
মুজাহিদুল ইসলাম
বহু প্রতিভার অধিকারী মিসরী পণ্ডিত ডক্টর মুহাম্মাদ ইমারাহ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী জ্ঞানসাধনার যাত্রার সমাপ্তি টেনে চলে গেছেন ওপারে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কেটেছে তার যাপিত জীবন। তিনি ছিলেন আরব সমাজের বিভিন্ন ঘরানার মানুষের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। জীবনে ডানবামসহ বহু অলিগলি ঘুরেছেন। বিভিন্ন মতাদর্শের অনেক দিকপাল তার হাত ধরে উঠে এসেছে।
সালাফী, মুতাজিলী, ইখওয়ানী ও জাতীয়তাবাদীসহ বহু মতাদার্শিক অভিধা তাকে দেওয়া যায়। এক বৈচিত্র্যময় ব্যক্তি। তিনি সত্য-সুন্দরকে গ্রহণে অকপট। সত্যপ্রকাশে সৌজন্যবোধের কথিত আবরণ তিনি মানতেন না। যোগ্যতার বৈচিত্র্যময় সমন্বয় সত্ত্বেও শিক্ষাজীবন থেকে শেষতক পদপদবীর প্রতি ছিলেন অনাগ্রহী। ২০১০ সালে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ’আলজাজিরা’ ড. ইমারা সম্পর্কে ডকুমেন্টারী তৈরী করতে তার সাক্ষাতকার গ্রহণ করে। দেশকাল বিবেচনায় সাক্ষাতকারের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
আলজাজিরা: আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তো নিরক্ষর ও গ্রামীণ পরিবারে। আমাদেরকে আপনার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে একটু বলুন।
ড.ইমারাহ: ২৭ রজব, ১৩৫০ মোতাবেক ৮ ডিসেম্বর, ১৯৩১ সালে কালিনের ‘সারাওয়াহ’ গ্রামে আমি জন্মগ্রহণ করি। মোটামুটি স্বচ্ছল গ্রামীণ পরিবারে বেড়ে ওঠেছি। ধনীও না। গরীবও না। আমি মাঝেমধ্যে মজা করে বলতাম, আমি তো নেতা। মিসরের প্রাচীন শাসক বংশের সন্তান ছিলেন আমার পিতা। মা ছিলেন রাসূল সা. এর বংশধর। একই সাথে ইসলাম ও আরবত্বের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে আমাদের পরিবারে। ভাইদের মধ্যে আমি চতুর্থ। আমি মায়ের গর্ভে এলেই বাবা মানত করলেন, গর্ভের সন্তান পুত্র হলে তাকে ’ইলম’ এর জন্য দান করে দিবেন। নাম রাখবেন মুহাম্মাদ।
জীবনের প্রথম শিক্ষালয় মক্তবে রয়েছে আমার অম্লমধুর অভিজ্ঞতা। আমাকে একটি মকতবে ভর্তি করা হয়। শিক্ষক ছিলেন খুবই কঠোর। রুঢ়তাই ছিল তাঁর শিক্ষাদানের একমাত্র মাধ্যম। তৎকালীন মানুষের ধারণা ছিল, যিনি প্রচুর পেটান তিনিই সেরা শিক্ষক। এ ব্যবস্থাপত্র আমার ক্ষেত্রে প্রয়োগে সুফল আসেনি। আমি মক্তবে যাওয়া বন্ধ করে দেই। অন্য ভাইদের সাথে কৃষি কাজে যুক্ত হই। আমার বাবাও কম নন। তিনি যেহেতু আমাকে ইলমের জন্য আমাকে দান করেছিলেন, উদ্দেশ্য অর্জনে এমন কঠিন কর্মপন্থা অবলম্বন করেন, যা আমার জন্য মক্তবের অভিজ্ঞতাকেও ছাড়িয়ে যায়।
এবার আমাকে নতুন মক্তবে ভর্তি করা হলো। এই মক্তবের উস্তাদের নাম মুহাম্মাদ। খুবই অমায়িক মানুষ। মুখে সবসময় হাসির রেখা ফুটে থাকতো। কোমল হৃদয়ের মানুষ। যখন তাঁর নিকট যাওয়া শুরু করি, আল্লাহ আমার হৃদয় খুলে দিলেন। সবকিছু সহজ হতে শুরু করে। সঠিক পথে এগোতে থাকে আমার আগামীর যাত্রাপথ। একসময় তাজবীদের সাথে কুরআনও হেফজ করে ফেলি। হিফজের পাশাপাশি প্রাইমারীর বাধ্যতামূলক বিষয়সহ সকল ধরণের সাধারণ শিক্ষা আমি তাঁর নিকট থেকে গ্রহণ করি। এখানে আসলে বলা দরকার, আমার এই শিক্ষক ছিলেন আযহার-পড়ুয়া। অনার্স শুরু করেছিলেন। কিন্তু অর্থসংকটে সমাপ্ত করতে পারেননি। পরবর্তীতে বাচ্চাদের কুরআন শিক্ষার জন্য মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৫ সালে আমি দাসুক শহরের ধর্মীয় ইনিস্টিটিউটে ভর্তি হই। তৎকালীন মিসরে মাত্র পাচঁটি ধর্মীয় ইনিস্টিটিউট ছিল। এ সকল প্রতিষ্ঠানে আট হাজারের বেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করত। সে যুগে প্রাইমারীর পাঠ্যবিষয়ের মানও বেশ উচ্চাঙ্গের ছিল। তৎকালীন আল আযহারের প্রাইমারীতে উচ্চতর জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হতো। আযহারের প্রাইমারী স্তরের চতুর্থ শ্রেণিতে আমরা ব্যাকরণের রেফারেন্সবুক ‘শুযুরুয যাহাব’ অধ্যয়ন করতাম। বর্তমানে যা সাহিত্য-অনুষদে চার বছরে পাঠদান করা হয়। প্রাইমারিতে আমাদের যা পাঠ্য ছিল, ’কিং ফুয়াদ ভার্সিটি’ তে সেটা চার বছরের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রাইমারির শিক্ষা-অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক কিছু ভাবতে শিখায়। বিশেষত আযহারে নির্জীবতা তো তখন চোখের সামনে। আমরা তখন টীকা-পাদটীকা পড়তাম। আমরা মূলত নিকটঅতীতের কোন বই পড়তাম না। বরং অধিকাংশই মামলুক যুগে রচিত গ্রন্থাদি। আমরা আযহারের সংস্কার ও বিদেশী ভাষা পাঠদানের দাবিতে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ইত্যাদি পালন করতাম।
আলজাজিরা: জীবনের প্রাথমিক পর্বে পড়ালেখার প্রতি কিভাবে মনোযোগী হলেন এবং কাদের দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়েছিলেন?
ড. ইমারাহ: আমার সৌভাগ্য, আমি বেশ কিছু মহান শিক্ষকের সাহচর্য পেয়েছিলাম। যেমন, ফকীহ আব্দুর রহমান জালাল। ভালো মানুষ ছিলেন। সব সময় পাঠের ব্যাপরে আমাকে উৎসাহিত করতেন।
শায়েখ মুহাম্মাদ কামিল আল ফাকী আমার ভেতর পাঠউদ্যম ও স্পৃহা জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সৌদি রাজনীতিবিদ। তৎকালীন সৌদি সরকার তাকে সৌদিত্যাগে বাধ্য করেন। শায়েখ হিসেবে ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। স্মার্ট মানুষ। পত্রপত্রিকা ও জার্নাল পড়তেন। তৎকালীন শায়েখদের মধ্যে তখন এটার প্রচলন ছিল না। বরং পত্রিকাপাঠ অনেকক্ষেত্রে ভিন্নদৃষ্টিতে দেখা হত। আমরা তখন প্রাইমারির দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করি। শায়েখ মুহাম্মাদ কামিল আমাদের ব্যাকরণ পড়াতেন। মিসরী পত্রিকার এডিটোরিয়াল আমাদের পড়ে শোনাতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই কিনে আনতে পারবে? আমি গিয়ে মানফালুতীর ‘নাযারাত’ কিনে আনলাম। নাযারাতই পাঠ্য বইয়ের বাইরে আমার কেনা প্রথম বই। শায়েখ বললেন, তুমি বইটি নিয়ে আসবে। আমি বইটি এনে শায়েখের নিকট পড়তাম। বছর শেষে আমরা শায়েখের সন্মানে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করি; শায়েখকে একটি ‘বুনবুনির ডিব্বা’ উপহার দেই। পাশাপাশি শায়েখের প্রশংসায় একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করি।
আমাদের গ্রামে আব্দুত তাওয়াব নামে এক শায়েখ ছিলেন। চমৎকার কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর আলোচনাও ছিল চিত্তাকর্ষক। গ্রামের বিভিন্ন ইস্যুতে নেতৃত্বভার তাঁর কাঁধে দেয়া হতো। ভার্সিটির ‘উসূলুদ দ্বীন’ অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার বছরই তিনি মারা যান। গ্রামে চার হাজারের অধিক গ্রন্থের এক বিশাল সংগ্রহশালা ছিল তাঁর। ইউরোপের বিভিন্ন ভাষা থেকে অনূদিত বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন নামিদামি জার্নালও ছিল সেখানে। পারিবারিক নিরক্ষরতায় লাইব্রেরী তার আবেদন হারিয়ে ফেলে। যখন একটু পড়াশোনায় মনোযোগী হতে শুরু করি, অল্প কিছু টাকা দিয়ে লাইব্রেরীটি কিনে নেই। অবশ্য কয়েক দফায় আমাকে কিনতে হয়েছে। দিনরাত লাইব্রেরীতে উপুড় হয়ে থাকতাম। বিশেষত ছুটির চার মাস। লাইব্রেরীতে বসে পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসত। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পড়তাম। এই লাইব্রেরি থেকেই মুহাম্মাদ আবদুহ এর ‘নাহযুল বালাগাহ’ ও ডারউনের ‘বিবর্তনবাদ’ পড়ি। সমাজতন্ত্র সম্পর্কের ধারণাও এখান থেকে পাই।
আলজাজিরা: ‘ভার্সিটি লাইফে’ রাজনীতি করেছেন। ’ইয়ং ইজিপ্ট পার্টি’ (এটি একটি বিপ্লবী ধারার দল) এর সাথে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু ’ব্রাদারহুড’ এর পরিবর্তে কেন ’ ইয়ং ইজিপ্ট পার্টি’?
ড.ইমারাহ: ইয়ং ইজিপ্ট পার্টির কিছু ব্যক্তির সাথে আমার পরিচয় ঘটে। ফিলিস্তিনি ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আমার অভিষেক। ১৯৪৬ সালে ইনিস্টিটিউটে থাকাকালীন প্রথম বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করি। মিসর থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করার দাবিতে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনের পক্ষে ও ইয়াহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মসজিদে আলোচনা করতে থাকি। ‘জিহাদ’ শিরোনামে ফিলিস্তিন নিয়ে একটি লেখা তৈরী করি। আমার জীবনের প্রথম লেখা ছিল এটি। আরব সৈন্যদের আগে বেসামরিক তরুণ ও যুবকরা দলে দলে ফিলিস্তিনে জিহাদের জন্য প্রবেশ করতে থাকে। তাদের মহান জিহাদযাত্রার পাটাতনে তৈরী হয় আমার লেখাটি। ১৯৪৮ এর এপ্রিলে আর্টিকেলটি ইয়ং ইজিপ্ট পার্টি’ এর পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। আমার ধারণা, মুদ্রিত আর্টিকেল আমার সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।
এ সময় অবশ্য আমার মধ্যে দ্বিধা ছিল। ব্রাদারহুডে নাকি ইয়ং ইজিপ্ট পার্টিতে যোগ দিবো। ইয়ং ইজিপ্ট পার্টি ‘ জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী মূল্যবোধ ধারণকারী একটি দল । আবার ব্রাদারহুড পুরাদস্তুর ইসলামি দল। দিবাস্বপ্নে আহমাদ হুসাইন ও হাসান আল বান্নাকে দেখতাম। কিন্তু সবশেষে আমি ইয়ং ইজিপ্ট পার্টিতে যুক্ত হই।
তবে এর পেছনে আরেকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে; ব্রাদারহুডের কর্মীদের পাঠ ছিল নিয়ন্ত্রিত। সংগঠন কর্তৃক পাঠনির্দেশিকা মান্য করা ছিল তাদের কর্তব্য। কিন্তু পড়ার ক্ষেত্রে আমার দর্শন ছিল ভিন্ন। আমি পাঠস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। নিয়ন্ত্রিত ও নির্দেশিত পাঠকে স্বাধীনতার জন্য হুমকি মনে করি আমি।
তা ছাড়া আমি ‘দাসুক’ বাজারে টাকা ওঠাতে যেতাম। পোস্টের কর্তা আমাকে ইয়ং ইজিপ্ট পার্টির বিভিন্ন প্রচারপত্র দিত। আমি এগুলো পড়তাম। পড়তাম ইয়ং ইজিপ্ট পার্টির মাসিক পত্রিকা। এভাবে মিসর ও সিরিয়া থেকে মুজাহিদদের ফিলিস্তিনে প্রবেশের বিভিন্ন তথ্য পেতাম।
এভাবেই সমাজতান্ত্রিক দলে আমি যুক্ত হই। আমার জন্য এটা বাড়তি সুযোগ বয়ে আনে, যা আমার প্রজন্মের অনেক সন্তান পায়নি। আযহারের শিক্ষার্থীরা মূলত ইসলামী জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাশ্চাত্য চিন্তার মধ্যেই ঘুরপাক খেত। আর আমার একই সাথে দুটোর সাথে পরিচিয় গড়ে তোলার সুযোগ হয়।
আলজাজিরা: এ পর্যায়ে আপনার ভেতর বিপ্লবী চেতনা বেশ ভালোভাবে ছিল। এমনকি যৌবনের শুরুতে একাধিকবার অস্ত্র-প্রশিক্ষণ গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। এটা কীভাবে হল?
ড.ইমারাহ: ফিলিস্তিন ইস্যু তৈরী হল। আরব বিশ্ব প্রবলভাবে আলোড়িত হলো। অন্য অনেক স্বাপ্নিক তরুণের মতো আমিও ফিলিস্তিন যেতে স্বেচ্ছায় অস্ত্র-প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। কিন্তু বয়সে বেশ ছোট হওয়ায় ফিলিস্তিন যেতে ব্যর্থ হই। যখন মিসর ও ইংল্যান্ডের মধ্যে চুক্তি ভেঙ্গে পড়ে, আমি ইংলিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। কিন্তু হঠাৎ কায়রোতে অগ্নিকান্ড লাগায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে ১৯৫৬ সালে ত্রিদেশীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সুইসখাল অঞ্চলে যেতে সক্ষম হই।
বামপন্থায় যুক্ত হওয়ার আগে প্রচলিত সুফিবাদি তারিকার বিরুদ্ধে আমি মসজিদে মসজিদে খুতবা দিতাম। মানুষদের শিক্ষা দিতাম। বৈদেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষদের সচেতন করতাম।
মিসরে যখন সমাজতান্ত্রিক ও ইয়ং ইজিপ্ট পার্টিসহ সকল দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তখন অবিকল্প বামদলই ছিল সহায়। যুক্ত হই তাদের সাথে। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার কথা বলার প্লার্টফর্ম হিসেবে তারা কাজ করত। জাতীয় ইস্যু, সামরিক আইন ও বিদেশী আগ্রাসনসহ সকল ক্ষেত্রে তারা ছিল সোচ্চার।
জীবনে দুইটি বিষয় আমি কখনোই ত্যাগ করতে পারিনি। স্বাধীনতা ও সামাজিক সাম্যের দাবি। বরাবরই এ ব্যাপারে ছিলাম উচ্চকন্ঠ। সামাজিক সাম্যজ্ঞান ও অনুভূতি সবসময় দরিদ্রদের পাশে থাকতে উৎসাহ দিয়েছে। সাম্যবাদের শ্রেষ্ঠত্বের কথিত দাবিতে মার্ক্সবাদ ও পাশ্চাত্য দর্শন পাঠে অনুপ্রাণিত হই। পাঠ করি মাক্সবাদ ওপাশ্চাত্য দর্শন। মার্ক্সবাদের অনেক কিছুকে ইসলামী দর্শনের অনুরূপ পাই।
আলজাজিরা : আপনাকে কেন কারাভোগ করতে হল, শিক্ষাজীবনে এই অভিজ্ঞতা আপনার ভেতর কেমন প্রভাব ফেলেছিল?
ড.ইমারাহ : বামদলের একটি কনফারেন্সের সভাপতিত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করায় বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে এক বছরের জন্য বহিস্কার করে। পরবর্তীতে সামরিক সরকারের সময় গ্রেফতার হই। পাঁচ বছরের বেশী সময় আমাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। ১৯৫৮ সালের অনার্স ১৯৬৫ সালে শেষ করতে হয়। কারাগারে আমি নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছি। নির্যাতন সহ্য করেছি। তবে সময় পেলেই পড়াশোনায় নিজেকে সপে দিতাম। খাতাকলম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তা ছিল আমার নিত্যসঙ্গী। কারারক্ষীদের মাধ্যমে গোপনে আমরা তা আনতাম।
কারাগারে থাকাকালীন চারটি বই রচনা করেছি। কারাগারে আসার আগে আরব জাতীয়তাবাদ ও আরবদের বিরুদ্ধে আমেরিকার বিভিন্ন ষড়যন্ত্র নিয়ে একটি বই লিখেছিলাম। বইটি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করেছিলাম। সিরিয়া ও মিসর একীভূত হওয়ার পর এটিই ছিল আরব জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রকাশিত প্রথম কোন বই। বইটির দুটি মুদ্রন বের হয়। রুশ ভাষায়ও অনূদিত হয়। বইটি মূলত ১৯৫৭ সালে লিখি। পরবর্তী ১৯৫৮ সালে মুদ্রিত হয়।
কারাগারে যাওয়ার পর যখন কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে আসে, তখন আমি এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করি। তারপর এই বিষয়ে চারটি বই রচনা করি। এগুলো ছিল মূলত জায়নিজম ও ক্রসেডীয় প্রকল্পের তুলনামূলক পর্যালোচনা। বইগুলো ‘ফাজরুল য়াকযাতিল কাউমিয়াহ’ , ‘ আল উরুবাহ ফিল আছরিল হাদিস’, ’আল উম্মাতুল আরাবিয়্যাহতু ওয়া কাদিয়্যাতুল ওয়াহদাহ’ এবং ‘ইসরাইল হাল হিয়া সামিয়াহ’। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর বইগুলো মুদ্রিত হয়।
আলজাজিরা : শুরু থেকেই কেন আপনি লেখক হওয়ার প্রতি এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন? আপনার সহযোদ্ধারা বিভিন্ন চাকরি ও পদপদবী নিয়েছেন। কিন্তু আপনি কেন এসব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন?
ড. ইমারাহ : প্রাইমারীতে থাকতে আমার লেখা প্রকাশিত হয়। এটা আমাকে এই অনুভুতি দেয় যে, আমার স্থান এখানেই। পত্রিকার কাগজে কিংবা বইয়ের মলাটে আমার নাম শোভা পাওয়াটাই ছিল আমার নিকট সবচে সুন্দর বিষয়। আমি মনে করতাম, চাকরি এক ধরণের গোলামি। কারাগার থেকে বের হয়ে আমার বন্ধুবান্ধব সরকারের সাথে এক ধরণের লিয়াজোর মাধ্যমে গণমাধ্যমে চাকুরী শুরু করে। কিন্তু বাম ধারা ছেড়ে দেয়াতে এ ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ দেয়া হয়নি আমাকে। তবে একটি গ্রাহক সমিতিতে আমাকে চাকুরী দেয় তারা। এটাকে আমি আত্মহত্যার নামান্তর বলেই মনে করছিলাম। বন্ধুবান্ধব বলল, তুমি চুরি ঠেকাবে ওখানে। আমি বললাম, হতে পারে আমিও তাদের মতো চোর হবো। আমার বেতন ছিল বিশ জুনাইহ। পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরীতে অধিকাংশ সময় (১৮ ঘন্টা) কাটাতাম। কাজেই তেমন সময় না দেয়ার কারণে কখনো কখনো মাসে মাত্র সাত জুনাইহ পেতাম। অবশ্য গ্রাম থেকে রেলের মাধ্যমে আমার পিতা আমার জন্য বিভিন্ন খাবার পাঠাতেন।
আমি এই কাজ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। সেটি ছিল আমার বুদ্ধিবৃত্তিকতার জন্য আত্মঘাতী। প্রেসে প্রুফরীডার হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীতে খুবই সামান্য বেতনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তুরাস শাখায় কাজের সুযোগ পাই। এটা অবশ্য আমাকে অনেক স্পর্শকাতর ইসলামী গ্রন্থপর্যালোচনার সুযোগ এনে দেয়।
একাধিকবার তেলসমৃদ্ধ বিভিন্ন দেশের ভার্সিটিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি নিবিড়ভাবে কাজের জন্য এটাকে উপযোগী মনে করিনি। বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রাপথে আমাকে সবচে বেশী সহযোগিতা করেছে আমার সহধর্মিনী। সে উচ্চশিক্ষা বাদ দিয়ে বাড়ির সকল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। আমার বাড়িই ছিল একটি লাইব্রেরি। অবশ্য আমি কারাগারে যাওয়ার পর লাইব্রেরি বলতে গেলে লুট হয়ে যায়। আমি নতুন করে এটাকে তৈরী করি।
পয়সা যা আসতো, দৈনিক তা নিয়ে বই কেনার জন্য মার্কেটে যেতাম। আমার ঘরোয়া লাইব্রেরী বড় থেকে বড় হতে থাকে। স্ত্রী আমাকে বলত, বই দিয়ে কী করবো আমরা? আমি মজা করেই বলতাম, বই দিয়ে বাড়ির ছাদ পর্যন্ত আটকে দিবো। আমার সন্তানদের জন্ম লাইব্রেরীর ভেতর। বাচ্চাদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমার কর্মপন্থা ছিল, শৈশব থেকে ওরা কাগজের সাথে পরিচিত হবে। এভাবে ওদের মধ্যে কাগজ ও বইয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরী হবে।
আলজাজিরা: লেখা বলতে আপনি আসলে কী বুঝেন বা লেখার সাথে আপনার সম্পর্কটা কেমন?
ড.ইমারাহ: আমি লেখাকে শ্রেষ্ঠ ইবাদাত মনে করি। লাইব্রেরী আমার মিহরাব। আমি মনে করি, নিজের বিশ্বাসের নিকট একনিষ্ঠ হওয়াই মৌলিক বিষয়। মানুষ চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে তার ভুল হতেই পারে। কিন্তু সত্যসন্ধানে সে একনিষ্ঠ কিনা সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান প্রকাশ্য লড়াইয়ের বিরুদ্ধে আমরা অসম যুদ্ধ করছি। সেজন্য আমি তো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মধ্যেই বসবাস করছি। আমার বুদ্ধিবৃত্তিক লেখার বহু বিষয় বছরের পর আমার নিকট পড়ে আছে।
আলজাজিরা: আপনি কাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন? লেখালেখি ও গবেষণার ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি দ্বারা কি আপনি প্রভাবিত হয়েছেন?
ড. ইমারাহ: নৈতিকতা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তি দ্বারা আমি প্রভাবিত হয়েছি। সংস্কারবাদী ধারার মাধ্যমে আমি বেশী প্রভাবিত হয়েছি। বিশেষত জামালুদ্দিন আফগানী ও মুহাম্মাদ আবদুহুর নাম বলবো। আধুনিক যুগে সংস্কার ধারার সূচনা তাদের হাতেই হয়েছে।
মুহাম্মাদ গাজালীর সাথে আমার গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া তার অন্য সব বিষয় আমার খুব ভালো লাগে। যখন বামদের সাথে ছিলাম, ছদ্মনামে চরম বিদ্রুপাত্মক ভাষায় লিখতাম। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদও আমার সমালোচনার জবাব দিতেন। তবে তার রাজনৈতিক ভিউ তার যথাযোগ্য স্থানকে খাটো করেছে। ’আয়িশাহ আব্দুর রহমান’ এর সম্পাদিত ‘রাসাইলু আবিল আলা আল মারি’ থেকে আমি সম্পাদনা শিখেছি।
আলজাজিরা: পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্বারা কি আপনার লেখা প্রভাবিত হয়, লেখার জন্য কি আপনি বিশেষ পরিবেশ বা নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি অনুসরণ করেন?
ড.ইমারাহ: বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মে নিজেকে আমি ডুবিয়ে রাখি। চিন্তার জগতে অবগাহনের কারণে সাধারণত সামাজিক ও রাজনৈতিক কোন ঘটনা দ্বারা আমি প্রভাবিত হই না। আর ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতিকে আমি শিক্ষাজীবন থেকে তালাক দিয়েছি। সংস্কারধারা বিশেষত শায়েখ আবদুহ মনে করতেন, রাষ্ট্রের আগে জাতি। আর শিষ্টাচার ও নৈতিকতার স্থান রাজনীতিরও আগে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যেসকল ইসলামী আন্দোলন রাজনীতি করে, আমি তাদের সমালোচনা করি।
বুদ্ধিবৃত্তিক ব্রত অষুধের মতো। আমি বরং এটাকে প্রাকৃতিক রোগেরও সমাধানের সহায়ক বলে মনে করি। বুদ্ধিবৃত্তিক ব্রত এমন এক মত্ততা, যা জীবনের অস্বস্তিকর অবস্থাকে দূরে রাখে।
আগে কোন ধরনের খসড়া ছাড়াই লিখতাম। এখন আগে মুসাবিদা তৈরী করি, পর্যালোচনা করি, তারপর ফ্রেশ করে লিখি। সকাল থেকে নাস্তা পর্যন্ত এক দফা লিখি। তারপর আবার দুপুরের খাবার পর্যন্ত লিখি। তারপর বিশ্রাম নেই। এরপর আবার লেখায় ফিরে আসি।
আলজাজিরা: আপনি কি আপনার সকল লেখনী নিয়ে সন্তুষ্ট?
ড.ইমারাহ: কিছু বইয়ের পুনঃমুদ্রণ উপকারী নয়। এগুলোর পুনঃবিবেচনা দরকার। ইতোমধ্যে এসবের পুনঃমুদ্রন বন্ধ করা হয়েছে। আমি আমার বইয়ের সারণীতেও এটা বলেছি। কিছু বইতে কিছু সংশোধনী এনে পুনঃমুদ্রিত হয়ে বাজারে আছে।
আলজাজিরা: জীবনে উল্লেখ্যযোগ্য কোন মতাদর্শ থেকে আপনি ফিরে এসেছেন?
ড.ইমারাহ: ধর্মীয় একেশ্বরবাদ ওপরের পিঠ। অপর পিঠ হলো জাতীয় ঐক্য। পূর্বে আমি জাতীয় সংহতির প্রতি গুরুত্ব দিতাম। পরবর্তীতে ইসলামী সংহতিরই আমার মনযোগের পুরোটা দখল করেছে।
আলজাজিরা: আপনার শেষ লেখাগুলোতে কখনো মনে হয়েছে, আপনি সালাফিজমের প্রতি বেশ ঝুঁকে পড়েছেন, আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ড.ইমারাহ: দেখুন, আমি সালাফিয়্যাত নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেছি। মুহাম্মাদ আবদুহ বলতেন, ‘তিনি সালাফী। মতনৈক্যের আগে এই উম্মতের সালাফ যেভাবে দ্বীন বুঝেছে, সেভাবে আমি দ্বীন বুঝতে চাই।’ প্রতিটি মানুষ সালাফী। যার অতীত আছে, সেই সালাফী। কিন্তু আপনার অতীত কী, তা কি আলোকিত যুগ নাকি অন্ধকারযুগ? পূর্বসূরির সাথে আমার আচরণ কেমন? বর্তমানকে পাঠ করতে এবং বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে আপনাকে কিন্তু অতীতের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের নিকট বিভিন্ন ধরণের পূর্বসূরী আছে।
আপনাকে যেহেতু ইসলামী দলগুলোর কাঠামো-উন্নয়নে চিন্তা করতেই হবে। আর এই চিন্তুাই মানুষকে প্রগতিশীল ও সালাফী বানায়। আমি তো আমাকে একই সাথে সংস্কারক, বিপ্লবী, প্রগতিশীল ও সালাফী মনে করি। এসকল নামকরণের মধ্যে আমি কোন বৈপরীত্য দেখি না।
আলজাজিরা: আপনি একই কথা বারবার বলেন বলে কেউ কেউ অভিযোগ করে। কিছু বইয়ের শিরোনাম ভিন্ন কিন্তু বিষয়বস্তু এক?
ড.ইমারাহ: দেখুন বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রাতে পুনরুক্তি আসবেই। ধরুন, স্বতন্ত্রভাবে আমি কিছু লিখছি। অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্য গ্রন্থে প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হয়েছে। বইয়ের কলেবর বড় করার জন্য নয়, বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দাবিতেই অভিন্ন বক্তব্য ও নুসূসের পুনরুক্তি আসে।
আলজাজিরা: আপনার কোন কিতাবগুলোকে মনে হয়, এগুলোতে সত্যিকার অর্থেই বিশেষ সংযোজন আছে?
ড.ইমারাহ: প্রচুর বই আছে। ‘মাআলিমুল মানহাজিল ইসলামী’ , তাইয়ারাতুল ফিকরিল ইসলামী’, ’ফাওযাতুল মুসতালাহাত’। তাছাড়া কুরআন ও সুন্নাহ নিয়ে বিভিন্ন সংশয়খন্ডন, উদারতা, মানবাধিকার ও ইসলামে নারীর স্থান, শিয়া ও সুন্নী, জিহাদ ও ধর্মযুদ্ধ নিয়ে লিখিত গ্রন্থগুলোতে রয়েছে বিশেষ সংযোজন।
আলজাজিরা: আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার উল্লেখ্যযোগ্য দিকটা কী?
ড.ইমারাহ: ইসলাম ও ইসলামের বৈশিষ্ট তথা ‘আকীদা, শরিয়ত ও এর বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো ; সমাজে ইসলামী জাগরণ ; মানুষের জন্য ইসলামী হিদায়েত ; ইসলামের বিশ্বজনীনতা ; সমকালীন উদ্ভুদ সমস্যা ও ইসলামী সমাধান ; ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের প্রকাশ্য লড়াইয়ের বিরুদ্ধে কর্মপন্থা।
আলজাজিরা: জীবনের শেষ সময় এসে মনে হচ্ছে একজন বিপ্লবী মানুষ থেকে আপনি অনেকটা রক্ষণশীল হয়ে পড়েছেন, বিষয়টাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?
ড.ইমারাহ: এটাকে আমি রক্ষণশীলতা বলি না। আমি যখন উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে লিখি, তখন মনে হয় আমি রক্ষণশীল। যখন কথিত ট্রাডিশন ও স্থবিরতা নিয়ে লিখি, তখন আমাকে বিপ্লবী ও প্রগতিবাদী মনে হয়। তবে ইসলাম ও ইসলামী নিদর্শনের পক্ষে লড়াইয়ে আমার অবস্থান স্পষ্ট। ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রসেডের প্রকাশ্য লড়াইয়ের মোকাবেলা করা ও উম্মতকে এই ট্রাপ থেকে বের করে আনাই আমার লক্ষ্য।
আলজাজিরা: পাশ্চাত্যের প্রতি আপনার মধ্যে একধরণের প্রান্তিক মনোভাব আছে বলে অভিযোগ করা হয়?
ড.ইমারাহ: অথচ বিষয়টি একেবারে বিপরীত। ত্রিশ বছর আগে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই নিয়ে লিখেছি। লেখাতে সভ্যতার পারস্পারিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছি। তবে প্রত্যেক সভ্যতার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট তো আছে।
আমি সাইয়েদ কুতুব শহীদের প্রতি মুগ্ধ। তিনি পাশ্চত্যের সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে সম্পর্ক কর্তন করার কথা বলি না। তবে গ্রীক সভ্যতা থেকে পাশ্চাত্য সভ্যতায় আসা পৌত্তলিকতা ও বস্তবাদী দর্শনের বিরোধিতা করি। পাশ্চাত্য সভ্যতা দ্বারা মুসলিম দেশের কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে বিরোধিতা তো থাকবেই।
আলজাজিরা : ইসলামী আন্দোলনগুলোর সাথে আপনার সম্পর্ককে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বিশেষত ব্রাদারহুডের সাথে। ব্রাদারহুড ও শায়েখ কারযাবীর মধ্যে আপনি দুইবার মধ্যস্থতা করেছেন। আপনি তাকে দলের মুরশিদে আম হবার জন্য প্রস্তাবও করেছিলেন?
ড.ইমারাহ : ব্রাদারহুড আমার প্রতি আস্থা রাখে। আমাকে ভালবাসে। ব্রাদারহুডকে বৃহৎ ইসলামী দল বলে মনে করি। বিশেষত বর্তমানে বিভিন্ন দলের মতপার্থক্যের সময়। রাজপথে এরা ছাড়া কোন দল তো নেই। তবে যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে, তাদের সমালোচনা করেছি। নিশ্চয়ই তার মধ্যে ব্রাদারহুডও আছে। এরা সমাজসংস্কার বাদ দিয়ে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করছে। সামাজিক সাম্যের প্রতি তারা মনোযোগ দেয়নি। যদিও হাসান আল বান্না কৃষির সংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন। সমাজ নিয়ে বিপ্লবী পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। শায়েখ গাজালী ও সাইয়েদ কুতুব শহীদ সামাজিক অত্যাচার-অবিচার নিয়ে লিখেছেন। ব্রাদারহুডের সামাজিক সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে ঘাটতি থাকলেও বড় প্লার্টফর্ম হওয়াতে তাদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাদের সহযোগিতা করা দরকার।
