মুফতি আমীমুল ইহসান : আমাদের এক আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ

মুনশী নাঈম:

১৯৭৪ সালের এই দিনে ইন্তেকাল করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের প্রথম খতীব মুফতি সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী রহ.। তিনি ছিলেন একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও মুফতি এবং বহু উচ্চ মানসম্পন্ন ইসলামী গ্রন্থাবলীর রচয়িতা ও সংকলক। ছিলেন আমাদের ইতিহাসের এক আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ। যারা ইসলামের খেদমত করে নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি তাদের মাঝে অন্যতম।

জন্ম

আমীমুল ইহসান ১৯১১ সালের ২৪ জানুয়ারী (হিজরী: ২২ মুহাররম ১৩২৯) বিহার প্রদেশের মুঙ্গের জেলার অন্তর্গত পাঁচনা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হাকিম আবদুল মান্নান এবং মা সৈয়দা সাজেদা। তিনি চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। তার বংশ-তালিকা ফাতেমা রা. এর মাধ্যমে রাসুলে করিম সা. পর্যন্ত পৌঁছেছে বিধায় তার পূর্ব-পুরুষগণ নামের পূর্বে ‘সাইয়্যেদ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।

জন্মের পর তার নাম রাখা হয় ‘মুহাম্মাদ’ এবং লকব আমীমুল ইহসান। কিন্তু নাম ছাপিয়ে তিনি লকবেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠেন। তার দাদা সাইয়্যেদ নূরুল হাফেয আল-কাদেরিও একজন কামেল সাধক ছিলেন। তিনি মাওলানা মোহাম্মদ আলী আল-কাদেরী আল মোজাদ্দেদী আল মুংগেরীর একজন খলীফা ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

আমীমুল ইহসান রহ. তার পিতা ও চাচার নিকট থেকে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি মাত্র তিন মাস সময়ের মধ্যে তার চাচা সাইয়্যেদ আব্দুদ দাইয়্যানের নিকট হতে পূর্ণ ত্রিশ পারা কুরআন খতম করেন; এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। সাইয়্যেদ আবদুদ দাইয়ান তাকে ফার্সি ভাষায় বিশেষ জ্ঞান দান করেন।

এরপর তার পিতা তাকে কলকাতায় সাইয়্যেদ আবু মুহাম্মাদ বারকত আলী শাহের কাছে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর কাছ থেকে আরবী ব্যাকরণের (মীজান মুন্শায়েব) প্রাথমিক জ্ঞান রপ্ত করেন এবং পাশাপাশি উচ্চতর ফার্সী সাহিত্য ও তাজবীদের প্রাথমিক জ্ঞান গ্রহণ করেন।

১৯২৬ সালে পনের বছর বয়সে মুফতী সাহেব কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে আলিম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ফাযিল ও ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন এবং ‘মুমতাজুল মুহাদ্দিসিন’ উপাধি প্রাপ্ত হন তিনি আলিম পরীক্ষায়ও হাদীস বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। ১৯৩৪ সালে তিনি তার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মাওলানা মুফতী মুশতাক আহমেদ কানপুরী রহ. সাহেব এর নিকট থেকে ‘মুফতি’ সনদ লাভ করেন। তখন থেকে তিনি ‘মুফতি’ খেতাবে আখ্যায়িত হন।

কর্মজীবন

১৯২৭ সালে পিতার ইন্তেকালের পর ছোট ভাই বোনের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব, পিতার চিকিৎসালয় ও পারিবারিক প্রেস পরিচালনা, গৃহ সংলগ্ন (জালুয়াটুলীস্থ) মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত হয়। ১৯৩৪ সালে তাঁকে কলকাতার বৃহত্তর জামে মসজিদ ‘নাখোদা মসজিদ’-এর সহকারী ইমাম ও মাদরাসার প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োাগ দেয়া হয়। ১৯৩৫ সালে ‘নাখোদা মসজিদ’-এর মাদরাসার দারুল ইফতার প্রধান মুফতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে প্রায় লক্ষাধিক ফাতওয়া প্রদান করেন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি নাখোদা মসজিদের ও দারুল ইফতার দায়িত্ব প্রশংসনীয়ভাবে পালন করেন। এইজন্য ১৯৩৫ সালে কলকাতা সরকার তাকে একটি বিশেষ সীলমোহর প্রদান করে যাতে লেখা ছিল গ্রান্ড মুফতী অফ কলকাতা। তখন থেকে তিনি মুফতী-এ-আযম উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার মুফতী আমীমুল ইহসানকে মধ্য কলকাতার কাজী পদে নিয়োাগ দেন। ১৯৪৩ সালে মাদরাসা-ই আলিয়ায় অধ্যাপনার কাজে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এইসব কাজ যথারীতি পালন করেন। ১৯৪০ সালে তিনি আঞ্জুমানে কুররায়ে বাংলার (বাংলার ক্বারী সমিতি) সভাপতি নিযুক্ত হন।

১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সাল থেকে ভারত বিভাগ (১৯৪৭) পর্যন্ত টাইটেল কামিল ক্লাসে হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ এবং ফাযিল শ্রেণীতে উর্দু-ফার্সি শিক্ষা দিতেন। ১৯৪৭ সালে আলিয়া মাদরাসা ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সরকার তাকে ধর্মীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত করেন। ১৯৫৫ সালে আলিয়া মাদরাসার হেড মাওলানা, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী অবসর গ্রহণের পর মুফতী আমীমুল ইহসান অস্থায়ীভাবে সেই পদে নিয়োগ পান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ীভাবে সেই পদে নিযুক্ত ছিলেন। আলিয়া মাদরাসায় কর্মরত অধ্যাপক হিসাবে তিনি ব্যাখ্যাসহ বুখারি শরিফ পড়াতেন। ১৯৬৯ সালের ১ অক্টোবর উক্ত পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৫৫ সালে আলিয়া মাদরাসায় হেড মাওলানার পদে উন্নীত হবার পর তৎকালীন ঢাকার প্রধান ঈদগাহ পুরানা পল্টন ময়দানে ঈদের জামাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কয়েক বছর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৪ সালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন কমিটির চেয়ারম্যান ইয়াহিয় বাওয়ানীর অনুরোধে এবং মসজিদ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে মসজিদের খতীব এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এই দায়িত্ব কৃতিত্ব সাথে পালন করেন। তিনি প্রতি শুক্রবার সেখানে জুমার নামাজ পড়াতেন এবং আরবিতে স্বরচিত খুৎবা পড়তেন।

রচনাবলী

অধ্যাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থাবলি রচনা করতেন মুফতি আমীমুল ইহসান রহ.। তাফসির, উসুলে তাফসির, হাদিস, উসুলে হাদিস, ইলমে ফিকহ, উসুলে ফিকহ, সিরাত, তারিখ, ইলমে নাহু ও সরফ, ওয়াজ মাহফিলসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর দুইশর অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।

ইলমে তফসীর এবং উসূলে তফসীর : ইতহাফুল আশরাফ বি হাশিয়াতিল কাশশাফ, আল ইহসানুস সারী বিত তাওযিহ ই তাফসিরই সহীহিল বুখারী, আত তানবীর ফি উসূলিত তাফসির, আত- তাবশীর ফি শরহিত তানবীর ফি উসূলিত তাফসির।

ইলমে হাদীস এবং উসূলে হাদীস : আল ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার, মানাহিজুস সুআদা, উমদাতুল মাযানী বি তাখরিজে আহাদীস মাকাতিবুল ইমামুর রাব্বানী, আল আরবাঈন ফিস্ সালাত, আল-আরবাঈন ফিল মাওয়াকিত, আল আরবাঈন ফিস্ সালাতি আলান নবী সা, জামে জাওয়ামেউল কালাম, ফিহিরস্তত কানযুল উম্মাল, মুকাদ্দামায়ে সুনানে আবু দাউদ, মুকাদ্দামায়ে মারাসিলে আবু দাউদ, লাইল ওয়ান নাহার, মীযানুল আখবার, মিয়ারুল আসার, হাশিয়ায়ুস সাদী.

ইলমে ফিকহ এবং উসূলে ফিকহ : তরীকায়ে হজ্জ, ফাতাওয়ায়ে বারকাতীয়া, আল কুরবাহ ফিল কুরা, হাদিয়াতুল মুসাল্লীন, লুববুল উসূল, মালাবুদ্দা লিল ফকীহ, আত- তারীফাতুল ফিকহিয়্যাহ, উসূলুল কারখী, উসূলুল মাসায়েলীল খিলাফিয়্যাহ, কাওয়ায়েদুল ফিকহ, আদাবুল মুফতী, তুহফাতুল বারকাতী বি-শরহে আদাবুল মুফতী

সীরাত : আওজায়ুস সিয়ার, আনফাউস সিয়ার, সীরাতে হাবিবে ইলাহ, রেসালা-হায়াতে আবদুস সালাম

ইলমে তাসাওউফ : রেসালায়ে তরীকাত, আততাশাররুফ লি আদাবিত তাসাওউফ

তারীখ (ইতিহাস) : তারিখে ইলমে হাদীস, তারীখে ইলমে ফেকাহ, আল হাভী ফি যিকরিত তাহাভী, তারিফুল ফুনুন ওয়া হালাতে মুসান্নেফিন

উর্দু সাহিত্য : আদবে উর্দু,, শরহে শিকওয়াহ ওয়া জওয়াবে শিকওয়াহ

এছাড়াও আরও অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।

শেষকথা

হযরত আল্লামা মুফতী সাহেব রহ. জীবনে তিনবার বায়তুল্লাহর হজ পালন করেন। সর্বপ্রথম এবং ফরয হজ্জ আদায় করেন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে, ১৯৬৮ সালে তিনি দ্বিতীয়বার সস্ত্রীক এবং ১৯৭১ সালে তৃতীয় হজ্জ পালন করেন।

আলো ছড়িয়ে এক আলোকিত জীবন কাটিয়ে আমীমুল ইহসান রহ. ১৯৭৪ সালের ২৭ অক্টোবর (হিজরী: ১০ শাওয়াল ১৩৯৫) মৃত্যুবরণ করেন। জান্নাতে আল্লাহ তাঁকে উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।

আগের সংবাদকাশ্মিরের শ্রীনগরে হামলা, আহত ভারতীয় ৬ পুলিশ
পরবর্তি সংবাদনোবেলজয়ী ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, নিহত ৬৭