
মাহদি হাসান
মানব সভ্যতায় চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম। যখন থেকে মানবজাতি সভ্যতার সংস্পর্শে আসতে শুরু করেছে, তখন থেকেই তারা রোগ-ব্যাধি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। সৃষ্টির পর মানবজাতি যে সকল বিপদের মুখোমুখি হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রোগ-ব্যাধি অন্যতম। প্রশ্ন উঠতে পারে, সর্বপ্রথম চিকিৎসা সম্পর্কে তারা কীভাবে জানতে পারে? এর উত্তরে বলা যায়, যখন থেকে মানুষ আল্লাহ তায়ালার ইশারায় নির্দেশিত হয়েছে, তখন থেকেই তারা বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসার জ্ঞান লাভ করেছে। যা তাদের ইন্টেলেকচুয়ালিটি তথা বুদ্ধিমত্তা এবং মানবিক ক্রমবিকাশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছিল। এ ধরণের চিকিৎসা প্রিমিটিভ মেডিসিন তথা আদিমযুগীয় চিকিৎসা নামে পরিচিত। যা ছিল মানুষের সভ্যতাগত বিকাশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এজন্যই আমরা ইবনু খালদুনকে বলতে শুনি যে, ‘পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রথম দিকের বেদুইন লোকদের ছিল স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা ব্যবস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজেদের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তারা সেই চিকিৎসার প্রয়োগ ঘটাতো। অতঃপর তারা এই চিকিৎসা বিদ্যাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচলন ঘটিয়েছে। গোত্রের জৈষ্ঠ ব্যক্তি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই চিকিৎসা বিদ্যা গ্রহণ করা হতো। কখনো কখনো এর মাধ্যমে সুস্থতাও লাভ হতো। তবে তখনকার চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রাকৃতিক কোনো বিধান অনুযায়ী ছিল না।’ [মুকাদ্দিমায়ে ইবনে খালদুন: ৬৫১]
ইসলাম আগমনের সময় জাহিলী যুগের আরবদের কাছে এমন ধরণের চিকিৎসা বিদ্যার জ্ঞান ছিল। রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে লোকদেরকে চিকিৎসা গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। উসামা ইবনু শারিক রা.-হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ, আল্লাহ তায়ালা ঔষধবিহীন কোনো ব্যাধি সৃষ্টি করেননি। শুধুমাত্র একটি ব্যাধির কোনো চিকিৎসা নেই। সেটি হচ্ছে বার্ধক্য। (আবু দাউদ) এমনিভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মধু, খেজুর, প্রাকৃতিক ঘাস ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসার কথাও জানা গেছে। তিব্বে নববী থেকে আমরা এগুলো জানতে পারি।
তবে মুসলমানরা শুধু তিব্বে নববী নিয়েই বসে থাকেনি। তিব্বে নববীর উপকার এবং বরকতের উপর বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি তারা খুব দ্রুতই উপলব্ধি করেছিলেন যে, পার্থিব যত বিদ্যা রয়েছে এগুলো নিয়েও গবেষণা এবং অধ্যয়ন করা উচিত। চিকিৎসা বিদ্যা ছিলে এর মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে তারা অন্য জাতির কাছে থেকে জ্ঞান আহরণের প্রতিও নির্ভর করেছে। কারণ, ইসলাম প্রত্যেক উপকারী বস্তু থেকে শিক্ষাগ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করেছে। যেখানেই জ্ঞান পাওয়া যাবে সেখান থেকে আহরণে উদ্ধুদ্ধ করেছে। তাই মুসলিমগণ এ নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়নে মনোযোগী হয়েছিলেন।
সর্বপ্রথম মুসলিম চিকিৎসকগণই পৃথক পৃথক বিষয়ের চিকিৎসার সাথে পরিচিত করেছিলেন। চোখের জন্য আলাদা চিকিৎসক, সার্জন তথা অস্ত্রোপচারবিদ, মহিলা বিশেষজ্ঞ ইত্যাদিকে তারা পৃথক পৃথক বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ইসলামের শুরু থেকেই চিকিৎসা শাস্ত্র বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে এবং ইসলামের সূচনালগ্ন পরবর্তী এক-দুই শতাব্দীর মধ্যেই চিকিৎসাবিদ্যা অতিক্রম করেছে এক স্বর্ণোজ্জল সময়। তখনকার ইসলামি চিকিৎসা বিজ্ঞান পুরো চিকিৎসা বিজ্ঞানকেই অনেক অগ্রগামী এবং উন্নতি করেছে। মুসলিমদেরকে ব্যাকডেটেড এবং অনগ্রসর জাতি হিসেবে আখ্যা দেয়া পশ্চিমারা চিকিৎসা বিদ্যার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান যদি অস্বীকার করে, তবে এটি হবে তাদের অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক।
ইসলামের শুরু থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত চিকিৎসা বিদ্যা বেশ কয়েকটি স্তর অতিক্রম করেছে। এভাবেই মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসা বিদ্যার ক্রমবিকাশ ঘটেছে।
ইসলামপূর্ব যুগে আরবদের চিকিৎসাবিদ্যা :
অন্যায়-অত্যাচার আর পাপাচারের সয়লাবের কারণে সে সময়টাকে আইয়ামে জাহিলিয়াত তথা মূর্খতার যুগ বলা হলেও জাগতিক বিভিন্ন ব্যাপারে তারা মোটেই অজ্ঞাত ছিল না। আশপাশের সকল এলাকা এবং গোত্রের সাথে তাদের ছিল গভীর যোগাযোগ। হাবশার সাথে তাদের ছিল ব্যবসায়িক সম্পর্ক। রোম, পারস্য ইত্যাদি অঞ্চলের সাথেও তাদের যোগাযোগ ছিল। তবে এ সময় তাদের চিকিৎসাবিদ্যা গুটিকয়েক লোকের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। তখনকার গণক এবং জাদুকররাও চিকিৎসা দিত। তখন চিকিৎসা বিদ্যার ছিল সম্মানজনক অবস্থান।
তখনকার সময়ে চিকিৎসার প্রধানতম মাধ্যম ছিল আগুনের মাধ্যমে তাপ দেয়া। কারণ, অনেকের মতো তারাও বিশ্বাস করতো যে, অসুস্থতার কারণ হচ্ছে এভিল স্প্রিট তথা অশুভ আত্মা। তবে আরবরা ক্ষতস্থানের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পচা রক্ত বের করা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। জেনেছিল সংক্রামক এবং অসংক্রামক রোগের ব্যাপারে। এগুলো থেকে বেঁচে থাকার পন্থাও ছিল তাদের জানা। তারা কুষ্ঠরোগীদের জন্য পৃথক থাকার ব্যবস্থা করেছিল। মশা-মাছির বিপদ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিল। তারা জাফরানের পানি দিয়ে ঘরবাড়ি পরিস্কার করত। যাতে বিষাক্ত কীটপতঙ্গের আগমন না ঘটে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে চিকিৎসাবিদ্যা :
কাজি সাইদ বিন আহমাদ আল-আন্দালুসি তার তবাকাতুল উমাম গ্রন্থে বলেছেন, ‘ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবদের সকল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আরবি ভাষা বিদ্যা এবং শরীয়তের বিধিবিধান শিক্ষা করা নিয়ে। খুব কম লোকই তখন চিকিৎসা বিদ্যা জানতেন। সকলের নিকট তারা ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। প্রয়োজনের সময়ে তাদের কাছে লোকেরা তাদের কাছে যেত।’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়েও অনেকে চিকিৎসা সম্পর্কে জানতেন। ইমাম ইবনুল জাওযী সিফাতুস সাফওয়া গ্রন্থে হিশাম ইবনু উরওয়ার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আয়েশা রা.-চিকিৎসা জ্ঞান দেখে তিনি খুবই আশ্চর্য হতেন। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আগত বিভিন্ন প্রতিনিধি দল বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা দিত। সেখান থেকেই তিনি চিকিৎসা পদ্ধতি শিখেছেন। ইমাম জাহাবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থেও এমনটি উল্লেখ করেছেন।
সে সময়ের চিকিৎসকগণের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন হারিস ইবনু কালদা আস-সাকাফি। তিনি ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের গুন্দেসাপুরে চিকিৎসা বিদ্যা শিখেছিলেন। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি ছিলেন। ( তিনি সাহাবী ছিলেন কিনা সে নিয়ে বিতর্ক আছে, সম্পাদক ) আবু দাউদ শরীফে সাইদ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখতে আসলেন। আমার বুকের উপর হাত রাখলেন। আমি তার হাতের শীতলতা আমার হৃদয় পর্যন্ত অনুভব করলাম। তিনি বললেন, তুমি তো হার্টের রোগী। সাকিফ গোত্রের হারিস ইবনু কালদার কাছে যাও। সে এর চিকিৎসা করে। এমনিভাবে তার পুত্র নজর ইবনু হারিস ইবনু কালদাও ছিলেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তিনিও তার পিতার মতো একই স্থান থেকে চিকিৎসা শিখেছিলেন।
সে সময়ের আরো কজন চিকিৎসক হলেন :
• আবদুল মালিক ইবনু আবজার আল-কিনানী: যিনি প্রথমে আলেকজান্দ্রিয়ায় বাস করতেন এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে শিক্ষা দিতেন।
• ইবনু আবি রামসা আত-তামিমী: তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ অস্ত্রোপচারবিদ।
• বনু আওদের চিকিৎসক জয়নাব: তিনি চক্ষু এবং ক্ষতস্থানের চিকিৎসায় পারদর্শী এবং প্রসিদ্ধ ছিলেন।
• শামারদাল ইবনু কিবাব আল-কাবি আন-নাজরানি: তিনি নাজরান থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আগত বনু হারিস ইবনু কাব গোত্রের কাফেলায় শরিক ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। জাহিলি যুগে আমি আমার গোত্রীয় গণক ছিলাম এবং চিকিৎসাও করতাম। এখন কি আমার জন্য এটি করা বৈধ হবে? কারণ, আমার কাছে তরুণী মেয়েরাও আসে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করলেন। তখন শামারদাল (রাঃ) নবীজিকে বললেন, ‘যে সত্ত্বা আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার শপথ, চিকিৎসা সম্পর্কে আপনি আমার চেয়ে অনেক বিজ্ঞ।’[আল-ইসাবাহ, ইবনু হাজর আসকালানি]
• জিমাদ ইবনু সালাবা আল-আজদি : আজদে শানুয়া গোত্রের লোক ছিলেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাঁর সম্পর্কে বলেন, আজদে শানুয়া গোত্রের জিমাদ নামক একজন লোক ওমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় এলেন। এসে শুনতে পেলেন কুরাইশরা বলাবলি করছে, মুহাম্মাদ একটা পাগল। তখন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের চিকিৎসা করার ইচ্ছে করেন। তাঁর কাছে এসে বলেন, হে মুহাম্মাদ, আমি দুষ্ট বাতাসের প্রভাবের চিকিৎসা করি। আপনি যদি চান তাহলে আপনাকে চিকিৎসা দেব। আল্লাহ চাইলে আপনি সুস্থ হবেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশাহহুদ পাঠ করলেন এবং এমন কিছু কথা বললেন যা জিমাদকে খুবই মুগ্ধ করল। বললেন, আমাকে আবার বলুন। নবীজি তাকে আবার শুনালে তিনি বললেন, এমন কথা আমি আগে কখনো শুনিনি। আমি অনেক গণক, জাদুকর এবং কবিদের কথা শুনেছি, কিন্তু এমন সুন্দর কথা আগে শুনিনি। তিনি তো শব্দের সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের পক্ষ ও নিজ গোত্রের পক্ষ হতে রাসুলের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। [আত-তবাকাতুল কুবরা,ইবনু সাদ: ১/১৭৭]
• উম্মে আতিয়্যাহ আনসারিয়্যাহ: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মেয়ে জয়নাবকে গোসল করাতে বলেছিলেন উম্মে আতিয়্যাহ (রাঃ)কে। তিনি হাদীসও বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু সীরিন এর সুত্রে তাঁর থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। এসব যুদ্ধে আমি সাহাবাগণের জন্য রান্না করতাম এবং তাদের ঘাঁটিতে থেকে ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের পরিচর্যা করতাম। [তারিখুল ইসলাম, ইমাম জাহাবি: ৪২৮]
ইসলামি ইতিহাসের প্রথম হাসপাতাল :
মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, খন্দকের যুদ্ধে সাদ ইবনু মুয়াজ (রাঃ) আহত হলেন। ইবনুল আরাকা নামক কুরাইশ গোত্রের এক ব্যক্তি তাঁর কাঁধে তির নিক্ষেপ করেছিল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজের স্থলের কাছেই একটি তাঁবু খাটালেন। তাঁকে নিকট থেকে চিকিৎসা প্রদানের জন্য। আল্লামা ইবনু ইসহাক তাঁর সীরাত গ্রন্থে বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ ইবনু মুয়াজকে আসলাম গোত্রের রাফিদা নামক মহিলার জন্য স্থাপিত তাঁবুতে রেখেছিলেন। তিনি আহত যোদ্ধাগণকে চিকিৎসা দিতেন। খন্দকের যুদ্ধে কোনো ব্যক্তি তিরবিদ্ধ হলে রাসুল বলতেন, ‘তাকে রাফিদার তাঁবুতে রেখে আসো। যেন আমি কাছ থেকে তাঁর চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ করতে পারি।’[সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৬৮৮] এ থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামের ইতিহাসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সর্বপ্রথম ভ্রাম্যমান সামরিক হাসপাতাল নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ইমাম মাকরিজি বলেন, ইসলামি ইতিহাসে সর্বপ্রথম হাসপাতাল নির্মাণ করেন উমাইয়া খলিফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক। ৮৮ হিজরি মোতাবেক ৭০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এ হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তাদের বেতন-ভাতা জারি করেছিলেন। কুষ্ঠরোগীদের আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের জন্য এবং অন্ধ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করেছিলেন। ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহু তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক গ্রন্থে বলেছেন, শাম তথা বৃহত্তর সিরিয়ার অধিবাসীদের কাছে ওলিদ বিন আবদুল মালেক সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা হিসেবে গন্য হয়েছিলেন। তিনি সেখানে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। লোকদেরকে অজস্র দান করেছিলেন। কুষ্ঠরোগীদের ভাতার ব্যবস্থা করে বলেছিলেন, তোমরা মানুষের কাছে কিছু চেয়ো না।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের চিকিৎসা এবং চিকিৎসকগণের ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে জানার পর এখন সে সময়কার চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।
তিব্বে নববী তথা নবীজির নির্দেশিত চিকিৎসা :
ইসলামের প্রাথমিক যুগের চিকিৎসা আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময়কার চিকিৎসা থেকে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। তবে ইসলাম ধর্মে চিকিৎসা একটি ধর্মীয় বিষয় হিসেবে স্বীকৃত ছিল। অনেক প্রাচ্যবিদ পর্যন্ত এ কথা স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে জর্জিওডার নামক এক প্রাচ্যবিদ নির্ভরযোগ্য সুত্র অনুযায়ী বলেছেন যে, ইসলাম ধর্মে সুস্থতা এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত অনেক ফরজ, সুন্নাত এবং মুস্তাহাব বিধান রয়েছে। ইসলামের শিক্ষায় শারীরিক সুস্থতাকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলাম মানুষকে খাবার এবং পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টির দিকে আহ্বান করে। অপচয় থেকে নিষেধ করে। পবিত্র পানির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অর্জনে উৎসাহিত করে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পূর্বে পবিত্র পানি দিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধৌত করতে বলে। আর নামাজের মাধ্যমেও শারীরিক বেশ কিছু অনুশীলন হয়ে যায়। আর ইসলাম মদ এবং জুয়াকে হারাম করে জাকাত আদায়কে ফরজ এবং আবশ্যক করেছে। বিভিন্ন হাসপাতাল এবং আরোগ্যালয়ের নির্মাণে এটি বেশ প্রভাব রেখেছে। এবার আসি তিব্বে নববী তথা রাসুলের নির্দেশিত চিকিৎসার কথায়।
তিব্বে নববী হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ সকল হাদীস যেগুলোতে সুস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সার্বিক কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং কিছু বিধিবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। খাবার দাবার গ্রহণ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার অনেক টিপস প্রদান করেছেন। এ সকল হাদীসগুলোকেই একসাথে মিলিয়ে তিব্বে নববী বা প্রোফেটিক মেডিসিন বলা হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম সর্বদা সুস্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে জানতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জ্ঞান হচ্ছে দুই প্রকার: ধর্মীয় জ্ঞান এবং শারীরিক জ্ঞান। প্রিয় নবীজি শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক সুস্থতাকে পার্থিব সৌভাগ্যের খুঁটি হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি চিকিৎসা গ্রহণের ব্যপারে উৎসাহিত করেছেন। ইসলামই সর্বপ্রথম রাসুলের হাতে জাদুকর এবং গণকদের হাত থেকে চিকিৎসাকে স্বাধীন করেছে।
ইসলাম ধর্ম সর্বপ্রথম চিকিৎসা এবং মেডিসিনিবিদ্যাকে স্বীকার করেছে। তবে তা সত্ত্বেও সবাই বরকত লাভের উদ্দেশ্যে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেই আসতেন। তবে তিনি বরাবরই চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার নির্দেশনা দিতেন। বলতেন, হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা নাও। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বার্ধক্য ব্যতিত সকল রোগের ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। এমনিভাবে ইসলাম স্বীকৃতিহীন সকল চিকিৎসাকর্মীকে শাস্তি প্রদানের আদেশ দিয়েছে। ইসলাম চিকিৎসা প্রদানের দায়িত্বগ্রহণের আগে সতর্ক করেছে। কেউ যদি ( ইচ্ছাকৃতভাবে ) ভুল চিকিৎসা করে, তাকে এর জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করেছে। চিকিৎসা করার পূর্বে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক চিকিৎসককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘কারো রোগ নির্ণয় ব্যতিত কোনো চিকিৎসা প্রদান করবেন না।’ তিব্বে নববীতে এমনই কিছু চিকিৎসা সংক্রান্ত আদেশ-নিষেধ, দিকনির্দেশনা এবং উপকারী কিছু ঔষধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ের চিকিৎসা :
শারীরিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্বারোপের ক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদীন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। তারা নিজেরাও লোকদেরকে সুস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতে বলতেন এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু চিকিৎসার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তাঁর বেশ কিছু প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে। যেমন, তিনি বলেছেন, আপনারা খাবার এবং পানীয় গ্রহণে পেটুকতা করা থেকে বিরত থাকুন। এতে শরীর নষ্ট হয়ে যায়, বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয় এবং নামাজে অলসতা তৈরী হয়। তিনি আরো বলেন, আপনারা অধিক পরিমাণে গোশত ভক্ষণ থেকে বিরত থাকুন। কেননা, গোশতের মধ্যে মদের মতো হিংস্রতা রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিটি সৈন্যদলের সাথে চিকিৎসকদের ইউনিট প্রেরণ করতেন। আলি (রাঃ) একবার আকস্মিক ব্যাধিতে আক্রান্ত চারশত যোদ্ধাকে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে কুফায় ফিরিয়ে আনতে বলেছিলেন।
বনু উমাইয়ার শাসনামলে চিকিৎসা :
সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির পর উমাইয়া খলিফাগণ চিকিৎসা বিদ্যার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাদের সময়ে দামেস্ক জ্ঞান এবং সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। খলিফা উমর ইবনু আবদুল আজিজ সুরিয়ানি ভাষার চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোর আরবি রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ৮৮ হিজরি মোতাবেক ৭০৬ খ্রিষ্টাব্দে ওলিদ ইবনু আবদুল মালেক দামেস্কে হাসপাতাল নির্মাণ করেন এবং চিকিৎসক নিয়োগ দেন। যার কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে।
তাদের সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে এ ধরণের নিয়মতান্ত্রিক হাসপাতালসমূহ এবং ইসলামী চিকিৎসা বিদ্যায় বেশ কজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব।
সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য কজন চিকিৎসক হচ্ছেন :
• ইবনু আসাল : তিনি ছিলেন খ্রিষ্টান। একক এবং যৌগিক ঔষধের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ।
• আবুল হাকাম : এই ব্যক্তিও ছিলেন খ্রিষ্টান। তখনকার চিকিৎসকদের মধ্যে তাঁর পরিবার ছিল শীর্ষ অবস্থানে।
• তায়াজুক: তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। চিকিৎসায় দক্ষতার পাশাপাশি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাকাফির ব্যক্তিগত মেন্টর ছিলেন। তিনি সুস্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করে অনেক বক্তব্য এবং উপদেশ প্রদান করেছেন। তিনি তার ছেলের জন্য চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ লিখেছেন। এই গ্রন্থে তিনি রোগের পরিবর্তন, সুক্ষতা, স্থায়ীত্ব এবং নিঃশেষ হওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিছু রোগের নাম সংক্রান্ত ব্যাখ্যাও তাতে আলোচ্য হয়েছে। ৯০ হিজরি মোতাবেক ৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াসেত শহরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আব্বাসীয় শাসনামলে চিকিৎসা :
সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরে কেবল আব্বাসীয়দের কাছেই আবর্তিত হয়। তাদের সময়েই মুসলিম জাতি চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় উৎকর্ষ লাভ করে। পূর্ববর্তী শাস্ত্রবিদদের ভুলত্রুটিগুলো তারা সংশোধন করেন। তারা শুধু চিকিৎসা পদ্ধতি বর্ণনা এবং অনুবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা এ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন এবং পূর্ববর্তীদের ভুল সংশোধন করেছেন। তাদের আমলে চিকিৎসা সংক্রান্ত অনেক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনকার মুসলিম চিকিৎসকগণ রোগের ধরণ-প্রকৃতি এবং এর বিকাশ নিয়ে আলোচনা করার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিতেন। হুনাইন ইবনু ইসহাক এবং সাবিত বিন কুররা আল-হাররানির মতো অনেক চিকিৎসক এই জাগরণে অবদান রেখেছেন। তারা চিকিৎসকের জন্য সিলেবাস প্রণয়ন করেছিলেন। প্রধান চিকিৎসকের কাছে উত্তীর্ণ হওয়া ব্যতিত কেউ এতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত না। প্রসিদ্ধ আরব চিকিৎসক সিনান ইবনু সাবিত ইবনু কুরারা শুরু থেকে এ বিষয়ে দেখাশোনা করতেন। সে সময় সাধারণ চিকিৎসক, রক্ত বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ডেন্টিস্ট, মহিলা চিকিৎসক এবং ফ্রি চিকিৎসক ইত্যাদি পৃথক পৃথক ক্যাটাগরির সৃষ্টি হয়েছিল।
সে সময়কার ইসলামি বিশ্বের প্রখ্যাত কজন চিকিৎসক হলেন :
এক. আবু বকর আর রাযী (মৃত্যঃ ৩১১ হিজরি/৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ) : পুরো নাম, আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু জাকারিয়া আর –রাযী । জন্মগ্রহণ করেছিলেন রাই শহরে। সেখান থেকে চলে যান বাগদাদে। সেখানেই জীবনের দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। সেখানেই বিজ্ঞদের কাছ থেকে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা করেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল অনেক প্রশস্ত। বহুসংখ্যক ছাত্রকে তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন।
আব্বাসীয় খলিফা আজুদুদ্দৌলা তাঁকে বলেছিলেন একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে। তিনি বাগদাদের প্রতিটি দিকে এক টুকরো করে গোশত ঝুলিয়ে আসেন। অতঃপর যে গোশতের টুকরোটির ঘ্রাণ পরিবর্তিত হয়নি, সেই স্থানকে তিনি হাসপাতালের জন্য নির্বাচিত করেন। তাঁর এই পদ্ধতি বর্তমান সময়ের আলোচকদেরকেও বিস্মিত করে দেয়। তাঁকেই এ হাসপাতালের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
চিকিৎসা বিদ্যার ক্ষেত্রে মৌলিক নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আবু বকর আর-রাযীকে পুরো বিশ্বেই অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে গন্য করা হয়। তিনিই সর্বপ্রথম হাম এবং বসন্ত রোগের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। শিশু, মহিলা বিষয়ক, বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত এবং চোখের চিকিৎসা বিষয়ে তিনি সুবিস্তৃত বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যায় পরীক্ষামূলক গবেষণার অগ্রদূত। নিজ থেকেই তিনি বানর প্রভৃতি কিছু প্রাণীকে নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। এগুলোকে তিনি ঔষধ দিতেন এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতেন। এক্ষেত্রে সফল হলেই তিনি সেই ঔষধ মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেন। তাকেই প্রথম চিকিৎসক হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি বলেছিলেন অসুস্থতা জেনেটিকেলি অর্থাৎ বংশানুক্রমিক ভাবেও হয়ে থাকে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর আরো অনেক অগ্রগণ্য অবদান রয়েছে।
দুই. আলি ইবনু ঈসা (মৃত্যুঃ ৪০০ হিজরি) : আব্বাসীয়দের আমলে মুসলিম সভ্যতায় চক্ষু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও উন্নতি ঘটে। এক্ষেত্রে কেউই তাদের সাথে টক্কর দিতে পারেনি। পূর্বের ইউনানী তথা গ্রীকরা এবং সমসাময়িক ল্যাটিনরা তাদের কাছেই ঘেঁষতে পারেনি। পরবর্তীতে যারাই এসেছেন এক্ষেত্রে তাদের অগ্রগামীতার কথা স্বীকার করেছেন। আব্বাসীয় আমলের চক্ষুবিদগণের লিখিত রচনাবলীকে এ সম্পর্কিত সর্বপ্রাচীন দলিল হিসেবে গন্য করা হয়। ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে সে সময়কার সবচেয়ে অগ্রগন্য চক্ষুবিদ ছিলেন আলি ইবনু ইসা। এ সম্পর্কে তিনি তাজকিরা নামে সুবিশাল এক গ্রন্থ লিখেছিলেন।
তিন. আবুল কাসেম জাহরাভি : তিনি ছিলেন ইতিহাসের বিখ্যাত সার্জন। তাঁকে আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক বলা হয়। ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের আন্দালুসিয়ার আজ-জাহরা শহরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সম্ভবত আল-আনসারি গোত্রের সদস্য ছিলেন। জীবনের প্রায় পুরো সময়ই তিনি স্পেনের কর্ডোভায় কাটিয়েছেন। এ শহরেই তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ডাক্তারি। আন্দালুসিয়ার খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের রাজচিকিৎসক ছিলেন তিনি। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি আজ-জাহরা শহরে স্থানান্তরিত হন এবং বাকি জীবনটা সেখানেই কাটান। ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি নিজেই তাঁর আত্মজীবনী লিখে গিয়েছিলেন। তা ছাড়া তাঁর জীবদ্দশায় অনেকেই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, ক্যাস্টিলিয়ান ও আন্দালুসিয়ানদের মধ্যকার যুদ্ধে আজ-জাহরা শহর ধ্বংস হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় এসব অমূল্য তথ্যও।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে তাঁর লিখিত ‘কিতাবুত তাসরিফ’-এর মাধ্যমে। এটি ছিল চিকিৎসাসংক্রান্ত ৩০ খণ্ডের বিশ্বকোষ। সার্জারি থেকে শুরু করে মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, অর্থোপেডিকস, প্যাথলজি, দন্তবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, শিশু চিকিৎসা—সবই স্থান পেয়েছে তাঁর এই গ্রন্থে। শল্যচিকিৎসার প্রক্রিয়া ও যন্ত্র নিয়ে তাঁর অবদান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আধুনিক কালেও প্রভাব ফেলেছে। তাঁর রচিত ‘কিতাবুত তাসরিফ’ গ্রন্থে দুই শতাধিক অস্ত্রোপচারের সচিত্র বর্ণনা দিয়ে সে সময়কার চিকিৎসকদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেন তিনি। বর্তমান সময়েও সেগুলো চিকিৎসকদের বিস্মিত করে। তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্র কিছু কিছু বিষয়ে এখনো ব্যবহার করা হয়। আন্দালুসিয়ার খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের উদ্যোগে আবুল কাসেমের ৫০ বছর নিরলস পরিশ্রমের ফল এই অমূল্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড ক্যাম্পবেল বলেন, ‘আবুল কাসেমের চিকিৎসা পদ্ধতি এতটাই উন্নত ছিল যে ইউরোপীয়রা অন্ধের মতো অনুকরণ করত তাঁকে। তাঁর দেখানো পথে চলেই ইউরোপে শল্যচিকিৎসা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে!’তার সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে গেলে বিস্তারিত গ্রন্থই লেখা যাবে।
চার. ইবনে সিনা (৪২৮ হিজরি/ ১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) : ইবনে সিনা বুখারার (বর্তমান উজবেকিস্তান) অন্তর্গত খার্মাতায়েন জেলার আফসানা নামক স্থানে ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে (মতান্তরে, আগস্ট মাস) জন্মগ্রহণ করেন। আরবি পঞ্জিকা অনুসারে সালটি ছিল ৩৭০ হিজরি। তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। তাঁকে একইসাথে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার বিজ্ঞজনেরা তাদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করে। মধ্যযুগীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত রচনায় তিনি অবদান রেখেছেন। তাঁর মূল অবদান ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রে। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ আল-কানুন ফিত-তিব রচনা করেন যা ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠ্য ছিল। আরবিতে ইবন সিনাকে আশ শায়খ আর-রাঈস তথা জ্ঞানীকুল শিরোমণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইউরোপে তিনি আভিসিনা (Avicenna) নামে সমধিক পরিচিত।
পরবর্তী সময়েও আরো অনেক অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসকের প্রতিভা পৃথিবী পরিলক্ষিত করেছে। এভাবেই মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসা বিদ্যার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। সংক্ষিপ্তভবে বলতে গেলে, ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে দেখা যায় যে, ইসলামি সভ্যতায় চিকিৎসা বিদ্যা তিনটি পর্যায় অতিক্রম করেছে। প্রথম পর্যায় শুরু হয় সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শুরু থেকে । এ সময় তাঁরা গ্রীক, পারস্য, সুরিয়ানি, হিন্দুস্তানি এবং রোমকদের কাছ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং অনুবাদ করেছেন।
এর অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম চিকিৎসকগণ মূল চিকিৎসা বিদ্যায় উৎকর্ষ লাভ করেন এবং বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা শুরু করেন। এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিদ্যার স্বর্ণযুগ। এ সময়েই মুসলিম সভ্যতা চিকিৎসা বিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে অবদান রেখেছে এবং সারা বিশ্বের সামনে নিজেদের সক্ষমতা এবং অগ্রগামিতা প্রকাশ করেছে। নবম খ্রিষ্টীয় শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ খ্রিষ্টীয় শতাব্দী পর্যন্ত ছিল এই স্বর্ণযুগের ব্যাপ্তি। তৃতীয় স্তরে এসে মুসলিমরা ধীরে ধীরে শীর্ষস্থান থেকে পিছিয়ে যেতে শুরু করে এ সময় পুরো মুসলিম জাতিই অবনমনের শিকার হয়। সমাপ্তি টানার আগে মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসা বিদ্যার ক্রমবিকাশের ইতিহাস থেকে কিছু উপসংহার টানার চেষ্টা করব।
(১) আরব এবং মুসলিম চিকিৎসকগণই প্রাচীন সমাজে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিদ্যার পাঠদানে এগিয়েছিলেন।
(২) চিকিৎসা বিদ্যায় মুসলিম সভ্যতার জাগরণের পিছনে অন্যতম অবদান ছিল খলিফাগণের। বিশেষ করে উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসনামলের খলিফাগণের।
(৩) মুসলিম চিকিৎসকগণ শুধু পূর্ববর্তীদের চিকিৎসা বিদ্যা বর্ণনা করেই যাননি। তাদের ভুলও শুদ্ধ করেছিলেন এবং আরো নতুন নতুন সূত্র ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কার করেছিলেন। লিখে গেছেন চিকিৎসা শাস্ত্রে অগণিত গ্রন্থ।
(৪) তাদের হাতেই সর্বপ্রথম চক্ষু বিভাগ, শিশু বিভাগ, মহিলা বিভাগ প্রভৃতি পৃথক পৃথক চিকিৎসা ইউনিট সৃষ্টি হয়েছিল।
(৫) তারাই হাসপাতালগুলোকে বর্তমান সময়ের মতো মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত করেছিলেন।
(৬) তাদের হাতেই চিকিৎসা বিভাগ এবং ফার্মেসী বিভাগের মাঝে পার্থক্য সূচিত হয়েছিল।
(৭) তৎকালীন সময়ে ইউরোপীয় বিশ্ব চিকিৎসা শাস্ত্রের কিছুই জানতো না। আরবি গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন এবং এগুলোর রূপান্তরের মধ্য দিয়েই তারা চিকিৎসা বিদ্যায় ভিত গড়তে সক্ষম হয়েছিল। দক্ষিন ইতালি এবং ফ্রান্সে যখন প্রথম চিকিৎসা ইনস্টিটিউটগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এ ক্ষেত্রে আরবদের প্রভাব স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়েছিল।
(৮) মোটকথা, মুসলিম চিকিৎসকগণের হাতেই চিকিৎসা বিদ্যার বৈপ্লবিক জাগরণ সাধিত হয়েছিল এবং তাদের মাধ্যমেই চিকিৎসা একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
