মাওলানা মুস্তফা সাবরি : শেষ উসমানী শাইখুল ইসলামের বিপন্ন জীবন

মাওলানা মুস্তফা সাবরি : শেষ উসমানী শাইখুল ইসলামের বিপন্ন জীবন

মুজাহিদুল ইসলাম :

উসমানী সালতানাতের অন্তিম মূহুর্তে ইসলামের পতাকা তুলে ধরতে যারা নিজেদের আরাম-আয়েশ উৎসর্গ করেছেন, শাইখুল ইসলাম মুস্তফা সাবরি তাদের অন্যতম একজন। প্রথমে মুস্তফা সাবরির জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে সুলতান আব্দুল হামিদ তাকে প্রাসাদের লাইব্রেরীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর তিনি উসমানী সালতানাতের প্রভাবশালী ‘শাইখুল ইসলাম’ পদে চারবার নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও ‘সাদরে আযম’(প্রধানমন্ত্রী) পদে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১২ সালে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে যাওয়ার পর শুরু হয় দমন-পীড়ন।

এক রাতে নিরাপত্তাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে এলে তার বড় মেয়ে সাবিহা হানিমের সহায়তায় তিনি পালিয়ে যান রোমানিয়ার বুখারাস্থানে। কিভাবে একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি, সিনেটর, প্রধানমন্ত্রী ও শাইখুল ইসলামের মতো মানুষকে রাতের আঁধারে বাড়ির জানালা দিয়ে পালাতে হয়েছে, নিজের বই বিক্রি করে জাহাজের টিকেট ক্রয় করতে হয়েছে, অমুসলিম দেশে মৃত্যুবরণের আশংকায় মুসলিম দেশগুলোর উর্ধ্বতন কর্তাদের নিকট চিঠি ও তাদের দূতাবাসগুলোর নিকট ভিসার জন্য ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, এই লেখায় তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি

রোমানিয়াতে এসেও নিরাপদে থাকতে পারলেন না মুস্তফা সাবরি।  শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে তুরস্কের মিত্র জার্মানি রোমানিয়ায় অভিযান পরিচালনাকালে তার সন্ধান পায়। খবর চলে যায় তুরস্কে। এরপর তাকে গ্রেফতার করে ইস্তাম্বুলে সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা শুনানি চলতে থাকে। আমি জীবনের শেষ মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হতে থাকি। মৃত্যুদণ্ডাদেশ শোনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বিচারক তালাত পাশার বিশেষ বিবেচনায় আমাকে গৃহবন্দী রাখা হয়।’

পালানোর দিনগুলো

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পট পরিবর্তনে মুস্তফা সাবরি মুক্তি পেয়ে ফিরে আসেন রাজনীতির ময়দানে। অলংকৃত করেন শাইখুল ইসলাম এবং সাময়িক  প্রধানমন্ত্রীর পদ। দেশে সামরিক কমান্ডার মুস্তফা কামালের বিরুদ্ধে তিনি জনগনকে সচেতন করতে থাকেন। কিন্তু ততক্ষণে কামাল গ্রীসের ওপর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মুসলিম বিশ্বে নায়কে পরিণত। খেলাফাতকে প্রতিকী রেখে পার্লামেন্ট-কেন্দ্রিক সবকিছু চলতে থাকে। এসময় শুরু হয় খেলাফাতপন্থীদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন। গ্রেফতার অভিযান থেকে বাঁচতে শাইখ নিজের বইপত্র বিক্রি করে জাহাজের থার্ড ক্লাসের টিকেট কেটে ইস্তাম্বুলের আস্তানা থেকে মিসরের ইস্কান্দারিয়ায় পৌঁছান। যেখানে জাহাজ থেকে নামার সময় উষ্ণ সংবর্ধনা পাওয়ার কথা, সেখানে মিসরে তুরস্কের দূতাবাসের উসকানিতে তাঁর ওপর টমেটো ও আলু নিক্ষেপ করা হয়।

এরপর শাইখ বিভিন্ন দেশ হয়ে গ্রীসের প্রধান মুফতির আশ্বাসে সেখানে অবস্থান নেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই তুরস্ক ও গ্রীসের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে শাইখুল ইসলামকে গ্রীসের খৃস্টান অধ্যুষিত দ্বীপে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়।

মুসলিম দেশগুলোর কাছে চিঠি

গ্রীসের খৃস্টান অধিবাসীরা শাইখুল ইসলামকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়ে গ্রহণ করেন। কিন্তু খৃস্টানদের সঙ্গে সম্মানের সাথে থাকলেও অমুসলিম দেশে মৃত্যুবরণ করার আশংকায় চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি। কারণ এখানে মৃত্যুর পর তাকে খৃস্টান কবরস্থানে মাটি দেওয়া হবে। তাই শাইখ বিভিন্ন মুসলিম দেশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তদের নিকট তাদের দেশে বসবাসের আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠাতে থাকেন।

বিভিন্ন দেশে তার পাঠানো শাইখের এক চিঠির করুণ ভাষ্য থেকে তার হৃদয়ের পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। তিনি লিখেন, ‘আমি মোস্তফা সাবরি। উসমানী সাম্রাজ্যের বর্তমান শাইখুল ইসলাম। আমার পাসপোর্ট নেই। অতিথি হিসেবে বা শরণার্থী হিসেবেই হোক, আমি আপনার দেশে প্রবেশ করতে চাই। যে-কোন উপায়ে আপনি আমাকে গ্রহণ করুন।’

উসমানী সালতানাতের তার অনেক সহকর্মী পরবর্তী তাদের স্বাধীন দেশের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। হয়ত তারা সাড়া দিবে। কিন্তু কারো থেকে সাড়া না পেয়ে বিভিন্ন দূতাবাসে চেষ্টা করতে থাকেন।

তিনি তার পুত্র ইব্রাহিমকে নিয়ে এথেন্সের মিসরীয় কনস্যুলেট অফিসে আবেদন করেন। কনস্যুলেটের প্রধান শাইখের জন্য তিনি খুবই ব্যথিত হন। তাঁর জন্য ভিসা মঞ্জুর করে পরম সাহসিকতার সাথে কালজয়ী বক্তব্য দেন, ‘আমার সৌভাগ্য! যদি পোপ এমন পরিস্থিতিতে পড়তেন, তবে খৃস্টান বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী হতো? আমি সকল দায় নিচ্ছি। সরকার চাইলে আমাকে আমার চাকুরী থেকে বরখাস্ত, রাজনৈতিক অপরাধে আমাকে কারাগারে বন্দী করতে পারে বা আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। তবুও সবকিছুর ঝুঁকি নিয়ে আমি আপনাকে ভিসা দিচ্ছি।’

মিসরের ভিসা নিয়ে শাইখ যখন এবার সেখানে পৌঁছান, তিনি উষ্ণ সংবর্ধনা পান। কারণ, ততক্ষণ মিসরবাসী শাইখের ভবিষ্যতবাণীর বাস্তবায়ন দেখছিল। খেলাফাত বিলুপ্তিসহ ইসলামকে তুরস্ক থেকে বিতাড়িত করার ব্যবস্থা নিয়েছিল মোস্তফা কামাল। আর মিসরে তখন শাইখুল ইসলামের মতো লোকের প্রয়োজন ছিল। তার তত্বাবধানে মিসরে অনেক ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

শাইখুল ইসলামের আক্ষেপ

যখন শাইখ তার ভিসাকেন্দ্রিক জটিলতায় ভুগছিলেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর আসে, ভারতের মহাত্মা গান্ধী অনশনে যাচ্ছেন। তার অনশন যদি সফল হয়, কিংবা তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তবে হিন্দুদের বিদ্রোহ দেখা দিবে এবং ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লব সফল হবে। শাইখ এসব শুনে মনোকষ্টে বলেন, ‘গান্ধী অনশন-ধর্মঘট শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গোটা বিশ্ব কাঁপছে। উসমানীয় শাইখুল ইসলাম তার পরিবার নিয়ে কয়েক বছর ধরে অনাহারে রয়েছেন অথচ ইসলামী বিশ্বের কোন খবর নেই। আজ উসমানীয় রাজবংশ এমন করুণ অবস্থায়, যে শাইখুল ইসলাম কয়েক মাস ধরে শুকনো মটরশুটি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এ ব্যপারে কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার নেই।’

১৯৫৪ সালে প্রোস্টেট অপারেশনের পরে ৮৭ বয়সে উম্মাহের এই মহান দরদী ও আপোষহীন আলেম আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ওপারে চলে যান। যুগে যুগে স্বাধীনতা ও সত্যপ্রেমী মানুষদের আলোর মশাল হয়ে থাকবেন তিনি।

আগের সংবাদরোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের মানুষেরা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে : কাদের
পরবর্তি সংবাদদক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে চালু হচ্ছে ই-পাসপোর্ট