
হামমাদ রাগিব
মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং পূর্ববাংলার রাজনীতিবিদ যোগেন মণ্ডল—বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালের উপমহাদেশীয় ইতিহাসে এই তিন নেতার চিন্তা বেশ গুরুত্বের দাবি রাখে। উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের প্রশ্নে এই তিন নেতা পরস্পর-বিরোধী তিন ধরনের মত ও চিন্তা লালন করতেন।
মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি ছিলেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে, তিনি চাইতেন ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারত অখণ্ড থাকুক, হিন্দু-মুসলিম ও অন্যান্য ধর্ম্বাবলম্বীরা পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে একই পতাকার নিচে সমান স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে বসবাস করুক। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর চিন্তা ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে মুসলমানদের পৃথক ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা, যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে এবং তাদের যথাযথ অধিকার ভোগ করবে। তাঁর পক্ষে মাওলানা আশরাফ আলি থানভি এবং থানভি সিলসিলার ওলামায়ে কেরামও ছিলেন। এ দিকে পূর্ববাংলার রাজনীতিবিদ যোগেন মণ্ডল ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাকে অখণ্ড রেখে বাঙালিদের অধিকার রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
মাদানি ও জিন্নাহর পরস্পর-বিরোধী মুসলিম চিন্তা
শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি কেন অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন আর কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ও থানভি সিলসিলার আলেমগণ কেন মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমির প্রয়োজন বোধ করেছিলেন, এ বিষয়ে কথা হয় তরুণ বিশ্লেষক তুহিন খানের সঙ্গে।
মাদানি ও জিন্নাহর চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তুহিন খান বলেন, ভারতবর্ষে খেলাফত আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই এটা ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। কারণ, খেলাফত আন্দোলনের লক্ষ্য ভিন্ন হলেও, অর্থাৎ এ আন্দোলন তুরস্কের খেলাফত অপসারণ-পায়তারার বিরুদ্ধে হলেও, খেলাফত অপসারণ যেহেতু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যোগসাজশেই হয়েছিল, তাই ভারতে খেলাফতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানে ব্রিটিশ ভারতের উপনিবেশের বিরুদ্ধে যাওয়া। ফলে খেলাফত আন্দোলনকে ভারতের মুসলিমদের প্রথম জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে ধরা হয়। অবশ্যি কংগ্রেস এর আগ থেকেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল, কিন্তু কংগ্রেসের সাথে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল খুব কম। খেলাফত আন্দোলন থেকেই মূলত মুসলমানেরা ব্যাপকভাবে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেয়। খেলাফত আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের মাহাত্মা গান্ধী এ আন্দোলনকে সর্বাত্মক সমর্থন করেন। পাশাপাশি মুসলিম নেতৃবৃন্দও গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনসহ কংগ্রেসের সবধরনের ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সমর্থন জানান।
এই সময়টায় দেওবন্দের শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান এবং হোসাইন আহমদ মাদানি মাল্টার দ্বীপে বন্দী ছিলেন। সেখান থেকে তাঁরা মুক্তি পেয়ে আসার পর খেলাফত আন্দোলন ও কংগ্রেস নেতারা—সকলে মিলে তাঁদেরকে স্বাগত জানান ও সংবর্ধিত করেন। এর মধ্য দিয়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতৃবৃন্দসহ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও কংগ্রেস এক প্লাটফর্মে চলে আসে। সময়ের প্রেক্ষিতে তারা সিদ্ধান্ত নেন একসাথে মিলেমিশে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এখান থেকেই মূলত ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে আসার সূচনা মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানির। তারপর থেকেই তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে মিশে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
এদিকে দেওবন্দি ঘরানার সমকালীন অন্য মনীষী মাওলানা আশরাফ আলি থানভি এবং তাঁর অনুসারী আলেমগণ মনে করতেন, হিন্দুদের সঙ্গে এভাবে মিলেমিশে আন্দোলন করা আখেরে কল্যাণ বয়ে আনবে না৷ অবশ্য তখনও তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন নাই।
তো, মূলত হোসাইন আহমদ মাদানির যে চিন্তাটা ছিল, যেটা তিনি বিভিন্ন জায়গায় লিখেছেনও, সেটা হলো, তিনি মনে করতেন, মুসলিম মিল্লাহ বা মুসলিম উম্মাহ যেটা, সেটা ধর্মের ভিত্তিতে হবে, অর্থাৎ পুরা বিশ্বের মুসলিম এক। এটা একটা দিকমাত্র; একমাত্র বাস্তবতা না। বাস্তবতা আরও আছে। সেটা হলো, পুরা বিশ্বের মুসলিম এক হলেও প্রতিটা দেশের মুসলিম আবার আলাদা আলাদা জাতি-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলে কওম। আরবে তখন এই ন্যাশনালিজমের চর্চা হচ্ছিল, প্যান অ্যারাবিজম। তারা ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাকে কওম শব্দে ব্যাখ্যা করত৷ হোসাইন আহমদ মাদানি এই ধরনের জাতীয়তাবাদের চিন্তা লালন করতেন।
এদিকে কংগ্রেসও ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু কংগ্রেস সেকুলারিজমের কথা বললেও মূলত তাদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটার ভেতরেই একধরনের হিন্দুত্ববাদের উপাদান ছিল। ফলে থানভি সিলসিলার আলেম-উলামাসহ মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এই ভয় করেছেন যে, কংগ্রেসের হাতে যদি পুরা ভারতের নেতৃত্ব বা ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে ক্রমান্বয়ে মুসলমানরা ভারতে নানান ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবেন।
কিন্তু হোসাইন আহমত মাদানি ও তাঁর অনুসারীরা ব্যাপারটাকে এইভাবে দেখতেন না, তাঁরা দেখতেন এইভাবে যে, ভারত মোঘলদের শাসনাধীনে ছিল, বর্তমান বিজেপি যে অখণ্ড ভারতের কথা চিন্তা করে, মাদানি কিন্তু এই অখণ্ড ভারতের কথা চিন্তা করতেন না, তিনি মোঘল আমলের অখণ্ড ভারতের কথা চিন্তা করতেন, যেটা মুসলমানদের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ছিল। তাই এই দৃষ্টিকোণ থেকে মাদানি ভেবেছেন, ভারত থেকে যদি পাকিস্তান নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তাহলে ভারতের অবশিষ্ট বিশাল অংশ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যাবে, এবং এই বিশাল অংশে বসবাসকারী মুসলমানরা এখানে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
পক্ষান্তরে জিন্নাহ বা থানভি সিলসিলার আলেমরা চিন্তা করতেন যে, ভারতকে অখণ্ড রাখা যেত, যদি এর নেতৃত্ব আমাদের হাতে থাকত, কিন্তু নেতৃত্ব যেহেতু কংগ্রেসের হাতে, এবং কংগ্রেসের ন্যাশনালিটির যে আইডিয়া, সেটার ভেতরে যেহেতু একধরনের সাম্প্রদায়িকতার বীজ আছে, এটা আখেরে মুসলমানদের জন্য খারাপ হবে। এটা মনে করে জিন্নাহ হোসাইন আহমদ মাদানির বিরোধিতা করতেন।
কিন্তু হোসাইন আহমদ মাদানি মনে করতেন, পুরা ভারতের অধিবাসী আমরা এক কওম। আর এই ধারণা তিনি ব্রিটিশ পূর্ব ভারতের মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে পোষণ করেছিলেন। কিন্তু এরপরে যে ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশরা হিন্দুদের মাধ্যমে নতুন এক জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিল, যেখানে মুসলমানদের ভিনদেশী শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে, এবং ভারতকে উপস্থাপন করা হয়েছে মুসলিম শাসনের আগেকার আর্যদের ভারত হিসেবে। ফলে গান্ধীর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আর মাদানির ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল প্রচুর, কিন্তু দুই জনই যেহেতু মোটাদাগে অখণ্ড ভারত চাইতেন, চিন্তার মৌলিক এই মিলের কারণে আন্দোলনের জায়গা থেকে দুজন এক হয়ে গিয়েছিলেন।
আর মুসলিমলীগ ও মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ যেহেতু গান্ধীর জাতীয়তাবাদকে সমস্যাপূর্ণ এবং মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক মনে করতেন, তাই তারা মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমি চেয়েছেন।
যোগেন মণ্ডলের চিন্তা
পূর্ব বাংলার রাজনীতিবিদ যোগেন মণ্ডল মাহাত্মা গান্ধী, মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং হোসাইন আহমদ মাদানির চিন্তা ও দাবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থানে ছিলেন। তিনি মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে ভেবেছেন এবং বাঙালিদের ভূখণ্ড অখণ্ড রাখার পক্ষে ছিলেন। তাঁর চিন্তা ও চাওয়া বিষয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে আলাপ হয় বিশিষ্ট লেখক গবেষক ও ইতিহাস বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের সঙ্গে।
তিনি বলেন, যোগেন মণ্ডল প্রথমত বাংলাভাগের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর এই বিরোধিতা ছিল আবেগের জায়গা থেকে নয়— গভীর সামাজিক বাস্তবতা থেকে।বাংলা ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলমানদের পূর্ববাংলায় নিয়ে আসা এবং পূর্ববাংলা থেকে হিন্দুদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার যে রাজনীতি অনানুষ্ঠানিকভাবে আমরা দেখেছি গত প্রায় ৭০ বছর যাবত, তা যে কোন শান্তি ও সমাধান নয়—এনআরসি উত্তেজনা আবার সেটা জানিয়ে দিল আমাদের। এই এনআরসির আগে ইতোমধ্যে ৪৭-এর ঐ কথিত সমাধান লাখ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে হত্যাও করেছে।
দ্বিতীয়ত, যোগেন মণ্ডল এও বলতেন যে, বাংলা এভাবে ভাগ হলে তা দ্রুত আবার ব্রাহ্মণ্যবাদের অধীনে পড়বে। কার্যত তাই হয়েছে। পশ্চিমাংশ সরাসরি কেবল যে ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে পড়েছে তাই নয়—এখন সেটা উত্তর ভারতীয় প্রভাবিত আরএসএস-এর কব্জায় যাচ্ছে।আর ‘পূর্ববাংলা’ থেকে সৃষ্ট বাংলাদেশও স্বাধীনতার পর একধরনের প্রতীকী ব্রাহ্মণ্যবাদ তথা চরম লুণ্ঠনপ্রিয় এক গোষ্ঠীতন্ত্রের হাতে পড়েছে।
ফলে কার্যত ১৯৪৭-এর‘স্বাধীনতা’ মুক্তিদায়ী হওয়া তো দূরের কথা—বাংলার দুই অংশকে বিপর্যস্ত করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এখানের গরীব তফসিলী, দলিত ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর বর্ণবাদী ও পুঁজিবাদী এক শেকল চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের ক্রমাগত রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে চলেছে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, যোগেন মণ্ডল ১৯৪৭-এ চাইছিলেন মুসলমান চাষী সমাজের সঙ্গে তফসিলী-দলিত সমাজের ঐক্য। এরাই ছিল তখন শ্রেণীগতভাবে বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্তত পূর্ববাংলায় তারা ছিল একচেটিয়া।
শেষ কথা
উপরের পুরো আলোচনা থেকে আমরা এটা বলতে পারি, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানির চিন্তা ছিল আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে, মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর চিন্তা ছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ওপর এবং যোগেন মণ্ডলের চিন্তার ভিত্তি ছিল ভাষিক জাতীয়তাবাদ। তিন চিন্তকই জাতীয়তাবাদের ওপর জোর দিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং যোগেন মণ্ডলের চিন্তা আংশিকভাবে সফল হলেও ভারতের ভেতরে-বাইরে হিন্দুত্ববাদের যে আগ্রাসন, এর সমাধান এখনও সুদূর পরাহত। তবে এই তিন চিন্তকের চিন্তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন করে ভাববার অবারিত সুযোগ এখনও বিদ্যমান।
