রাকিবুল হাসান :
১৩ জানুয়ারি, ২০২০, সোমবার দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে দিনযাপন শেষে ইন্তেকাল করেছেন জার্মান মুসলিম কূটনীতিক, লেখক ও চিন্তাবিদ মুরাদ উইলফ্রিড হফম্যান। যে সমস্ত পশ্চিমা নওমুসলিম মনীষা ও মননশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। বিস্তৃত এক জীবনে তার মেধার চর্চা, ইসলামে ফেরা, ইসলামের পক্ষে কথা বলা—এই লেখায় তা কিঞ্চিৎ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করব।
জন্ম, শিক্ষা ও কর্ম
মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান ১৯৩১ সালের ৬ জুলাই জার্মানের অ্যাশচাফেনবার্গের এক ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের রণক্ষেত্রে নাজি জার্মানি ও পুঁজিবাদী ইউরোপের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে তিনি বেড়ে উঠেন।
লেখাপড়া করেন নিউইয়র্ক, মিউনিখ এবং হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া তার পিএইচডির অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল Contemt of Court by Public under American and German Law (1957)। এরপর ১৯৬০ সালে হার্ভাড থেকে অর্জন করেন LLM ডিগ্রি।
পড়ালেখা শেষ করার পর ১৯৬১ সালেই জার্মানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু করেন। শুরুতেই তিনি আলজেরিয়ার পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত বিভাগে নিয়োগ পান। এরপর ১৯৮৩-৮৭ সাল পর্যন্ত ব্রাসেলস ন্যাটোর তথ্য পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৭-১৯৯০ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ায় এবং ১৯৯০-৯৪ সাল পর্যন্ত মরক্কোতে জার্মানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হফম্যান জার্মানের সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ মুসলিমের সদস্য এবং উপদেষ্টাও ছিলেন।
ইসলাম গ্রহণ
১৯৮০ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর ইসলাম গ্রহণ করেন মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান। যেহেতু তিনি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, তাই তার ইসলাম গ্রহণ ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে জার্মান সমাজে। কিন্তু তিনি আবেগের বশে ইসলাম গ্রহণ করেননি। বরং তার বইগুলো দেখে স্পষ্টই বুঝা যায়, তিনি পড়াশুনা করে, বিভিন্ন ধর্মের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে, দীর্ঘ গবেষণা ও অত্যন্ত সতর্কতার সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
মৌলিক তিনটি কারণ কিংবা অভিজ্ঞতা তাকে ইসলামের দিকে প্রবল গতিতে টেনে নিয়ে গেছে।
১. মানব প্রকৃতি
১৯৫২-৬২ সাল পর্যন্ত চলা আলজেরিয়ান মুসলিমদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ইসলামের প্রতি তার একটা ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করে। এই সময় আলজেরিয়ার জনগণ ফরাসী উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। স্বাধীনতাকামী এই মুসলিমদের হিংস্রভাবে হত্যা করছে ফরাসীরা। এই কঠিন সময়েও আলজেরিয়ান মুসলিমরা মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেনি।
হফম্যান বলেন, ‘ফরাসীরা চারদিকে যখন স্বাধীনতাকামীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, এমন সময় আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠে। মধ্যরাতে আমি এম্বুলেন্স ডাকি। কিন্তু ফরাসীদের ভয়ে তখন কেউ ঘর থেকে পর্যন্ত বের হচ্ছে না। এম্বুলেন্স এলো সকাল ছয়টায়। আমার স্ত্রী তখন মুমূর্ষু প্রায়। জ্ঞান হারানোর পূর্বে সে আমাকে বললো, আমার O+ রক্ত। আলজেরিয়ান চালক শুনতে পেয়ে বললো, ‘চিন্তা করবেন না। আমার রক্ত O+। আমি রক্ত দেব।’ চালকের কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। যুদ্ধের কারণে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নেই, কিন্তু কী অবলিলায় ভিনধর্মী এক মানুষের সেবায় নিজেকে এগিয়ে দিলো!
আলজেরিয়ানদের ধৈর্য, সাহস, শৃঙ্খলা, মানবিক মূল্যবোধ দেখে ইসলাম নিয়ে ঘাঁটতে শুরু করেন হফম্যান। কী আছে এই ধর্মে, যা এমন কঠিন সময়েও এমন দৃঢ় মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়?
২. নান্দনিক শিল্প-সত্তা
আর্ট ও সৌন্দর্যের দারুণ অনুরাগী ছিলেন হফম্যান। এমনকি সৌন্দর্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ব্যাভারিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়ে যান। এরপর ঝুঁকে পড়েন ব্যালে নাচের দিকে। তার একাগ্রতা কালক্রমে তাকে ব্যালে বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং প্রশিক্ষকও বানিয়ে দেয়। ১৯৭১-৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ব্যালে নৃত্যের নান্দনিক খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখিও করেন।
এমন করেই একসময় তিনি খোঁজ পেয়ে যান মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের। তিনি প্রথম যখন গ্রানাডার আল হামরা প্রাসাদ এবং কর্ডোভার গ্রান্ড মসজিদ দেখেন, তখনই তার মনে হয় এগুলো নিছক স্থাপত্যকর্ম নয় বরং এক মহান সংস্কৃতির নিগূঢ় রসে ভেজা মহান শিল্পকর্ম। এরপর থেকেই তিনি অন্যান্য শিল্পে যেমন ব্যালেতে আগ্রহ হারাতে শুরু করেন। তার চিন্তা ও মন দখল করে নেয় মুসলিম আর্ট। হফম্যানের ভাষায়, ‘মুসলিম আর্ট দেখার পর অন্যান্য আর্টে আমি মেজাজ হারাই। নতুন সন্ধান পাওয়া আর্টের আবেদন আমাকে বন্দী করে ফেলে। কেমন যেন এই আর্ট, আর্টের আড়ালে লুকিয়ে আছে ইসলামের এক নীরব ও বৈশ্বিক উপস্থিতি।’
মুসলিম আর্টের সংস্পর্শে তাড়িত তাড়িত হতে হতে হফম্যান আরও এগিয়ে আসেন ইসলামের দিকে।
৩. দার্শনিক ও বৌদ্ধিক পর্যালোচনা
এরপরই মূলত হফম্যান কিছু প্রশ্নের উত্তর খু্ঁজতে শুরু করেন। যে উত্তরগুলো তাকে নিশ্চিত করে আল্লাহর অস্তিত্ব। তিনি খু্ঁজতে শুরু করেন আল্লাহর সাথে মানুষের কী সম্পর্ক? এই প্রশ্ন থেকে তিনি খুঁজে পান নবি এবং ওহির প্রয়োজনীয়তা। এরপর সূরা নাজমের ৩৮ নং আয়াত ‘কেউ কারো পাপ বহন করবে না’ পড়ে হফম্যান চমকে উঠেন। আয়াতটি থেকে তিনি দুটো ধারণা বের করেন; এক. ইসলামে পাপের কোনো উত্তরাধিকার হয় না। এই মর্ম অনুযায়ী তো যিশু খৃস্টের পাপ মোচনের তত্ত্ব বাদ হয়ে যায়। কারণ ইসলামে কারো পাপ তো কেউ নিতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে তৃতীয় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। পাপ করেছে বান্দা, সমাধান হবে আল্লাহর কাছেই। তৃতীয় কেউ এসে এখানে দখল দিতে পারবে না। এই মর্ম অনুযায়ী বাদ হয়ে ধর্মযাজক তত্ত্ব।
এভাবেই খৃস্টধর্মকে তার একেবারে ফাঁকা বুলি মনে হতে থাকে। তিনি এগিয়ে আসেন ইসলামে। কালেমা পড়ে সিক্ত হন ক্ষমার বরকতে।
বুদ্ধিবৃত্তিক রচনাবলী
বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামের যথার্থতা ফুটিয়ে তুলে অনেক বই লিখেছেন মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান। কয়েকটি বইয়ের সারমর্ম তুলে ধরলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মেধাটা চোখে পড়বে আমাদের। পাশাপাশি ইউরোপে ইসলামকে তিনি কিভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা-ও জানা যাবে।
Islam: The Alternative
১৯৯১ সালে হফম্যান যখন মরক্কোয় জার্মান রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত, তখন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা End of History তথা ইতিহাসের ইতি নামে একটি বই লিখেন। সোভিয়েত সাম্রাজ্যের কমিউনিজমের পতনের পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ওকালতি করতে এই বই লেখা হয়। বইয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই অধুনিক উন্নয়নের একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই বইয়ের বিকৃত ধারণার প্রতিবাদে ‘ইসলাম দ্য অল্টারনেটিভ’ বইটি লিখেন হফম্যান। বইয়ের ভূমিকায় হফম্যান লিখেছেন, এ বই ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার একচোখা ও আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যুত্তর।
ফুকুয়ামার বই প্রকাশের পরপরই এ বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরী হয়। তিনি ফুটিয়ে তুলেন কমিউনিজমের পতনে কিছু হবে না। বরং এ পৃথিবীতে শান্তি ও সমতার একমাত্র পথ ইসলাম। বইটি জার্মানের প্রসিদ্ধ একটি লাইব্রেরি থেকে প্রকাশের ঘোষণার দেয়ার পরই বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। জার্মান মিডিয়া হফম্যানকে মৌলবাদী, নারী বিদ্বেষী বলে গাল দেয়। এ সময় জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট করতে বলে সবকিছু। মন্ত্রণালয় বইয়ে আপত্তিকর কিছু খুঁজে না পেয়ে প্রকাশের অনুমতি দেয়।
Journey to Islam : Diary of a Grrman Diplomat (1952-2000)
বইটি মূলত হফম্যানের দীর্ঘ ৫০ বছরের রোজনামচা। বইটির ভূমিকা লিখেছেন মুহাম্মদ আসাদ। হফম্যান বলেছেন, এ বই নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়ার পরিণাম, জার্মান বুদ্ধিজীবীর মনের বিশ্বাসের কথা, মানবিক টানাপোড়েন ও ইসলামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুখদ বর্ণনা। বইয়ে আর্ট, কালচার, দর্শন, স্থাপত্য, ক্যালিগ্রাফি, ধর্মতত্ত্ব, কবিতা, সুফিতত্ত্ব, হজের অভিজ্ঞতা, ইসলামে গণতন্ত্র, নারীর অধিকার, মার্কস, ইবনে খালদুন, মরিস বুকাইলি, গাজালি, ইবনে রুশদ-সহ আরও কত বিচিত্র বিষয় উঠে এসেছে। বইটিতে ইসলামের এক সন্ধানকারী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন তিনি।
Islam 2000
এই বইয়ে হফম্যান একবিংশ শতাব্দীতে মুসলমানরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তাদের ওপর ধেয়ে আসা পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদকে তারা কিভাবে মোকাবেলা করবে এবং এই শতাব্দীতে ইসলামকে কিভাবে যৌক্তিক পটভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা যাবে—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন।
A Journey to Makka
১৯৮০ সালে ইসলাম গ্রহণের পর হফম্যান ১৯৮২ সালে ওমরা পালন করেন। ১৯৯২ সালে আদায় করেন হজ। এই বইয়ে বিধৃত হয়েছে তার হজ সফরে তার অনুভূতি, চিন্তা, বিভিন্ন আমল করতে গিয়ে তার আবেগ-অনুভবের নান্দনিক বয়ান।
বইটিতে হফম্যান বলেছেন, হজের আগে অন্তরিকভাবে হজের প্রস্তুতি নেয়া দরকার। যেমন—কোরআনের হজের আয়াতগুলো পড়া, হজ নিয়ে রাসূলের হাদিসগুলো পড়া, আমলগুলো ভালোভাবে জেনে নেয়া ইত্যাদি।
ইহরামের পোশাক সম্পর্কে বলেন, এই পোশাকে ধনী-দরিদ্র, বোকা-বুদ্ধিমান কারো ক্ষেত্রেই কোনো পার্থক্য নেই। সবাই এক, কারো কাপড়ে কোনো নকশা নেই। ইহরামের পোশাক কেবল সমতার প্রতীক নয়, বরং কেয়ামতের দিনেরও প্রতীক।
কাবায় তাওয়াফ ও নামাজ সম্পর্কে বলেছেন, শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। সবাই তাওয়াফ করছে তো করছেই। আজান হলে সবাই একই দিকে মুখ করে, একই নামাজ, একই পদ্ধতিতে আদায় করে। আত্মসমর্পণের কী শান্তিময় দৃশ্য।
হফম্যান বলেছেন, হজ নতুন কিছু নয়। আগের নবিরাও আদায় করেছেন হজ। এতেই প্রমাণিত হয়, ইসলামে একেকজন নবি কিংবা রাসূল একেক শরিয়ত নিয়ে এলেও তাদের সবার মাঝেই আন্তঃসংযোগ আছে। তাদের মূল শেকড় এক। তাই আজও মুসলিমরা ইবরাহিম আ. ও বিবি হাজেরার স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলোতে আমল পালন করছে। কিন্তু খৃস্টধর্মে তা নেই। তারা ইহুদিদের স্বীকৃতিই দেয় না।
হফম্যান এমনভাবে হজের বিভিন্ন আমল নিয়ে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন।
বিদায় হফম্যান, বিদায়!
পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী এবং নাস্তিক্যবাদপুষ্ট আবহাওয়ায় বড় হয়ে সেই সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান। ইসলামকে আগলে রেখেছিলেন বুকে। ইউরোপে ইসলামকে তুলে ধরেছেন বর্তমান পৃথিবীর সমস্যা সমাধানে সবচে কার্যকর ধর্ম হিসেবে। ১৩ জানুয়ারি থেমে গেছে তার পথচলা, এই পৃথিবীর যাবতীয় স্পন্দন। আল্লাহ তাকে মাগফেরাতের পরম দানে ধন্য করুন। আমিন।
