
মুজিব হাসান :
বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের কবি ছিলেন ফররুখ আহমদ। তাঁর কবিতায় ইসলামি জাগরণের ঢেউ তরঙ্গায়িত করে বাঙালি মুসলমানের মন। বাংলা কবিতায় অসাধারণ কাব্য-কুশলতায় ইসলামের ব্যঞ্জনাকে প্রমূর্ত করে তোলায় তিনি ছিলেন অনন্য। আজ ১৯ অক্টোবর কবির ৪৫তম মৃত্যুদিবস। ১৯৭৪ সালের এই দিনে ৫৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন মুসলিম গণজাগরণের এ মহান কবি।
গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশকে কবিতার ময়দানে ফররুখ আহমদের আবির্ভাব। সময়টা ছিল বাংলা কবিতার যুগসন্ধিক্ষণ। নানান বাঁক-বদলের মধ্য দিয়ে তখন প্রবাহিত হয়েছে বাংলা কবিতার স্রোত। এ সময় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘সাত সাগরের মাঝি’। কবির বয়স তখন ২৬। বইটি কবিকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। সেই সময়কার কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অনেকেই তাঁর কবিতা ও কাব্য-প্রতিভা নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি করেন। এমনকি কলকাতা রেডিওতে তাঁর ওপর আলোচনা সম্প্রচারিত হয়। এ বইয়ে মূলত কবির স্বাধীনতা-প্রীতি ও মানবতাবোধের সুস্পষ্ট বিকাশ ঘটেছে।
চল্লিশের দশকের সেই যুগসন্ধিক্ষণই বাংলা কবিতার আকাশে কবির অবস্থান প্রোজ্জ্বল করেছে। তখন রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসান ঘটেছে, নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। জসীমউদ্দীন ও তিরিশোত্তর যুগের কবিদের তখন প্রবল দাপট চলছে। এমন সময় ফররুখ আহমদ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়ে সকলের সপ্রসংশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর এ বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়েছে কবিতার বিচিত্র রূপরীতি, শিল্প-নৈপুণ্য, রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্পের অভিনব ব্যবহার ও নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণের অসাধারণ সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে। এর ওপরে সেই সময়কার রাজনৈতিক নানান প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি তাঁর কবিতার পটভূমিকে বিস্তৃত ও উর্বর করেছে। উপমহাদেশ জুড়ে তখন ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল বেগে চলছে। সেসময় স্বাধীনতার সপক্ষে গণজাগরণমূলক কবিতা লিখে ফররুখ আহমদ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণে বিশ্বাসী। ইসলামি আদর্শ ও আরব-ইরানের ঐতিহ্য তাঁর কবিতায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠেছে। তিনি এই রেনেসাঁকে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্ততার সাথে ফুটিয়ে তুলেন। এজন্যই তাকে বলা হয় মুসলিম রেনেসাঁর কবি।
যুগচেতনা প্রত্যেক বড় কবির একটি বিশেষ লক্ষণ। যুগচেতনা কবির কবিতাকে জনগণের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলে। যুগচেতনা ও আবেগকে হৃদয়ের সূক্ষ্মতন্ত্রীতে ধারণ করে তিনি তা রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে রং-তুলি, সুর-ছন্দের অভিনব ব্যঞ্জনায় বর্ণাঢ্য ও কাব্যিক মহিমায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর সমকালে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫), যুদ্ধজনিত পঞ্চাশের দশকের লক্ষ লক্ষ নিরন্ন মানুষের করুণ মৃত্যু, ১৯৪০ সালে গৃহীত মুসলিম লীগের ‘লাহোর প্রস্তাবে’র ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত গণভোট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা (১৯৪৭), ভাষা আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৫২), পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকদের শোষণ, দুর্নীতি, বৈষম্য ও আশাহত বঞ্চিত জণগণের নিদারুণ আর্তি, ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ, লক্ষ লক্ষ জানমাল-ইজ্জতের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধীনতা পরবর্তী কালের ব্যাপক দুর্নীতি, অনাচার ও অরাজকতার ফলে সৃষ্ট ১৯৭৪ সনের দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের করুণ মৃত্যু ইত্যাদি মানবিক আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, সাফল্য ও বিপর্যয় ফররুখ আহমদের কবিতায় প্রাণবন্ত রূপ লাভ করেছে। সেই সময়কার প্রতিটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর কবিতায় ঢেলেছে রেনেসাঁর বারুদ। কবি সেই বারুদকে আবেগের মাধুরিমায় ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতায়।
তিনি একাধারে গীতি কবিতা, সনেট, ব্যঙ্গ কবিতা, গান-গজল, শিশুতোষ কাব্য, মহাকাব্য, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গনাট্য ইত্যাদি রচনা করেছেন। গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, বেতার কথিকা, গীতি-নকশা প্রভৃতি সৃষ্টিশীল রচনায় তিনি নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। তবে কবিতা রচনায় তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।
তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা ১৫। ১. সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪)। ২. আজাদ কর পাকিস্তান (১৯৪৬)। ৩. সিরাজম মুনিরা (১৯৫২)। ৪. নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১)। ৫. মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩)। ৬. হাতেম তায়ি (১৯৬৬)। ৭. হে বন্য স্বপ্নেরা (১৯৭৬)। ৮. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮০)। ৯. কাফেলা (১৯৮০)। ১০. হাবেদা মরুর কাহিনি (১৯৮১)। ১১. তসবিরনামা (১৯৮৬)। ১২. দিলরুবা (১৯৯৪)। ১৩. ঐতিহাসিক অনৈতিকহাসিক কাব্য (১৯৯৪)। ১৪. অনুস্বার। ১৫. ধোলাই কাব্য।
মুসলিম রেনেসাঁর এই মহান কবির ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।
