যেমন ছিলেন মুহাদ্দিস রহমতুল্লাহ কাওসার নিজামী

মুসান্না মেহবুব

চট্টগ্রামের প্রবাদপ্রতীম মুহাদ্দিস মাওলানা রহমতুল্লাহ কাওসার নেজামী একদিকে যেমন ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, অন্যদিকে ছিলেন যুগসচেতন এবং জ্ঞানতাপস একজন মহীরুহ আলেম। ছিলেন উর্দুভাষার বরেণ্য পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি হাদিস ও ইলমে নববির খেদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাচীনতম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ইত্তেহাদুল মাদারিসের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও তাহফিজুল কুরআন সংস্থার পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে লিখেছেন মূলবান অসংখ্য গ্রন্থও। গত ১৩ আগস্ট মঙ্গলবার মহীরুহ এ মনীষী আলেমের ইন্তেকাল হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৌখিন ও শাহি মেজাজের অধিকারী ছিলেন মাওলানা রহমতুল্লাহ কাওসার নেজামী। ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও নিয়মানুবর্তিতার পাবন্দ। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের উসমানপুর গ্রামে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন মুফতি আজিজুল হক রহমাতুল্লাহি আলায়হির অন্যতম খলিফা আল্লামা বজলুস সোবহান রহমতুল্লাহ আলায়হি।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। মিরসরাইয়ের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামালপুর হাফেজিয়া আজিজিয়া মাদরাসায় ইবতেদায়ি জামাতে ভর্তি হয়ে জামাতে শরহে বেকায়া পর্যন্ত পড়েন। তারপর ১৯৬৭ সালে পটিয়া মাদরাসায় জামাতে হেদায়ায় ভর্তি হয়ে দাওরা পর্যন্ত পড়েছেন।

১৯৬৭ সালে পটিয়া মাদরাসা থেকে দাওরা শেষ করে ১০ বছর যাবত জামালপুর হাফেজিয়া আজিজিয়া মাদরাসা শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৭ সালে হযরত ইউনুস রহ.-এর ডাকে সাড়া দিয়ে পটিয়া মাদরাসায় পাড়ি জমান। তারপর থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্বনামধন্য একজন লেখক ছিলেন তিনি। উর্দুভাষায় রচিত তাঁর বহু গ্রন্থ বিপুল পাঠক-সমাদৃতি পেয়েছে। বিশেষ করে তারিখে উম্মত খেলাফতে রাশেদা, তারিখে উম্মত খেলাফতে বনি উমাইয়া, হাস্তুমের কিতাবাদির শরাহ, ওলামায়ে হক্কানি ও ইসলামি রাজনীতি, ওয়ারাদাতে কাউসার (কাব্যগ্রন্থ), এবাদুর রহমান, নির্বাচিত হাদিস সংকলন উল্লেখযোগ্য।

খেলাফতে রাশেদা গ্রন্থটি উপমহাদেশে বিপুলভাবে পঠিত। অসংখ্য মাদরাসার ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যতালিকায় কিতাবটি নেসাবের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বিপুল প্রচার ও বিক্রির পরও এর একটি টাকায় তিনি পেতেন না। এ বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আলেম ও মাদরাসা-শিক্ষক মাসুদ চৌধুরী বলেন, গত বছর পটিয়া মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলের দিন হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর রুমে গিয়েছিলাম। বেশ কিছুদিন যাবত আমি খেলাফতের রাশেদা গ্রন্থখানি পাঠদান করি। এত চমৎকার কিতাব, এবং কিতাবের ভাষা ও ইতিহাসের বিবরণ, আমি মূলত এই আকর্ষণ থেকেই তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে যাই। কিতাবের নানা প্রসঙ্গে আলোচনার এক ফাঁকে আমার এক জিজ্ঞাসার জবাবে হুজুর বলেছিলেন, ‘আমি যে বেতন মাদরাসা থেকে পাই তার থেকে এক টাকাও বাড়তি ইনকাম নেই। একটি কিতাব লিখেছি। শুনেছি বাজারে খুব চলে সেটি। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই কিতাব বাবৎ আমি কোন টাকা পাই নি। এটা নিয়ে অভিযোগও নেই, আকাঙ্ক্ষাও নেই। কিন্তু জীবনে কোনদিন এমন হয় নি আমার কোন জিনিসের প্রয়োজন টাকার অভাবে তা নিতে পারি নি। যত দামই হোক ব্যবস্থা হয়ে গেছে। পকেটে হাত দিলে কখনো পকেট থেকে শূন্য হাত উঠে নি, আলহামদুলিল্লাহ।’

পটিয়া মাদরাসার উসতাদ ও হজরতের বিশিষ্ট শাগরেদ মাওলানা সেলিম মাহদী হজরত সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মাওলানা রহমাতুল্লাহ রহ. পটিয়ার এক কোণায় অবস্থান করলেও গোটা পৃথিবীর খবরা-খবর অবশ্যই রাখতেন। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত চোখ রাখতেন। দেশী-বিদেশী অনেক খ্যাতনামা পত্রিকা-সাময়িকী সংগ্রহে রাখতেন। জামিয়ার কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর যিম্মাদার থাকার কারণে আরববিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাধর্মী সাময়িকী এবং পাকিস্তান-ভারত সহ অনেক বিদেশী জার্নাল সর্ব প্রথম তাঁর নিকটেই পৌঁছতেন।’

তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা তাঁর রুমে গেলে পত্রিকার গবেষণাধর্মী আর্টিকেলগুলো আমাদের মাধ্যমে পাঠ করাতেন এবং আমাদের মন্তব্যও যাচাই করতেন। প্রথম প্রথম ভয়ে কোন মন্তব্য না করলেও পরে মন্তব্য করতাম। তিনি সেগুলো শুনে খুশি হতেন। আবার কখনো কখনো শুধরিয়ে দিতেন। আমরা নিরেট সংবাদ কিংবা আর্টিকেলের উপর মন্তব্য করলেও তিনি সংবাদপত্রের মালিক ও তার চিন্তাধারার আলোকে তা মূল্যায়ন করতেন।’

মাওলানা সেলিম বলেন, ‘সংবাদপত্রের সংবাদ কিংবা গবেষকের গবেষণাকে কিভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, তা সর্বপ্রথম তিনিই আমাদের শিখিয়েছেন।’

ইত্তেহাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুবাদে মাওলানা রহমতুল্লাহ বিপুল সংখ্যক মাদরাসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব মাদরাসার পরিচালনা, পরিচর্যা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, যেকোনো ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি বেশ প্রভাবক ভূমিকা পালন করতেন।

মাওলানা সেলিম মাহদী বলেন, ‘মাওলানা রহমতুল্লাহ কাওসার একদিকে যেমন ছিলেন মাদরাসা-পরিচালকগণের পরামর্শগার, অপরদিকে ছিলেন উস্তাদগণের আশ্রয়স্থল। মাদরাসার মুহতামিম ও পরিচালকগণ তাঁর কাছ থেকে সুষ্ঠুভাবে মাদরাসা পরিচালনার জন্য পরামর্শ চাইতেন। তিনি তাঁদেরকে একনিষ্ঠতার সাথে পরামর্শ দিতেন। বর্তমানে যে ক’টি কওমী মাদরাসা, বিশেষত ‘আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিসিল আহলিয়া বাংলাদেশ’-এ তা’লীম-তারবিয়তে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে ‘জামিয়া মাদানিয়া সিলোনিয়া ফেনী, জামিয়া কুরআনিয়া চন্দ্রঘোনা রাঙ্গুনিয়া’-সহ সকল মান-সম্পন্ন মাদরাসার শিক্ষা-দীক্ষা, তালীম-তারবিয়তের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে তাঁর দিক-নিদের্শনার ভূমিকা অনস্বীকার্য।’

সেলিম মাহদী আরও বলেন, ‘হুজুর মাদরাসার মুহতামিম ও পরিচালকগণ সম্পর্কে সবসময় খবরা-খবর রাখতেন। কোনো পরিচালকের বিশেষ কোনো ক্রটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে জ্ঞাত হলে, সেগুলো সংশোধনের উদ্দেশ্যে তা উল্লেখ করা ছাড়া সংশোধনী পেশ করতেন। অনেক সময় ঐ মুহতামিমের কাছে যে দোষ আছে, তা উল্লেখ না করে শুধু বলতেন এখন অনেক মুহতামিম মাদরাসা পরিচালনা করতে গিয়ে এমন এমন আচরণ করছেন। অথচ শারয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বৈধ নয় কিংবা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বর্জনীয়। সেই সম্পর্কে আকাবিরদের কোনো না কোনো ঘটনা উল্লেখ করতেন। আর কোনো মুহতামিমের ভাল আচরণ সম্পর্কে জ্ঞাত হলে তিনি তা উল্লেখ করে তার প্রশংসা করতেন এবং এই ধরণের আচরণ স্থায়ী করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

‘তিনি বলতেন, মাদরাসা মূলত মুহতামিমের চিন্তাধারা বাস্তবায়নের নাম। মুহতামিম পরিকল্পনা করেন, অন্যরা তা বাস্তবায়ন করেন। অতএব, মাদরাসা কেমন হবে তা মুহতামিমের পরিকল্পনা ও মন-মানসিকতার উপর নির্ভর করে। সেজন্য দেখা যায়, যদি মুহতামিমের মনমানসিকতা হয় মাদরাসাকে যিকরের হলকা বানানো, তাহলে সেটি হয়ত ভাল একটি খানকাহ হবে, মাদরাসা নয়। সেখানে যিকিরই প্রধান্য পাবে, তা’লীম নয়। সুতরাং সেখানে পড়া-লেখার মান-উন্নয়ন নিয়ে অতবেশী চিন্তা করে লাভ নেই। আর যদি মুহতামিমের চিন্তাধারা হয়, আমাদের মাদরাসা একটি আদর্শ মাদরাসায় রূপান্তরিত হোক তাহলে সেখানে তা’লীম-তারবিয়ত তথা শিক্ষা-দীক্ষা উভয়টির মান-উন্নয়ন হবে। সেখানে উস্তাদগণ তা’লীমের প্রতি মনোনিবেশ বেশী করেন এবং যে সকল উস্তাদ তা’লীম নিয়ে মেনহত করেন, তাদের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখা হয়। তাদেরকে পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করা হয় এবং তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে, অন্যরাও উৎসাহিত হয় এবং তালীমী কাজে মনোনিবেশ বাড়িয়ে দেন। সুতরাং গোটা মাদরাসায় শিক্ষাবান্ধব একটি পরিবেশ গড়ে উঠে। বোর্ড পরীক্ষায় ছাত্ররা ভাল রেজাল্ট করে। গোটা দেশে মাদরাসার সুনাম ছাড়িয়ে পড়ে। ফলে মেধাবী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেরাও সেখানে ভর্তি হয়। এভাবে ধীরে ধীরে ঐ মাদরাসাটি একটি আদর্শ ও উন্নত মাদরাসায় রূপান্তরিত হয়। তিনি বলতেন, বর্তমানে এমন আদর্শ মাদরাসার সংখ্যা খুবই নগন্য। তবে মাদরাসার পরিচালকগণের ইচ্ছা থাকলে সকল মাদরাসাকেই এমন আদর্শ মাদরাসায় রূপান্তর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র ‘

আগের সংবাদএফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার বিএনপি নেতা তাসভির
পরবর্তি সংবাদপার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করলেন চাকমা নেতারা