যে কারণে প্রচলিত বৈশাখী উৎসব সমস্যাজনক

রাগিব রব্বানি

১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন আজ। পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গায় একশ্রেণির মানুষ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করছেন। পান্তা-ইলিশ ভোজ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ-গান ইত্যাদি বিচিত্র রকমের কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা নববর্ষ ‘উদযাপনে’ ব্যস্ত।

কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এসব আয়োজন-উদযাপনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন না। ওলামায়ে কেরাম এই আয়োজনের বিরোধিতা করে আসছেন দীর্ঘ দিন থেকে। তাঁরা বলছেন, বৈশাখী উৎসবের বর্তমান যে রূপ তা যেমন মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেম্নি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও তা পালনীয় হতে পারে না।

ঠিক কী কারণে প্রচলিত বৈশাখী উৎসব সমস্যাজনক, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম সিলেটের ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুফতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখোশ পরা, বিধর্মীদের পোশাক পরা, নারী-পুরুষ অবাধে মাখামাখি করা—প্রচলিত বৈশাখী উৎসবে এগুলো মারাত্মক সমস্যাজনক। এতে মারাত্মকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে৷ নারীদের শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাও ঘটে, যা আমরা নিকট অতীতে দেখে এসেছি৷

‘তাছাড়া মঙ্গল শোভাযাত্রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি উৎসব৷ তাদের উৎসবে মুসলমানদের অংশগ্রহণের ফলে ঈমান আশঙ্কায় পড়ে যাবে৷ প্রত্যেক ধর্মের ধর্মীয় উৎসব সেই ধর্মের লোকদের জন্য নির্ধারিত৷ অন্য ধর্মের লোকদের সেখানে অংশগ্রহণের প্রশ্নই আসে না৷’

মুফতি জিয়ার এই অভিমতকে আরেকটু বিশ্লেষণ করেছেন রাজধানীর জামিআ ইউসুফ বানুরি রহ. সানারপাড়-এর পরিচালক ও বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আতাউল করীম মাকসুদ।

মাওলানা মাকসুদ বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ নিয়ে বলতে গেলে একটু বিস্তারিত করেই বলতে হয়। আমাদের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, জীবন কীসের নাম? বুদ্ধিমান মাত্রই উত্তরে বলবে, সময়ের নাম। সামান্য কয়েকদিনের সমষ্টি হলো আমাদের জীবন। তারপরেই মহাকালের পথে হারিয়ে যেতে হবে। মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর , যুগ ও শতাব্দী আমাদেরকে ডেকে যায়, সতর্ক করে দিয়ে যায়। একটি বছর শেষ হওয়া মানে জীবনের পুঁজিতে কিছু ঘাটতি হলো। বিবেকবানদের উচিত হিসেব করা। গত বছরের পুঁজি থেকে আহরিত মুনাফা নিয়ে বিশদ আলোচনা-পর্যালোচনা করা। করণীয় ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করা।

‘রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরতের পর সাহাবায়ে কেরামকে দুটি উৎসব পালন করতে দেখতে পান। নাইরোজ ও মেহেরজান। নাইরোজ মানে, বছরের প্রথম দিন আনন্দ উদযাপন করা। রাসুলে কারিম সা. তা সমর্থন করেননি। বন্ধ করে দেন সেই আনন্দ অনুষ্ঠানকে। তার বিপরীতে ইসলাম দিয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। তাই নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোনো অনুষ্ঠান করা ইসলাম সমর্থিত নয়।

‘আজ পহেলা বৈশাখ। নতুন বর্ষ শুরু হয়েছে। কিন্তু বছরের প্রথম দিনে আগামীর করণীয় ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করার পরিবর্তে উল্টো আরও পুঁজি হারাতে বসি আমরা। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া একটি বিষয়কে বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য বলে চালিয়ে দেওয়া সত্যিই অনেকটা হাস্যকর। ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের সংস্কৃতি কীভাবে অনৈসলামিক বিষয় হতে পারে তা কারো বোধগম্য নয়।

‘একটু চিন্তা করলেই স্পষ্ট বুঝে আসে যে, পহেলা বৈশাখের প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মাত্র। অনেকগুলো অনৈসলামিক বিষয় বিদ্যমান তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে। সংক্ষেপে দু-একটি উল্লেখ করছি।

‘প্রথম বিষয় : রমনা বটমূলে গায়ক-গায়িকারা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকে। প্রস্তুত থাকে শ্রোতারাও। সবাই অপেক্ষা করেন কেবল সূর্য ওঠার। সূর্য ওঠার সাথে সাথে গান-বাজনা শুরু হয়ে যায়। এসো হে বৈশাখ এসো… গেয়ে নতুন বর্ষবরণ করা হয়। কবিতার একটি পংক্তি হলো, ‘অগ্নিস্মানে সূচি হোক ধরা’। অর্থাৎ আগুনে গোসল করে পুরো দুনিয়া পবিত্রতা লাভ করুক।

এখানে কয়েকটি বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ। ১. গায়ক-গায়িকাদের উপস্থিতি ভয়ংকর গোনাহ। আল্লাহ তাআলার আজাব-গজব ডেকে আনে। তাদের অনাবৃত দেহ প্রদর্শন করে অনেক যুবক খেই হারিয়ে ফেলে। টিএসসি মোড়ের সেই ঘটনা আমাদেরকে এখনো নাড়া দেয়। বিবেকবান মানুষ ভুলে যায়নি সেই দিনের অসভ্যতার কথা।

‘২. সূর্য় ওঠার অপেক্ষা করে সূর্য পূজারিরা। সূর্য ওঠাকে কেন্দ্র করে নামাজ পড়লে তাদের সাথে সদৃশ্য হয়ে যায় বলে ইসলাম সে সময় নামাজ আদায় করা হারাম করে দিয়েছে। তাই পহেলা বৈশাখের নামে সুকৌশলে আমাদেরকে সূর্যের পূজা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

‘৩. আলোচিত গানটি আমাদের রবি ঠাকুর সাহেবের লেখা। তিনি হিন্দু। প্রার্থনা তাহলে কার কাছে করবেন? দেবতার চরণে তিনি লুঠিয়ে পড়েন। অথচ, মুসলমান সেজদা করে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে। কবির এ গান দ্বারা প্রার্থনা করে মুসলিম জাতিকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে।

‘৪. আগুন দ্বারা দুনিয়া পবিত্র হতে পারে? মুসলিম জাতি সে আকিদায় বিশ্বাসী নয়।

‘দ্বিতীয় বিষয় : মঙ্গল-অমঙ্গলের মালিক হলেন আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা সুরায়ে আলে ইমরানে স্পষ্ট বলেছেন, সকল মঙ্গলের মালিক আল্লাহ। (সুরা আলে ইমরান ২৬) পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় মূলত অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল চাওয়া হয়। প্রশ্ন হলো কার কাছে চাওয়া হয়?

একটু গোড়ার কথা বলি। বিষ্ণু নামে হিন্দুদের একটি দেবতা রয়েছে। তার পত্নী লক্ষীদেবী। তার ছিল পাঁচ কন্যা। পদ্মা, পদ্মালয়, ইন্দিরা, শোভা, কমলা। হিন্দুদের আন্তরিক বিশ্বাস হলো, সকল মঙ্গলের মালিক লক্ষী দেবী। তার বাহন হলো পেঁচা। এজন্য চারুকলার ছেলেরা পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় বিভিন্ন দেব-দেবীর সাথে পেঁচা মুর্তিটিও ঢুকিয়ে দেয়। তাদের আকিদা মতে পেঁচা না এলে মঙ্গল ও কল্যাণ হবে না। (নাউজুবিল্লাহ) মুসলিম জাতিকে সম্পূর্ণ হিন্দু মতবাদে অভ্যস্ত করে তোলার প্রক্রিয়া এসব। মুসলমানরা কখনো বিশ্বাস করে না যে, পেঁচা মঙ্গল ও অমঙ্গলের মালিক। পেঁচার সাথে বাঙালি মুসলিমদের কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রাম-বাংলায় দেখেছি শৈশবকালে পেঁচা কারো গোছের ডালে বসলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাড়ানো একটি প্রাণীর সাথে বাঙালিদের কী সম্পর্ক?

‘তৃতীয় বিষয় : যুবক-যুবতীরা আজ বিভিন্ন অবক্ষয়ের শিকার। তাদের অবাধে মেলা-মেশার কারণে সমাজে অপরাধ প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে যে কয়টা ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার মুল কারণ কিন্তু যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশা। পহেলা বৈশাখে উঠতি মেয়েরা যেভাবে সেজে-গুজে বের হয়, ঘাপটি মেরে থাকা যুবকরা তখন ইভটিজিং, ধর্ষণ ইত্যাদির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদেরকে কোনো শক্তিই প্রতিরোধ করতে পারে না। আখেরাতের ভয় হারিয়ে ফেলা মুসলিম যুব সমাজকে আর কোন শক্তি অপরাধ থেকে বিরত রাখবে? টিএসসি চত্ত্বরের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাদেরকে লজ্জিত করে। তাই অপরাধ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা ও যুব সমাজের চরিত্র রক্ষার স্বার্থে হলেও এই হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার।’

আগের সংবাদনিউজিল্যান্ডের আল-নুর মসজিদের আদলে মুসলিমদের মানব ডিসপ্লে
পরবর্তি সংবাদস্বাধীন সিকিম রাজ্যকে যেভাবে নিজের উদরে পুরেছিল ভারত