ভ্রষ্ট বাউল সমাজ: মারেফতের আড়ালে কুসংস্কার ও জালিয়াত

ভ্রষ্ট বাউল সমাজ: মারেফতের আড়ালে কুসংস্কার ও জালিয়াত

রাগিব রব্বানি:

শরিয়ত ও মারেফতের মধ্যে কাল্পনিক এক বিভাজন তৈরি করে এ দেশে বাউলশিল্পীদের ভ্রষ্টতা চর্চা ও প্রচারের ধারাবাহিকতা অনেক পুরনো। বাউল বিশ্বাসের নানা প্রথা ও পদ্ধতির মাধ্যমে এ ভ্রষ্টতা প্রচার করা হয়। তারমধ্যে পালাগান একটি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত ওরস কিংবা মেলায় এসব পালাগানের আসর জমানো হয়। প্রতি বছর শীতের মওসুমে এ ধরনের আসর বেশি হয়ে থাকে।

পালাগানে বাউলশিল্পীরা শরিয়ত ও মারেফত—দুটো পক্ষে অবস্থান নিয়ে গানে গানে শরিয়ত ও মারেফত সম্পর্কে এমনসব যুক্তিতর্ক খাড়া করে, যার কোনো ভিত্তি নেই। এখানকার অধিকাংশ কথাবার্তায় থাকে শরিয়তের বিভিন্ন টেক্সট নিয়ে জালিয়াতি, আর বাকিসব কথাবার্তায় থাকে কুসংস্কার। কারণ, বাউলশিল্পীরা ইসলাম ও শরিয়াহ সম্বন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তো দূরের কথা, মানসম্মতভাবে ব্যক্তিগত পড়াশোনাও করে না। গুরু পরম্পরায় প্রাপ্ত কুরআন-হাদিসের কিছু ভাষ্যের বিকৃত কথাবার্তা দিয়ে তারা নিজেদের মত ও বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি খাড়া করে। এবং এগুলোই গানে গানে বলে বেড়ায় পালাগানের আসরগুলোতে।

এসব বাউলশিল্পী পালাগানের আসরগুলোতে বাদ্য-বাজনা হারাম না হবার বয়ানসহ ইসলামি শরিয়াহর প্রমাণসিদ্ধ নানা বিষয়কে অস্বীকার করে। একই সঙ্গে ওলামায়ে কেরাম সম্পর্কে বিষোদগার করে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। থাকে নবি ও ওলিআওলিয়ার প্রতি ভক্তির নামে শিরক ও কুফরি কথাবার্তাও।

একটা সময় বাউলশিল্পীদের এই ভ্রষ্টতা নির্দিষ্ট আসরগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। ইউটিউবে গড়ে ওঠা বাউলদের অসংখ্য চ্যানেল পালাগানের আসরগুলো কাভার করে।

সম্প্রতি শরিয়ত সরকার নামে এক বাউলশিল্পীর পালাগানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সে বাদ্যবাজনাকে হালাল করার জন্য নানা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছে। ইসলামি শরিয়াহর আলোকে গানবাদ্যকে ওলামায়ে কেরাম হারাম বলার কারণে তাঁদেরকে গালিগালাজ করে। কিয়ামের মজলিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজেই হাজির থাকেন দাবি করে।

একপর্যায়ে নবি হজরত দাউদ আলায়হিস সালাম কোনো নবি ছিলেন না বলে দাবি করে বসে এই লোকটি। তার মতে হজরত দাউদ একজন বয়াতি ছিলেন। সে বলে, ২৩ রকমের বাদ্যযন্ত্র ছিল হজরত দাউদের এবং এই বাদ্যযন্ত্রগুলো নাকি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হস্তগতও হয়েছিল! নবিজি পরে ওইগুলো প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরিকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন!

এ ছাড়া এই লোকটি আরও দাবি করে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নাকি গানবাজনা না শুনে রাতে ঘুমোতে যেতেন না। নামাজি মুসলিমদেরকে কটাক্ষ করে ওই ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়, যেসব নামাজির কপালে সেজদার কারণে কালো দাগ পড়ে, সেখান থেকে ১১৩টি কিরা (এক ধরনের পোকা) বের হয়!

তার এসব বানোয়াট ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যের জন্য অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ১১ জানুয়ারি আদালত তাকে তিনদিনের রিমান্ড দিয়েছে।

ইউটিউবে এমন আরও অনেক বক্তব্য আছে বাউলশিল্পীদের, যা মারেফত চর্চার নামে বিভ্রান্তি ও অসংলগ্নতাপূর্ণ। ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া এমন আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কুরআনের একটি আয়াতের অপব্যাখ্যা করে ফকির আবুল সরকার নামে এক বাউলশিল্পী একটি পালাগানের আসরে বলছে, কুরআন নারীকে ‘জমি’ আখ্যা দিয়েছে, আর পুরুষকে ‘চাষী’।

তার ভাষ্যমতে ‘চাষী’ এই ‘জমি’তে কীভাবে ‘চাষ’ করবে, কীভাবে ‘বীজ’ রোপণ করবে, রোপণের সঠিক সময় কোনটি তা জানার জন্যই মুর্শিদ ধরার প্রয়োজন। মুর্শিদই শিখিয়ে দেবেন কীভাবে কী করতে হবে!

বাউলশিল্পীদের এই ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা বিষয়ে মতামত জানতে কথা হয়েছিল বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও চিন্তাবিদ আলেম ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাউলদের ভ্রষ্টতা অনেক পুরনো একটি বিষয়। দীর্ঘ একটা কাল ধরে তারা এই ভ্রষ্টতা ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ইসলামের সঙ্গে এসব কথাবার্তার কোনো সংশ্লেষ নেই। বিশেষ করে পালাগানের আসরগুলোতে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে আলেম-ওলামাকে যেভাবে বিষোদগার করা হয়, নবিজির শানে বেয়াদবিমূলক যে সমস্ত কথাবার্তা বলা হয়, তা অত্যন্ত ভয়ংকর।

গ্রেপ্তার শরিয়ত সরকারের ভিডিওটি তিনি দেখেছেন জানিয়ে বিশিষ্ট এ আলেম বলেন, আদালত এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার করুক। এবং শরিয়াহ সম্বন্ধে এমন জাহালাত যারা ছড়াচ্ছে, তাদের সকলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

পাশাপাশি তিনি ওলামায়ে কেরামের প্রতিও আহ্বান জানান, এসব বাউলশিল্পীর ভ্রষ্টতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও ব্যাপকভাবে সচেতন করতে যেন তাঁরা উদ্যোগী হন।

আগের সংবাদবাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় আটক ভারতীয় নাগরিক
পরবর্তি সংবাদইমরান খানকে সফরের আমন্ত্রণ জানাবে ভারত