
(ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব ও লালবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতি তৈয়্যব সাহেবের লেখা অনুসরণে বক্ষমাণ লেখাটি সাজিয়েছেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেলের দুই পুত্র আতাউল মুনঈম লাবীব ও রিজাউল মুনঈম নাবীল)
ভূমিকা
এ বঙ্গের ইতিহাসে মুসলিম শাসনের সূচনা লগ্নে এক কালো অধ্যায়ের সাথে জড়িত হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দ। প্রচণ্ড মুসলিমবিদ্বেষী অত্যাচারী এই শাসকের ক্ষমতার দাপট ছিল সর্বব্যাপী। মুসলমানদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলা ছিল তার নিত্যদিনের আনন্দ-বিনোদন। তার এই নৃশংস খেলার বলি হয়ে কত যে নিরপরাধ মুসলমান জীবন দিয়েছেন তার অন্ত নেই। গরু আকিকা করার অপরাধে নিরপরাধ নিষ্পাপ মুসলিম শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। মসজিদে মসজিদে আজান ও নামাজের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু রাজার এমনই অত্যাচার ও নিপীড়নে মুসলিম সমাজ যখন দিশেহারা,তাদের অস্তিত্ব যখন হুমকির সম্মুখীন, তখনই আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সীমাহীন দুর্ভোগ লাঘবের জন্য একদল মর্দে মুমিন পাঠালেন তৎকালীন শ্রীহট্টে, বর্তমান সিলেটে। হযরত শাহজালাল ইয়ামানী (রহ.) ৩৬০জন সঙ্গী নিয়ে এ অঞ্চলে আসলেন ইসলাম প্রচারের মহান উদ্দেশ্য নিয়ে।
হযরত শাহজালাল ইয়ামানী(রহ.)-এর নেতৃত্বে প্রধান সেনাপতি হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন এবং তার ৩৬০জন সঙ্গীর হাতেই সিলেট অঞ্চল বিজিত হল। মুসলমানদের পূর্ণাঙ্গ শাসন প্রতিষ্ঠিত হল। ১৫ অক্টোবর শুক্রবার ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক ইনকিলাবে হযরত শাহজালাল (রহ.)- এর সঙ্গীদের নাম ছাপা হয়েছিল। তার মধ্যে ৩৫নম্বর নামটি ছিল শেখ শাহাবাজ (রহ.) এর। ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে হযরত শেখ শাহাবাজ (রহ.) বর্তমান নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার শেখেরগাঁও গ্রামে চলে আসেন এবং এখানেই জীবনের বাকি সময়টুকু কাটান। সম্ভবত তার নামানুসারে এই গ্রামের নাম হয় শেখের গাঁও। তার অনেক কারামত ও কিংবদন্তীর কথা এখনো লোকমুখে শোনা যায়। সেই শেখ শাহাবাজ (রহ.) এর বংশীয় ধারাবাহিকতায় নবম পুরুষ ছিলেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমতুল্লাহি আলাইহি।
তার বংশ ধারাবাহিকতা নিম্নরূপ-
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল কুরাইশী রহ.
পিতা মাওলানা ফখরুদ্দিন কোরাইশী রহ.
পিতা মাওলানা হারিছ উদ্দিন কুরাইশী কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ মুহাম্মদ ইসমাইল হোসাইন কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ মুহাম্মদ হায়দার কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ মুহাম্মদ রাজন কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ মোহাম্মদ মুসা কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ মোহাম্মদ ঈসা কুরাইশী রহ.
পিতা শেখ শাহাবাজ কুরাইশী রহ.(তিনি কুরাইশ বংশের ছিলেন।)
বংশ সূত্রের এই ক্রমধারাটি লিখিতভাবে সংরক্ষিত ছিল কিশোরগঞ্জ কটিয়াদির হযরত মাওলানা শামসুল হক খাজা সাহেব রহ.এর নিকট। তার থেকে জীবদ্দশাতেই আহলুল্লাহ ওয়াসেল (রহ.) সংগ্রহ করেছিলেন। আমি (নাবীল) তার কাছ থেকে শুনে মুখস্ত করে কয়েকবার আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. কে শুনিয়েছি।
জন্ম
ক্ষণজন্মা এই মহা মনীষী ১২ডিসেম্বর ১৯৭০খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ শহরের নওমহলে নানা হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন কুরাইশী রহ.-এর বাসায় মা রাজিয়া বেগমের কোল আলো করে জন্ম গ্রহণ করেন। নানা জালালুদ্দিন কুরাইশী রহ. এবং দাদা হারিছ উদ্দীন কুরাইশী রহ. আপন ভাই ছিলেন। তাঁর পিতা মাওলানা ফখরুদ্দিন রহ. পরহেজগার এবং বিশিষ্ট দায়ী ছিলেন। দুই বছর বয়সেই শিশু আহলুল্লাহ ওয়াসেল তার মাকে হারান। মা হারা এই শিশুকে মমতা, ভালোবাসা দিয়ে পরম স্নেহের আদরে সকলেই কাছে টেনে নিলেন । নম্র ভদ্র আচার ব্যবহারের দরুন তিনি সকলের নিকট প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে লাগলেন। এভাবে তিনি সকলের আদর ভালোবাসা পেয়ে পর্যায়ক্রমে বড় হতে থাকেন। তার পিতা মাওলানা ফখরুদ্দিন রহ.শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্য করে কিছু টাকা উপার্জনের পর তিনি শহরতলি আকুয়া মোড়ল বাড়ী মাদ্রাসা মার্কেটের পাশে এক খন্ড জমি কিনে সেখানে বাসা নির্মাণ করে স্হায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
১৯৮৯ খ্রি.সনে তিনি বাড়িটি বিক্রি করে আবারো পিতৃভূমি নরসিংদী মনোহরদী শেখেরগাঁও গ্রামে চলে আসেন। নরসিংদী আসার পর পরই তার পিতা মাওলানা হারিছ উদ্দিন রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত জামিউল উলূম সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১১-১২ বছর । এ দায়িত্ব পালন শেষে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে অবসরে চলে যান। এরপর ১৯৯৬ কিংবা ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে মনোহরদী উপজেলা মডেল মসজিদের জুমার খতিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এই সকল কাজকর্মের পাশাপাশি তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গাজীপুর কাপাসিয়া বেলতলী বাজার মারকাজ মসজিদে আমীরের জিম্মাদারী পালন করেন। এছাড়া তিনি মনোহরদী উপজেলা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ এর প্রায় দীর্ঘ ৪২বছর ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালের ২জানুয়ারি মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমদ রহ. ইন্তেকাল করলে তারই বড় ছেলে মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. এর ইমামতিতে জানাজা শেষে শেখেরগাঁও জামিউল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শিক্ষাজীবন
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. পাঁচ বছর বয়সে প্রাথমিক লেখাপড়া তার পিতা মাওলানা ফখরুদ্দিন রহ. এর নিকট সূচনা করেন। মাত্র আট বছর বয়সে তৎকালীন ময়মনসিংহ শহরের প্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম বর্তমান জামিয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি করিয়ে দেন। প্রাথমিক পড়াশোনা নাজেরা বিভাগ শেষ করার পর তৎকালীন সময়ে ওই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের প্রধান ওস্তাদ হাফেজ মাওলানা আহমদ উল্লাহ সাহেব এর নিকট কুরআনে কারীম হিফজের উদ্দেশ্যে তুলে দেন। মাদ্রাসা সংক্রান্ত বিভিন্ন ঝামেলার দরুন তার তখনকার উস্তাদ মাওলানা আহমদ উল্লাহ সাহেব ওই মাদ্রাসা ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে ওই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের প্রধান ওস্তাদ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন হযরত মাওলানা হাফেজ আহমদ আলী সাহেব। সেই ওস্তাদের নিকটই তিনি তিনি মাত্র তিন বছরে কুরআনে কারীমের হেফজ সম্পন্ন করেন। মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.তার সেই ওস্তাদকে এতটাই ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন যেরকম শ্রদ্ধা করতেন তার বাবাকে। তার সেই ওস্তাদ মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসলে তার ছাত্র মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল এর নিকট এসে দেখা না করে যেতেন না। ১৯৮২ খ্রি. সনে তিনি সেই মাদ্রাসা জামেয়া ইসলামিয়ায় উর্দু ভাষার প্রাথমিক পড়াশুনা সম্পন্ন করেন।
নূরিয়ার শিক্ষাজীবন
শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাই তার অতিবাহিত হয়েছে তৎকালীন মাদ্রাসা নূরিয়ায়। তার যৌবনকাল পরিচালিত হয়েছে আমীরে শরীয়ত মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর রুহানি ফয়েজ ও বরকতে। যোগ্য ওস্তাদ ও আদর্শ শিক্ষা পরিচালনার দরুন তখন নূরিয়ার সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পরেছিল। ১৯৮১সনে রাষ্ট্র নির্বাচন ও রাজনীতির দরুন হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ. হয়েছিলেন সারাবিশ্বেই আলোকিত ও আলোড়িত। ঠিক ওই সময়টাতেই ১৯৮২ সনের শেষ দিকে ইলমে দ্বীন অর্জনের আশা বুকে নিয়ে মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. তার অভিভাবকদের নির্দেশে চলে আসেন কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসা নুরিয়াতে। সেখানে তাইসীর জামাতে তিনি ভর্তি হন। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর অন্যতম খলিফা তখনকার নুরিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল হক দা.বা.। তার পিতা তাকে সেই উস্তাদের তত্ত্বাবধানে ওই কামরায় থেকে লেখাপড়া করার ব্যবস্থা করেন। সেই ওস্তাদ ছাত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে তার চোখে চোখে রাখতেন। লেখাপড়ার প্রতি চরম আগ্রহ ও ঝোক দেখার পর মাদ্রাসার সকল আসাতিযায়ে কেরামও তার দিকে বিশেষ নজর দিতেন। শ্বাসকষ্ট রোগটি ছাত্র বেলা থেকেই তাকে অনেক ভুগিয়েছে। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সকলের নিকট তিনি আদরের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।
তার জীবন চলার পাথেয় হিসেবে মুরুব্বি ছিলেন মাওলানা আব্দুল হক দা.বা.। লেখা পড়ার প্রতি উৎসাহিত হয়েছিলেন মাওলানা শেখ আজিম উদ্দিন দা.বা.থেকে। এবং আরবি ও বাংলা ভাষা সাহিত্যের উপর দক্ষতা অর্জন করেছিলেন মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দা.বা. এর নিকটে। হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ.ও হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ সন্দীপি রহ.উভয়ই পড়াশোনার পাশাপাশি শায়েখ হিসেবেও অন্যতম ছিলেন। মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. এর হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত চমৎকার। যার ফলে তখনকার নুরিয়ায় যে সকল দেয়ালিকা বের হতো তাতে তার হাতের লেখা দিয়েই প্রকাশ করা হতো। বাংলা সাহিত্যের দিক দিয়েও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ব্যক্তিত্ব। যার দরুন তখনকার নুরিয়ার দেয়ালিকায় তার নামেও লেখা বের হতো। এছাড়া ‘আল কলম’ নামে তখনকার একটি মাসিক আরবি পত্রিকা আদিব সাহেব হুজুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো। তাতে তিনি নিয়মিত লেখা দিতেন। যার ফলে পরবর্তীকালে অনুবাদ ও সাংবাদিকতার জগতে তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব।
এ সময় নুরিয়াতে বর্তমান বাংলা সাহিত্য ও মিডিয়া জগতের অনন্য ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ তার সাথে লেখাপড়া করতেন। সম্পর্কের দিক দিয়ে তারা একে অপরের আপন খালাতো ভাই। দুই ভাই একই সাথে পড়ালেখা করায় তাদের মাঝে সব সময়ই একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব ছিল। হযরত মাওলানা আদীব সাহেব হুজুরের পর লেখালেখিতে আরো উৎসাহিত করেন বর্তমান আলহাইয়াতু উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ এর বর্তমান প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হযরত মাওলানা ইসমাইল বরিশালী দা.বা.।১৯৯০ খ্রি.সন পর্যন্ত তিনি নূরিয়ায় জালালাইন জামাত পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।
লালবাগের শিক্ষাজীবন:
তার লেখাপড়ার তৃতীয় ও সর্বশেষ ধাপ শুরু হয় তৎকালীন দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ মাদ্রাসা জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসায়। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে নূরিয়ায় মেশকাত জামাতে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু সমস্যার কারণে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি এবং তার খালাতো ভাই শরীফ মুহাম্মদ কুরবানীর পর পর সেখান থেকে চলে আসেন। অতঃপর তারা হামিদুল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী রহ. এর নির্দেশে লালবাগে মুজাহিদে মিল্লাত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.এর নিকট চলে আসেন। এবং হামিদুল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী রহ.এর অনুরোধে তাদের ভর্তি নেয়া হয়। জীবনের এই অধ্যায় তার জীবনে নিয়ে আসে এক নতুন অনুপ্রেরণা। বছরের মাঝখানে ভর্তি হওয়ায় মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. দৃষ্টি এড়ানোর সুযোগ ছিল না। সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে হযরত মাওলানা মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। মাঝেমধ্যেই মুফতি আমিনী রহ.তাকে ডেকে এনে ছোটখাটো কাজ দিতেন। উস্তাদের আদেশ নিখুঁতভাবে সম্পাদনা করে যথাসময়ে জমা দিতেন। তা দেখে মুফতি আমিনী রহ.অত্যান্ত খুশি হতেন। আনন্দে আবেগে আপ্লুত হতেন। তিনি অন্তর থেকে দোয়া করতেন ছাত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য।
এভাবেই গড়ে উঠতে থাকে মুফতি আমিনী রহ.এর সাথে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। মুফতি আমিনী রহ. রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার ফলে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বক্তৃতা-বিবৃতি লেখাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। লালবাগে আসার পর তিনি তিন বছর তাকমিল, মিশকাত ও তাফসীর জামাতে পড়াশোনা করেন। স্বয়ং মুফতি আমিনী রহ.এর নিকট তিনি তাফসীরের দরস করতেন। মুহাক্কিক আলেম হযরত মাওলানা আব্দুল মাজীদ ঢাকুবী হুজুর রহ.ছিলেন তার তাফসীরের ওস্তাদ। ওস্তাদ দের মধ্যে আরও ছিলেন
হযরত মাওলানা শামসুল আলম চাটগামী হুজুর রহ. হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান রহ.
হযরত মাওলানা মুজিবুর রহমান বাবা হুজুর রহ.
হযরত মাওলানা গোলাম মোস্তফা রহ.
হযরত মাওলানা আব্দুর রব মদিনা হুজুর দা.বা.
হযরত মাওলানা আব্দুল হাই হাই দা.বা.
হযরত মাওলানা হাবিবুর রহমান হাজী সাহেব হুজুর দা.বা.
হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ দা.বা. প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ আসাতিযায়ে কেরাম। ফলে তিনি যোগ্যতার শীর্ষে উঠতে সক্ষম হন। আর এ সময় তিনি হযরত মাওলানা মুজাহিদে মিল্লাত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.এর রাজনীতির নীরব কর্মকান্ডে একান্ত সহচর হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
কর্মজীবন
লালবাগ মাদ্রাসা থেকে ১৯৯৩ খ্রি. সনে তাফসির বিভাগে সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরই মুফতি আমিনী রহ. তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মুফতি আমিনী রহ. এর বক্তৃতা-বিবৃতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় লেখালেখির দায়িত্বপালন করেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই লালবাগ মাদ্রাসার দেয়ালিকা, স্মারকগ্রন্থ ও অন্যান্য বই ইত্যাদিতে নিজের নাম ফোটানো পছন্দ করতেন না । সবসময় তিনি ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে যেতেন। এই সমস্ত গুণ-বৈশিষ্ট্যের কারণে মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.তার প্রেস সচিবের দায়িত্ব অর্পণ করেন। একটা সময় তিনি এসব ক্ষেত্রে মুফতি আমিনী রহ.এর এতটাই আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হন যে, তার বিভিন্ন সফরের কর্মসূচি, সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎ কিংবা সংবাদ সম্মেলন এবং মুফতি আমিন রহ. কোথায় কি বলবেন ইত্যাদি বিষয় তিনি ঠিক করতেন। এমনকি কোন সাংবাদিক যদি মুফতি আমিনী রহ. এর সাথে দেখা করতে চাইতো তাহলে সর্বপ্রথম তার সাথে যোগাযোগ করতো। এ সকল কাজকর্ম মুফতি আমিনী রহ. এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যথাযথভাবে ইখলাসের সাথে পালন করেছেন।
তিনি লালবাগ মাদ্রাসার ছাত্র কিংবা শিক্ষক কারো সাথে কখনো বিরূপ আচরণ করেননি। এটি ছিল তার স্বভাব এর বিরুদ্ধে। মিল, মুহাব্বত ও ভালোবাসা ছিল তার স্বভাবজাত অভ্যাস। তার শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত অভিনব। কঠিন থেকে কঠিনতম বিষয়গুলো ছাত্রদেরকে খুব সহজেই বুঝিয়ে দিতেন। তিনি নিজ কৌশল ও অভিনব পদ্ধতিতে কিতাব বুঝাতে কার্পণ্য করতেন না। যার ফলে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে তাকে পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হতো জটিল ও কঠিন কিতাবগুলো; মুখতাসারুল মা’আনী, তালখিসুল মিফতাহ, কানযুদ দাকায়েক, শরহে তাহজীব ও গুলিস্তাঁ ইত্যাদির মত জটিল কিতাবগুলো বেশিরভাগ সময় তিনিই পড়িয়েছেন। এই সমস্ত কঠিন কিতাবগুলোর দায়িত্ব দেওয়ার পরেও কখনো তার কোনো অভিযোগ ছিল না। বরং তিনি উদার মনে তা পড়াতেন। উপরের জামাতের কিতাব কিংবা তার পছন্দের কিতাব ইত্যাদি পাওয়ার জন্য কখনই চেষ্টা করেননি। তিনি পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রদেরকে হাতের লেখা সুন্দর করার প্রতিও তাকীদ দিতেন। ছাত্ররা তার কাছ থেকে হাতের লেখা নিতো। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন: ‘যে কোনো সময় তোরা আমার কাছে পড়াশুনা কিংবা হাতের লেখা বিষয়ক যেকোনো সমস্যার জন্য আসবি’ ফলে তিনি তার নিজ বাসায় থাকা অবস্থাতেও যদি কোন ছাত্র আসতো তাহলে তিনি একটুও বিরক্ত বোধ করতেন না।
মুফতি আমিনী রহ. এর মৃত্যুর পর তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসায় দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত হয়ে পড়েন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মাদরাসার নাম নিম্নে বর্ণিত হল।
শহীদ নগর ইকরা ইন্টার্নেশনাল তাহফিজুল কুরআন মাদরাসা।
জামিয়া আরাবিয়া মুসলিমবাগ শনির আখড়া যাত্রাবাড়ী।
দারুল উলুম তা’লীমুল কুরআন মাদ্রাসা শেখেরগাঁও মনোহরদী। তিনি অত্র মাদ্রাসার সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা।
কেরানীগঞ্জ জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসা রাজাবাড়ী ঢাকা। তিনি অত্র মাদ্রাসার সম্মানিত মুহাদ্দিস ছিলেন।
কাপাসিয়া ঈদগাহে ইমামতি
গাজীপুরে কাপাসিয়া বারিষাব বাজার আব্দুল হাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এর ঈদগাহ মাঠে তিনি প্রায় দীর্ঘ ১০-১২ বছর নিয়মিত ঈদের জামাতে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মময় জীবনের সবটুকুই ছিল দ্বীনের জন্য উৎসর্গিত। তিনি একমাত্র লালবাগ মাদ্রাসা থেকেই নিয়মিত ভাতা গ্রহণ করতেন। তাও ছিল জীবন বাঁচানোর তাগিদে। বাকি অন্যসব খেদমতই ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
লেখালেখি
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. দরস-তাদরীস, রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের সাথে সাথে তার বড় একটি পরিচয় যে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক। অনুবাদক ও সম্পাদক ছিলেন। অন্য সব কাজকর্ম ঠিক রেখেও প্রতিনিয়ত লেখালেখি চালিয়েই যেতেন। তার এককগ্রন্থ খুব কম হলেও অন্যকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে তার কলম সর্বদা ব্যস্ত রাখতেন। লালবাগ জামেয়া থেকে প্রকাশিত প্রায় সব কটি স্মারকগ্রন্থে তার অবদান অবিস্মরণীয়। লালবাগ জামিয়ার ছাত্রদের উদ্যোগে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের প্রতিটিতেই ছিল তার কলমের আচড়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই যেগুলো অনেকটা তার সম্পাদনাতেই হয়েছিল আলোর কাফেলা, আদর্শ ছাত্র, আল্লাহর পথে ও আদর্শ রাজনীতি ও আদর্শ রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি। তা ছাড়াও লালবাগ জামেয়া থেকে প্রকাশিত এগারো খন্ডের কিতাব ফাতাওয়ায়ে জামেয়াতেও ছিল তার হাতের ছোয়া।
তার রচিত জীবনের অনন্য একটি গ্রন্থ হল ‘রাসুল সা.- এর মুজিযা’ বইটি। মাসিক মদিনায় তিনি প্রায় নিয়মিত লেখক ছিলেন। লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন একেবারেই নিঃস্বার্থ। ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে দ্বীনী কাজ হিসেবেই তিনি এসকল খেদমত খেদমত করে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তার দ্বীনি খেদমত গুলোকে কবুল করে তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম এ এ করেন।
পারিবারিক জীবন
বিয়ে
লালবাগ জামিয়ায় তিন বছরের কর্মজীবন শেষ করে তিনি নয়াটোলা এ ইউ এন মডেল কামিল মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন রহ. এর দ্বিতীয় কন্যা মোসাম্মৎ মুহসিনা খাতুন কে বিবাহ করেন। মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.স্বয়ং নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে বিবাহের আকদ সম্পন্ন করেন।
সন্তান
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.এর চার সন্তানের বাবা ছিলেন। দুই ছেলে দুই মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে দুই ছেলে বড়। বিয়ের দ্বিতীয় বছর ১৮জুলাই ১৯৯৯ খ্রি.বড় ছেলে হাফেজ মোঃ আতাউল মুনঈম লাবীব জন্ম গ্রহণ করে। বিয়ের চতুর্থ বছর ১৭জানুয়ারি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ছোট ছেলে হাফেজ মোঃ রেজাউল মুনঈম নাবীল জন্মগ্রহণ করে। ২৭মে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.এর প্রথম কন্যা-সন্তান আমাতুল মুনঈম তুবা জন্মগ্রহণ করে। ২৮সেপ্টেম্বর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় কন্যা সন্তান আবিদ আতুল মুনঈম তাহিয়া জন্মগ্রহণ করে।
বড় ছেলে হাফেজ মোঃ আতাউল মুনঈম লাবিব শ্যামলী, কল্যাণপুর মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় জালালাইন জামাতে পড়ছে। দ্বিতীয় ছেলে হাফেজ মোহাম্মদ রিজাউল মুনঈম নাবীল জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসায় হেদায়াতুন নাহু জামাতে পড়ছে। বড় মেয়ে মোসাম্মৎ আমাতুল মুনঈম তুবা, ইসলামবাগ ইসলামিয়া আদর্শ মহিলা মাদ্রাসায় কুদুরী জামাতে পড়ছে। ছোট মেয়ে মুহাম্মদ আবিদাতুল মুনঈম তাহিয়া অত্র মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে পড়ছে।
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.-এর জীবন ছিল একেবারেই সাদাসিধে। অর্থনৈতিক দৈন্যতা থাকলেও পরিবারের সদস্যদের তা কখনো বুঝতে দেননি। সন্তানদের আবদার ও প্রয়োজন পূরণে তিনি ছিলেন খুবই সচেতন ও সতর্ক। মৌসুমের প্রথম ফল তুলে দিতেন তার সন্তানদের মুখে। সন্তানদের আদর্শ জীবন গঠনে তিনি সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। সর্বদাই তিনি তা নিয়ে ফিকির করতেন। তাদেরকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো আনা নেওয়ার দায়িত্ব অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি নিজেই করতেন। আমানতদারিতা বিশ্বস্ততার এক প্রতিচ্ছবি যেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.। সকলের সাথে সদাহাস্য ও নম্র ব্যবহার যেন তার চিরচারিত অভ্যাস। কারো কঠোর ব্যবহারে ক্ষিপ্ত না হয়ে জবাব দিতেন উত্তম উপায়ে।
ইবাদত-বন্দেগী যেন ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ। অর্থ উপার্জনের লালসা ছিল না তার অন্তরে। জীবন চলার উপকরণ ব্যবস্থা হলেই তিনি থাকতেন সন্তুষ্ট ও তুষ্ট। এমন একজন আদর্শ মানুষ বর্তমানে খুঁজে পাওয়া খুবই দুস্কর ব্যাপার। দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ এ মানুষটির প্রয়োজন ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের। তবে আল্লাহর ইচ্ছা তিনি তার প্রিয় বান্দাকে প্রিয় বান্দাকে তার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন যাবেন সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছা রুখে দেয়ার শক্তি কারো নেই। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্লান্তিহীন জীবনের
ইন্তেকাল
উপরওয়ালা যাকে এ ধরার বুকে পাঠিয়েছেন তার মৃত্যু অবধারিত। তিনি যখন চান তাকে নিয়ে যান। তবে তার প্রিয় বান্দাদেরকে দুনিয়ার প্রলোভন থেকে বাঁচাতে তিনি খুব শীঘ্রই তার নিকট ডেকে নেন। তেমনি প্রিয় বান্দাদের একজন ছিলেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.। শ্বাসকষ্ট রোগটি তার ছিল পুরানো রোগ। ছাত্রজীবনে শ্বাসকষ্টে তিনি অনেক ভুগেছেন। ছাত্রজীবনের পর থেকে থেকে ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত শ্বাসকষ্ট একদমই ছিলনা। ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বেও তিনি ছিলেন একদম সুস্থ। অন্য কোন রোগ বালাই ছিল না তার। তিনি ক্লাস করাতেন নিয়মিত। অন্যান্য কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন পূর্বের ন্যায়। কারো ধারণাও ছিল না যে তিনি এভাবে চলে যাবেন। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রোজ শুক্রবার তিনি পূর্বের সপ্তাহ গুলোর ন্যায় মনোহরদী উপজেলা মসজিদে নামাজ পড়িয়ে আসেন। সেদিনও তিনি একদম সুস্থ সবল একজন মানুষ। ২৯সেপ্টেম্বর ২০১৮ রোজ শনিবার প্রতিদিনের ন্যায় ক্লাস করাতে যান। ক্লাস থেকে ফিরে এসে আসরের পর তার ছোট মেয়ে তাহিয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। মাগরিবের পর থেকে জ্বরে আক্রান্ত হন। অল্প অল্প শ্বাসকষ্ট দখা দেয় তখন। সময় যত বাড়তে থাকে শ্বাসকষ্টের রূপ আরো ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এশার নামাজের পর তার ছোট ছেলে নাবীল ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধ নিয়ে আসে এবং সে মাদ্রাসায় চলে যায়। পিতার দেখাশোনার জন্য তার বড় ছেলে লাবীব বাসায় থেকে যায়। রাতে দুই থেকে তিনবার বমি হয় এবং বমির সাথে রক্ত বের হয়।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রোজ রবিবার সকাল থেকে তার শ্বাসকষ্ট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অতঃপর তার বড় ছেলে লাবীব এবং লালবাগ মাদরাসার আরো দুজন ছাত্র মিলে হাসপাতাল নেওয়ার ব্যবস্থা করে। বিল্ডিংয়ে লিফট না থাকার দরুন দুজন ধরে নিচে নামিয়ে গাড়িতে উঠানো হয়, সিঁড়ি দিয়ে নামানোর ফলে গাড়িতে ওঠার পর পরই শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। একবারের জায়গায় তিন তিনবার ইনহেলার নেওয়ার পরও কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। এই অবস্থা দেখে বড় ছেলে লাবীব রাস্তার পাশের ফার্মেসি দেখে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে এখানে নেমে কি নেবুলাইজার দিবেন কিনা। উত্তরে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করলেন। তার শ্বাসকষ্ট ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। শ্বাসকষ্টে অসহ্য হয়ে তার বড় ছেলে লাবীবকে বলেন ‘তুমি সেন্ট্রাল হাসপাতালে আব্দুল ওয়াহাব সাহেবকে ফোন করে বল আমার জন্য ইমারজেন্সি একটি বেট খালি রাখতে এবং তিনি নিজেও যেন নিচে থাকেন। আর তোমরা সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করো।’ এ অবস্থা দেখে তার বড় ছেলে লাবীব কাঁদতে শুরু করলে তিনি বললেন ‘কেঁদো না এবং তোমার আম্মুকে জানিও না জানালে অযথাই টেনশন করবে।’
তিনি ঘামতে শুরু করলেন তার পাশে থাকা ছাত্রটি তাকে বলল হুজুর আপনার পাঞ্জাবি খুলে দেই আপনি তো খুব ঘামছেন। তিনি মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলেন। অতঃপর ছাত্রটি বলল আপনার টুপি খুলে দেই তিনি তাতেও সম্মত হলেন না। অতঃপর ছাত্রটি বলল গাড়ির কাচ নামিয়ে দিই তিনি বললেন ধুলোবালি আসবে এতে আমার কষ্ট হবে। তিনি সেই মুহূর্তেও গাড়ির ড্রাইভারকে রাস্তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। অতঃপর তার নাক থেকে একটু রক্ত গড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ডানদিকে ছাত্রের কাঁধের উপর ঢলে পড়েন। এবং ঠোঁট নেড়ে কি যেন পড়তে থাকেন। এই অবস্থা দেখে তার বড় ছেলে লাবীব বাবার শ্বাস-প্রশ্বাস জারি আছে কিনা আছে কিনা দেখার জন্য তার বুকে ও নাকে হাত রাখে। সদ্য পরলোক গমন করা বাবার বুকে হাত রেখে ঢুকরে কেঁদে ওঠে বড় ছেলে লাবীব। তবুও হাল ছাড়েননি কেউ। প্রত্যেকেই মনে আশা নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। আব্দুল ওয়াহাব সাহেব নিজেই দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসপাতালের গেটে।। তাড়াহুড়ো করে ঢুকানো হয় ইমারজেন্সিতে। এদিকে সুমন্দি হাফেজ মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ এসে পৌছে হাসপাতলে। ইমার্জেন্সির বাইরে বুক ভরা আশা নিয়ে হাফেজ মাওলানা ওয়ালি উল্লাহ, লাবিব ও লালবাগের দুজন ছাত্র অধীর অপেক্ষায় থাকে একটি ভালো সংবাদের। তবে নিয়তির এই তিক্ত বাস্তবতাকে সেদিন মেনে নিতে হয়েছিল প্রত্যেকেরই। ভিতর থেকে হতাশাগ্রস্ত চেহারা নিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন বেড়িয়ে এলেন আবদুল ওয়াহাব সাহেব এবং বলেলন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
দাফন-কাফন ও জানাযা
প্রথম জানাযা
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. এর আকস্মিক মৃত্যুর খবর খুব দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তার ওস্তাদ, সহকর্মী ও হাজারো ছাত্রের হৃদয়ে ঘটে রক্তক্ষরণ। এমন আদর্শবান ইখলাস ওয়ালা একজন মানুষ এবং সকলের প্রিয় একজন ব্যক্তি এভাবে চলে যাবেন কেউ কল্পনাও করেনি অতঃপর হাসপাতাল থেকে তার লাশ নিয়ে আসা হয় লালবাগ জামেয়ায়। যোহরের পর সিদ্ধান্ত হয় যে তিনটায় তার প্রথম জানাজা লালবাগ শাহী মসজিদ অনুষ্ঠিত হবে মাত্র এক ঘণ্টা সময়ের মাঝে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন তার সহকর্মী প্রিয় ছাত্র ও ভক্ত বৃন্দ হাজার হাজার আলেম ওলামা। লালবাগ জামেয়া শায়খুল হাদিস হাদিস হযরত মাওলানা আব্দুল হাই দা বা এর ইমামতিতে হাজারো আলেম-উলামা ছাত্র-শিক্ষক ভক্তবৃন্দ সহ এলাকার ধর্মপ্রাণ এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপস্থিতিতে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ শামিল হন।
দ্বিতীয় জানাযা
মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. এর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় পুরো নরসিংদী জেলায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তাদের অহংকার ছিলেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমতুল্লাহি আলাইহি আলাইহি। কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তই অবধার। লালবাগের জানাজা শেষে মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমাতুল্লাহি আলাইহি আলাইহি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আলাইহিকে নরসিংদী মনোহরদী শেখেরগাঁও গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি বহর নিয়ে রওনা হলো। মাগরিব এর কিছুক্ষণ পর তার লাশ শেখেরগাঁও জামিউল জামিউল উলুম সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় পৌঁছলে পৌঁছলে এলাকার হাজার মানুষ তার লাশ এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায়। রাত ৯ টায় হাজার হাজার আলেম উলামা এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপস্থিতিতে তার দ্বিতীয় জানাজার নামাজ নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের ইমামতি করেন তার দ্বিতীয় ছেলে রিজাউল মুনিম নাবিল। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ লতিফ নেজামী, মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লা্ ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী, যুগ্ম মহাসচিব মুফতি তৈয়্যব হোসাইন, খালাতো ভাই মাওলানা শরীফ মুহাম্ম্ মাওলানা আলতাফ হোসেন, মাওলানা বশির মেসবাহ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ, মাওলানা সাইদুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গসহ জেলার গণ্যমান্য আলেম-ওলামা উপস্থিত ছিলেন।
দাফন
জানাজার নামাজ শেষে রাত দশটায় তার দাদা মাওলানা হারিছ উদ্দিন কুরাইশী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত জামিউল উলুম সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার উত্তর পার্শ্বে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে পিতা মরহুম মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমদ রহ. এর কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা এই বান্দার ভুল ত্রুটি মাফ করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তার পরিবার-পরিজনকে ধৈর্য ধারণ করার করার তৌফিক দান করুন। সেই সাথে তার তার দুই ছেলে ও দুই কন্যা সন্তানকে পিতার আদর্শ পিতার আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে ওঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিন। আমীন।
