
মুসান্না মেহবুব
রাজধানীর মুহাম্মদপুরে তাজমহল রোড মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারের লাগোয়া একটি টিনশেড ঘর। স্থানীয় জামিআ বাইতুল আমান মিনার মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সের প্রায় ছয় শো ছাত্রের রান্না-বান্না করা হতো এই ঘরে।
গতকাল রোববার দুপুরে রান্না-বান্নার কাজ সবে শেষ হয়েছে। ছয় শো শিক্ষার্থী কিছুক্ষণের মধ্যে যার যার খাবার নিয়ে যাবে এখান থেকে, এমন সময় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি দল এসে টিনশেড ঘরটি গুঁড়িয়ে দিতে চায়। মাদরাসা-শিক্ষার্থী ও এলাকার স্থানীয় লোকজন এতে বাধা দিতে গেলে সিটি কর্পোরশনের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে মারত্মকভাবে আহত হন মাদরাসার মেশকাত জামাতের ছাত্র মাহমুদুল হাসান।
তারপর মাদরাসার ছাত্র ও এলাকাবাসীর বাধা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক গুঁড়িয়ে ফেলা হয় রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত টিনশেড ঘরটি। এমনকি মাদরাসার ছয় শো শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুতকৃত দুপুরের খাবারগুলো সরানোরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে খাবারের জন্য ভোগান্তিতে পড়তে হয় ছাত্রদেরকে।
কেন ভাঙা হলো টিনশেড ঘরটি?
উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাজিদ আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর মাঠ ও পার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তাজমহল রোড মাঠেরও সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে নব্বই শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, মাঠের সৌন্দর্য বর্ধন ও সংস্কার কাজের জন্য টিনশেড ঘরটির উচ্ছেদ জরুরি। আমরা ছয় মাস আগে থেকেই মাদরাসা কমিটির লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আলাদা জায়গায় রান্নাঘর তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছ। কিন্তু তারা মানেননি। এজন্য আজ উচ্ছেদ করতে হয়েছে।
উচ্ছেদের আগে কোনো নোটিশ পায়নি মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ
কিন্তু মাদরাসা পরিচালনা কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি ওবায়দুল ইসলাম এবং ঢাকা উত্তর সিটির ২৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের নেতা আলমগীর হোসেন জানান, উচ্ছেদ অভিযানের জন্য কোনো ধরনের নোটিশ বা সতর্কবার্তা মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ পায়নি।
তাঁরা ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, উচ্ছেদের পূর্বে কোনো ধরনের নোটিশ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। উচ্ছেদের কথা আমাদেরকে যদি আগে জানানো হতো, তাহলে ৬ শো মাদরাসা-ছাত্রের দুপুরের খাবার আমরা ওভাবে নষ্ট হতে দিতাম না। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা অবশ্যই করতাম।
মাদরাসা পরিচালনা কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গত বুধবার দিনও সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন লোকজন এসে জায়গাটি দেখে গেছেন। তারা লাল দাগ দিয়ে গেছেন সংস্কার কাজের জন্য, এ দাগের বাইরে ছিল রান্নাঘরটি। এ সময়ও তারা বলে গেছেন, সংস্কারের জন্য রান্নাঘর ভাঙা হবে না। কিন্তু গতকাল হঠাৎ করে কেন এবং কী উদ্দেশ্যে ছয় শো মাদরাসা-ছাত্রের রান্নাঘর এভাবে ভেঙে দেওয়া হলো, আমরা বুঝতে পারছি না।
জায়গাটির মালিক সিটি কর্পোরেশন নয়
এদিকে মসজিদ ও মাদরাসা কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন জানান, ওই মাঠের মালিক সিটি করপোরেশন নয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা এত বেকুব নই যে সিটি করপোরেশনের মাঠ দখল করে সেখানে মাদ্রাসা বানাব। এটা গণপূর্তের জায়গা, আমরা এটা ১৯৭২ সাল থেকে ব্যবহার করছি। এইটা কমিশনার রতনকে, মেয়র আতিককে বলা হয়েছে। আতিক আমাকে জানিয়েছিল এটা ভাঙা হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও তারা ভুল বুঝিয়েছে, তারা নাকি রাস্তা উচ্ছেদ করতে এসেছে।’
সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘অন্যায়ভাবে মাদ্রাসার ছেলেদের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। খাওয়ার ঘর ভাইঙ্গা দেওয়া কি উচিত হয়েছে? আপনি তাদের প্রশ্ন করেন, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের জায়গায় তারা মাঠ বানাতে আসে কীভাবে। আর ওইটা তো মাঠ না, এটা আমাদের ঈদগাহ ছিল, স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করেন। তারা যদি ঠিক হত তাহলে স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে বেরিয়ে আসার পর তারা পালিয়ে গেল কেন?’
স্থানীয় ২৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, কেউ কেউ বলছেন আওয়ামী লীগের লোকজন ভাঙচুরে অংশগ্রহণ করেছে, এটা সম্পূর্ণ অসত্য। সিটি কর্পোরেশনের লোকজন এবং বহিরাগত কিছু বখাটে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে এসে হামলা করেছে মাদরাসার ওপর। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কেউ এই ভাঙচুরে অংশ নেয়নি। বরং স্থানীয় মানুষ দলমত নির্বিশেষে সকলেই মাদরাসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কমিশনার সিটি কর্পোরশনের লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে পরিকল্পিতভাবেই আক্রমণ চালিয়েছিল মাদরাসারও ওপর।
রান্নাঘর তৈরির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা আছে মাদরাসার?
রান্নাঘরের জন্য বিকল্প কোনো জায়গার কি ব্যবস্থা নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে মাদরাসা কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি ওবায়দুল ইসলাম জানান, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া দীর্ঘ ৪৬ বছর যাবত এ টিনশেড ঘরটি মাদরাসার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমরা সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদনও জানিয়েছি, জায়গাটা যেন মাদরাসার জন্য স্থায়ীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া চলমান থাকতেই ক্ষমতা ও পাওয়ার দেখাতে গিয়ে ঘরটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৬ শো শিক্ষার্থী, যাদের সিংহভাগই গরিব এতিম অসহায়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে আবাসিকভাবে এ মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। তাদের খাবার-দাবার তৈরির ঘরটি হঠাৎ করে এভাবে গুড়িয়ে দেওয়ায় গতকাল থেকে খুব কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তারা। এমনও ব্যবস্থা নেই যে, বিকল্প কোথাও তাদের জন্য রান্নাঘর তৈরি করে দেওয়া যাবে। তাই আমাদের দাবি, অবিলম্বে যেন রান্নাঘরটি যথাস্থানে আবারও তৈরি করে দেওয়া হয়।
আহত মাদরাসাছাত্রের জখম গুরুতর
এদিকে গতকাল সিটি কর্পোরেশনের লোকজনদের সংঘর্ষে আহত মাদরাসাছাত্রটির অবস্থা খুব বেশি ভালো না জানিয়ে ওবায়দুল ইসলাম জানান, গতকাল থেকেই ছেলেটি ব্যথায় কাতরাচ্ছে। মাথায় প্রচণ্ড চোট লেগেছে।
এদিকে এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন মুহাম্মদপুরের স্থানীয় অন্যান্য মাদরাসাও। তাৎক্ষণিকভাবে মুহাম্মদপুর ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়ার জরুরী বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে এ বিষয়ে। উক্ত বৈঠকে বিষয়টি তদন্তের জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তাঁরা হলেন জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুল হক, জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া লালমাটিয়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা ফারুক আমাদ, জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল ফালাহ মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা জালাল উদ্দিন, জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা মোঃ ফয়সাল, আশরাফুল মাদারিস মাদরাসার মুহতামিম, মাওলানা ইসমাইল, বাইতুল ফালা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মোহাম্মদ তালহা, ওয়াহিদিয়া মাদরাসার মুহতামিম, মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের।
বৈঠক শেষে উক্ত কমিটি তাৎক্ষণিক মিনার মসজিদ মাদরাসা পরিদর্শন করেন এবং সিটি কর্পোরেশনের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
তদন্ত কমিটির সদস্য মাওলানা মাহফুজুল হক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘বৈঠক শেষে আমরা মিনার মসজিদ মাদরাসা পরিদর্শন করেছি এবং মাদরাসার দুএকজন দায়িত্বশীলের সঙ্গে আলাপ করেছি। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জেনে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কী করা যায়।’
