুলিশের কাছ থেকে তাদের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিস্তারিত তুলে আনা উচিত ছিল, সেখানে তারাই পুলিশকে শিখিয়ে দিচ্ছে কী বলতে হবে। আর এই শিখিয়ে দেওয়া বুলিই পরে প্রচারিত হচ্ছে গণমাধ্যমে। এটা সাংবাদিকতার কোন নীতিতে পড়ে!
এদিকে ঘটনার তিনদিন পার হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যম ঘটনা সম্পর্কে অনুসন্ধানী কোনো প্রতিবেদনের প্রয়াস চালায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে। মাওলানা রিয়াজ মাহমুদ নামে বুরহানুদ্দিনের একটি মাদরাসার শিক্ষক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, জনতা কেন উত্তেজিত হলো, কেবল উত্তেজিত হবার কারণেই পুলিশ কেন এমন নির্বিচার গুলি চালাল, চার চারটি তাজাপ্রাণ কেন ঝরে পড়ল, অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এর সঠিক কোনো তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর কেউই তুলে আনার গরজ দেখায়নি। কেবল পুলিশের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে ঘটনাকে নিছক পুলিশ-জনতার একটা সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সংঘর্ষ জিনিসটা কী? দুপক্ষ মোটামুটি সমানতালে দুপক্ষকেই মারবে, তাই তো? এখানে কি এমন কিছু হয়েছিল? পুলিশি বাধার কারণে জনতা উত্তেজিত হয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, কিছুলোক এতে আরও উত্তেজিত হয়ে পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মেরেছে, আর তখনই পুলিশ গুলি চালিয়েছে।
রিয়াজ মাহমুদ আরও বলেন, মিডিয়ায় এসেছে পুলিশের সঙ্গে জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষ, অথচ জনতার ইটপাটকেল ছোড়ার পর পুলিশ মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে গুলি চালিয়ে জনতাকে মাঠ ছাড়া করেছে। তারপর ছুটন্ত জনতা জান বাঁচাতেই ব্যস্ত ছিল, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে যাবে কী করে?
গণমাধ্যমের এই ধরনের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বুরহানুদ্দিনের স্থানীয় সাংবাদিক কালাম খানও। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, এত বড় একটা হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হলো, জাতীয় সংবাদমাধ্যম সেটাকে নিছক পুলিশ-জনতার একটা সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, এটা খুবই দুঃখজনক এবং সাংবাদিকতার নিয়মনীতির পরিপন্থী। ঘটনার পর তাদের উচিত ছিল, যেহেতু পুলিশ এখানে একটা পক্ষ, তাই পুলিশের কথার উপর নির্ভর না করে, স্থানীয়দের মতামত যাচাই করা। ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে, কীভাবে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটল, তার বিস্তারিত অনুসন্ধান করে ভারসাম্যপূর্ণ একটা প্রতিবেদন করা।
ভোলা হত্যাকাণ্ডে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর এই ভূমিকা বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আমাদের গণমাধ্যমগুলো হয়তো অতিমাত্রায় সেকুলার ভাবাপন্ন হবার কারণে ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকার সংশ্লিষ্ট ইস্যু হিসেবে বরাবরের মতো এই ঘটনায়ও তারা যে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় থাকবে, এটা আমরা পূর্বের অনেকবারের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি প্রথমেই। কিন্তু এখানে তো কেবল ইসলাম ও মুসলমানের অধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে ঘটনা সীমাবদ্ধ থাকেনি, নাগরিক নিরাপত্তা চরম মাত্রায় বিঘ্নিত হবার বিষয়টাও চলে এসেছে। উপজেলা লেভেলে বিক্ষুব্ধ জনতাকে পুলিশ গুলি করে মারতে থাকবে, এটা দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নে কতবড় বিপর্যয়কর ঘটনা, অন্তত এই দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান গণমাধ্যমে আসা উচিত ছিল। দুঃখজনক হলো, এই ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের গণমাধ্যম বিস্ময়কর নীরবতা পালন করেছে।
তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় গণমাধ্যমগুলো ছোট ছোট ঘটনা, যেমন ড্রেনের ময়লা নিয়ে বিশাল নিউজ করে, পাবলিক প্লেসে কোনো নেতা বিড়ি খেলে বিশাল প্রতিবেদন করে তাকে ঘায়েল করে ফেলে, এমন আরও অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে নিয়মিত নিউজ করে, মনে হয় যে, দেশের যেকোনো বিষয় নিয়ে তারা অতন্দ্র এবং সচেতন, সেই তারাই ভোলায় পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং সাধারণ মানুষ নিহত হবার ঘটনায় যে ভূমিকা রেখেছে, মনে হয় যেন নিজেদের চোখ এবং বিবেককে কম্বল আর ছালা দিয়ে তারা মুড়ে রেখেছেন।
এদিকে ঘটনার তিনদিনের মাথায় বিবিসি বাংলা আজ বুরহানুদ্দিনের এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সরেজমিন প্রতিবেদন করতে গিয়ে উপজেলা হাসপাতাল এলাকার একটি হিন্দু পাড়ায় কয়েকটি বাড়ি ও একটি মন্দির ভাংচুরের ঘটনা তুলে এনেছে গণমাধ্যমে। এ বিষয়ে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে আমার দুটো কথা। প্রথম কথা হলো, যেখানে আহত-নিহত মানুষকে নিয়ে কাভার করার সময় এখন, হাসপাতালে যাঁরা চিকিৎসাধীন আছেন, তাঁদের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, কী পরিমাণ গুলি তাঁরা খেয়েছেন, বুক-পিট ঝাঁঝরা হয়ে আছে বহু মানুষের, নিহত মানুষগুলোর পরিবারের কী অবস্থা, এসব বিষয়ে প্রতিবেদন করার কথা, সেখানে বিবিসির মতো একটা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ঘটনার সময় একটা হিন্দুপাড়ায় কয়েকটা বাড়ি ও মূর্তি ভাংচুরের ঘটনাকে সবকিছু বাদ দিয়ে সামনে নিয়ে আসা উদ্দেশ্যমূলক এবং কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ কি-না সে ব্যাপারে আমরা সন্দিহান৷
তিনি বলেন, বিবিসির এমন তৎপরতা সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বড় রকমের বিচ্যুতি বলে আমি মনে করি। তবে বিবিসির ক্ষেত্রে এমনটা আশার বাইরে না। বিবিসি প্রতিষ্ঠানটাই এমন, যা বিভিন্ন মুসলিম দেশে বিভিন্ন সময় নিরপেক্ষ কিছু কাজ যেমন করে, তেম্নি পরিকল্পিত ও প্রোপাগান্ডামূলক কিছু কাজও করে। এখানে এই জিনিসটাই তারা করেছে। সংবাদ জগতের একজন মানুষ হিসেবে আমি বিবিসির এই আচরণে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, দ্বিতীয় যে কথাটি আমি বলতে চাই, ঘটনার দিন রাতে প্রধানমন্ত্রী একটা ব্রিফ করেছেন জাতির উদ্দেশে। সেখানে তিনি কয়েকটা কথা বলেছেন। এর মধ্যে একটা কথা এমন ছিল যে, এই ঘটনায় সংবাদমাধ্যমগুলো যেন খুব সতর্ক হয়ে সংবাদ প্রচার করে, উত্তেজনা যেন বৃদ্ধি না পায়। প্রধানমন্ত্রীর এই কথা, ‘সংবাদমাধ্যম যেন খুব সতর্ক হয়ে সংবাদ প্রচার করে’, এর মানে কি এই দাঁড়াল, যে, মজলুম মুসলমানদের কথা বলা যাবে না, গুলিবিদ্ধ বা আহত মানুষের হয়ে কোনো কথা বলা যাবে না, প্রকৃত অবস্থাটাও বলা যাবে না, কিন্তু যেটা মুসলমান ও নবিপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে যায়, হিন্দুদের পক্ষে যায়, সেটা সাম্প্রদায়িক উসকানির কারণ হলেও এবং দেশেবিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবার আশংকা থাকলেও বলা যাবে? প্রধানমন্ত্রীর কথার মানে কি এটা ছিল?
শরীফ মুহাম্মদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিউজ সংযত হয়ে করার নির্দেশনাকে অজুহাত বানিয়ে অনেকে নিজেদের নীরব ভূমিকার পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন, কিন্তু ঘটনার তিনদিন পর এই রকম একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে নিয়ে এসে, যেটার সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের ব্যাপারটাও এখনও রয়ে গেছে, সেটার দ্বারা মজলুম মুসলমান, যারা ঘটনার দিন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদেরকে সাম্প্রদায়িক উসকানির মাধ্যমে আবারও আক্রান্ত করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে না তো?
তিনি বলেন, এই প্রশ্নটা আমার কাছে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসি এই সাম্প্রদায়িক উস্কানির সূচনা করেছে, আমি আশঙ্কা করছি, বাংলাদেশের ভারতপন্থী, সেকুলারপন্থী, হিন্দুত্ববাদপন্থী মিডিয়াগুলোও এই ঘটনাকে আরও রঙচঙ ছড়িয়ে স্থানীয় মুসলমানদেরকে নতুন করে নাজেহাল করার চেষ্টা খুব শিগগিরই চালাতে পারে।
