
মুসান্না মেহবুব
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ট্রাজেডি। একই সঙ্গে বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প-দুর্ঘটনা হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে এটি। হৃদয়বিদারক এ দুর্ঘটনার ৬ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা বেজে ৪৫ মিনিটের দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামক বহুতল এ ভবনটি অকস্মাৎ ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা নিচের দিকে দেবে যায় আর কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে।
বহুতল এ ভবনটির দ্বিতীয় তলায় বিপণীকেন্দ্রে বহু দোকানপাট ছিল, ছিল ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। আর তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত ছিল পোশাক কারখানা। কারখানায় ৫ হাজারেরও অধিক শ্রমিক কাজ করতেন। ভবন যখন ধসে পড়ে, গার্মেন্টের কাজ ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। খুলে গিয়েছে বিপণীকেন্দ্রের দোকানপাটও। ৫ সহস্রাধিক কর্মী নিবিষ্ট মনে কাজ করছিলেন, ঠিক তখনই ধসে পড়ে ভবনটি। ফলে ১ হাজার ১৭৫ জন কর্মী নিহত এবং দুই হাজারেরও অধিক মানুষ আহত হন।
রানাপ্লাজার অপজিটেই অবস্থিত সাভার বাসস্ট্যান্ড মাদরাসা। ভবন ধসের পর স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি সর্বপ্রথম ছুটে আসেন ওই মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফায়ার সার্ভিস ও সরকারি বাহিনী তখনও আসেনি, তার আগেই তারা লেগে যান উদ্ধার তৎপরতায়।

কওমি গ্রুপের পক্ষ থেকে অর্থসাহায্য এন্ট্রি করছেন মাওলানা এহসান সিরাজ
পরে ফায়ার সার্ভিস ও সরকারি অন্যান্য বাহিনী যোগ দেয় উদ্ধার তৎপরতায়। যোগ দেয় বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা। বাসস্ট্যান্ড মাদরাসার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাজফুলবাড়িয়া মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও টানা কয়েক দিন ধরে মাদরাসার অ্যাকাডেমিক ক্লাস বন্ধ রেখে উদ্ধার তৎপরতায় ওতপ্রোতভাবে কাজ করেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশও সাংগঠনিকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল রানা প্লাজায় হতাহতদের সেবা ও উদ্ধার কার্যক্রমে। স্থানীয় ব্যাংক কলোনী মসজিদের খতিব মাওলানা আশরাফ সাহেবের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম সেখানে অস্থায়ী একটা মেডিক্যাল ক্যাম্পও করেছিল। হতাহতদের সেবায় নগদ অর্থকড়িসহ প্রচুর ঔষধ-সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছিল ক্যাম্পের আন্ডারে। তখন হেফাজতের নাস্তিক্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন পুরোদমে চাঙ্গা। রাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতীয় গণমাধ্যমগুলোও হেফাজত-বিরোধিতায় আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিল। তাই কোনো গণমাধ্যমই হেফাজতে ইসলাম বা ধর্মীয় সমাজের এই মানবতা-দরদ ও স্বেচ্ছাসেবাকে তোলে ধরেনি। এমনটাই বলছিলেন উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া তরুণ আলেম মাওলানা এহসান সিরাজ।

ট্রাজেডিতে নিখোঁজ সন্তানের খোঁজ নিতে আসা এক বেকারার মাকে অনুসন্ধানে সহযোগিতা করছেন মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
এহসান সিরাজ জানান, উদ্ধার তৎপরতায় ধর্মীয় সমাজের ব্যাপক এ অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাসেবাকে উল্টো আরও নেগেটিভভাবে উপস্থাপনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল কোনো কোনো মিডিয়া। বহুল সমালোচিত এক নারী-সাংবাদিক ধর্মীয় সমাজের এ অংশগ্রহণকে উদ্ধার কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টির কারণ হিসেবে ফলাও করেছিলেন তার এক প্রতিবেদনে। এমন নির্লজ্জ ও বানোয়াট প্রতিবেদনের কারণে ওই নারী-সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলের ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল সে-সময়।
কওমিগ্রুপ নামে কওমি ঘরানার ছাত্র-উসতাদদের সমন্বয়ে গঠিত বৃহৎ পরিসরের একটি ফেসবুক-গ্রুপ সেসময় বেশ সক্রিয় ছিল। মাওলানা ইউসুফ সুলতান, মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর, মাওলানা রোকন রাইয়ান ও মাওলানা এহসান সিরাজসহ আরও অনেকে মিলে এই গ্রুপে একটি ইভেন্ট খুলে রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন।
ট্রাজেডির দিন থেকে নিয়ে মাত্র তিন দিনে এ সংগ্রহ তারা জোগাড় করেছিলেন। এবং নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ-পত্র নিয়ে কওমিগ্রুপের পক্ষ থেকে তারা উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মাওলানা এহসান সিরাজ জানান, কওমিগ্রুপ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ব্যতিক্রমীভাবে কাজ করেছিল। ট্রাজেডির পর অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার আওতায় স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছিল। সকলেই আহতদের সেবা-শুশ্রুষা এবং নিহতদের উদ্ধার ও তাদের পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। এর বাইরে আরেকটি অংশ ছিল, নিখোঁজদের আত্মীয়-স্বজন, এই অংশটির খোঁজ কেউ নিচ্ছিল না। অথচ অন্যান্যদের তুলনায় এরা সবচেয়ে বেশি পেরেশানির মধ্যে ছিল। ট্রাজেডির পর রানা প্লাজার আশপাশের এলাকার পরিবেশ পঁচা লাশের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল, এই অবস্থায় হণ্যে হয়ে একদল মানুষ নিজেদের নিখোঁজ আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ করছিল।

নিখোঁজ আত্মীয়ের খোঁজে পেরেশান স্বজনদের সহযোগিতা করছে কওমি গ্রুপ
রানা প্লাজার পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলের মাঠে উদ্ধার করা লাশ এনে এনে রাখা হচ্ছিল। আহতদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল হসপিটালে। নিখোঁজদের স্বজনেরা নিজের স্বজনের আহত/নিহত দেহের খোঁজে একবার হসপিটালে, আরেকবার স্কুল মাঠে–এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছিল। দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে তারা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। খাবার-দাবারেরও কোনো ব্যবস্থা বা খোঁজ ছিল না তাদের।
কওমিগ্রুপ এই অংশটিকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছিল, যেটা আর কেউই করছিল না। বলছিলেন মাওলানা এহসান সিরাজ।
মাওলানা এহসান সিরাজ জানান, ট্রাজেডির কয়েক দিন পর উদ্ধার তৎপরতা পরিদর্শনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা এসেছিলেন। তিনি কওমি গ্রুপের এ উদ্যোগ দেখে খুব আপ্লুত হয়েছিলেন। নিজের পক্ষ থেকে গ্রুপের ত্রাণ ফান্ডে অল্প কিছু আর্থিক অনুদানও দিয়েছিলেন খুশি হয়ে। পরিদর্শন শেষে সেখানে থাকা মিডিয়াকর্মীরা যখন তার সাক্ষাৎকার নেয়, তখন তিনি কওমিগ্রুপের এ কর্মতৎপরতার প্রশংসা করে সাংবাদিকদের তা প্রচার করার ব্যাপারে পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু হেফাজত ইস্যুর বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় মিডিয়া তো তখন পুরো ধর্মীয় সমাজকে ভিলেন বানানোতে ব্যস্ত। তারা সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছে আলেমদের স্বেচ্ছাশ্রমের এসব দৃষ্টান্তকে।
