রুয়ান্ডার ইতিহাস: ১০০ দিনে হত্যা করা হয়েছিল ৮ লক্ষ মানুষ

The remains of people killed in the Rwanda genocide of 1994 lie in a genocide site at the school where they sought refuge from their killers. This was four years after the 1994 genocide in which up to 1 million people were killed. Eric Mencher/Staff Photographer 1998

ফাতেহ ডেস্ক

পঁচিশ বছর আগে, ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে রোয়ান্ডায় ৮ লাখ মানুষ হত্যা করেছিল হুতু চরমপন্থিরা। তাদের শিকার ছিল সংখ্যালঘু টুটসি সম্প্রদায়ের মানুষজন, যারা ছিল তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও।

কীভাবে ওই গণহত্যা শুরু হয়েছিল?
রোয়ান্ডার বাসিন্দাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই হুতু, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে টুটসিরা দেশটির শাসন ক্ষমতায় ছিল।

১৯৫৯ সালে টুটসি রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে হুতুরা। তখন হাজার হাজার টুটসি প্রতিবেশী যেসব দেশে পালিয়ে যায়, তার মধ্যে রয়েছে উগান্ডাও।

নির্বাসিত টুটসির একটি দল বিদ্রোহী একটি বাহিনী গঠন করে যার নাম দেয়া হয় রোয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ)। ওই বাহিনী ১৯৯০ সালে রোয়ান্ডায় অভিযান শুরু করে এবং ১৯৯৩ সালে শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে।

১৯৯৪ সালের ৮ এপ্রিল রাতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা এবং বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সাইপ্রিয়েন নটারিয়ামিনা, যাদের দুজনেই হুতু সম্প্রদায়ের, বহনকারী বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। ওই বিমানে থাকা সব যাত্রী মারা যান।

এই ঘটনার জন্য আরপিএফকে দায়ী করে হুতু চরমপন্থিরা এবং খুব তাড়াতাড়ি মানব হত্যার একটি সুপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ শুরু করে।

আরপিএফের দাবি ছিল, ওই বিমানটিকে গুলি করেছে হুতুরাই, যাতে তারা গণহত্যার একটি অজুহাত তৈরি করতে পারে।

কীভাবে গণহত্যা করা হয়েছে?
অতি সতর্কতার সঙ্গে বিরোধী পক্ষের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকা মিলিশিয়াদের হাতে তুলে দেয়া হয়, এবং তারা গিয়ে তাদের সবাইকে পরিবারের সদস্যদের সহ হত্যা করে।

তখন প্রতিবেশীরা প্রতিবেশীদের হত্যা করেছে। এমনকি অনেক হুতু স্বামী তাদের টুটসি স্ত্রীদের হত্যা করেছে, কারণ তাদের দাবি, না হলে তাদের হত্যা করা হতো।

সেই সময় প্রত্যেকের পরিচয় পত্রে গোত্রের নাম উল্লেখ থাকতো।

ফলে মিলিশিয়ারা রোড ব্লক বসিয়ে পরিচয় পত্র যাচাই করতো এবং টুটসিদের হত্যা করতো। বেশিরভাগ সময় এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে ধারালো ম্যাচেটি (ধারালো ছুরির মতো) দিয়ে, রোয়ান্ডায় যা প্রায় সবার ঘরেই থাকে।

হাজার হাজার টুটসি নারীকে আটক করে যৌন দাসী করা হয়।

কেন এটা এত পাশবিক হয়ে উঠেছিল?
রোয়ান্ডার সমাজ সবসময়েই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, যার প্রশাসনিক কাঠামোকে অনেকটা পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সরকারের উঁচু মহল থেকে প্রতিটি জেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হয়।

তখনকার সরকারি দল, এমআরএনডির একটি যুব শাখা ছিল – যাদের বলা হয় ইন্টেরাহামায়ি – যারা পরবর্তীতে মিলিশিয়ায় রূপ নেয় এবং যারা বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে।

স্থানীয় গ্রুপগুলোর হাতে অস্ত্র এবং হিট-লিস্ট তুলে দেয়া হয়, যারা ভালোভাবে জানতো যে এসব মানুষকে কোথায় পাওয়া যাবে।

হুতু চরমপন্থিরা একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করে, যার নাম ছিল আরটিএলএম। ওই বেতার কেন্দ্র এবং পত্রিকার মাধ্যমে বিদ্বেষ মূলক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো, মানুষজনকে ‘তেলাপোকা’ হত্যা করার জন্য বলা হতো, যার মানে টুটসিদের হত্যা করা বোঝানো হতো।

যেসব নামী ব্যক্তিদের হত্যা করা হবে, তাদের নাম ওই রেডিওতে পড়ে শোনানো হতো।

এমনকি চার্চের যাজক এবং নানদের বিরুদ্ধেও হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে, যাদের শিকার অনেক মানুষ সেসব চার্চে আশ্রয়ের জন্য গিয়েছিলেন।

১০০ দিনের হত্যাযজ্ঞে আট লাখ টুটসি আর প্রগতিশীল হুতুদের হত্যা করা হয়।

কেউ কি ওই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল?
রোয়ান্ডায় জাতিসংঘ এবং বেলজিয়ামের সৈন্য ছিল, কিন্তু গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘ মিশনকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি।

একবছর আগেই সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা নিহত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আর কোন আফ্রিকান জাতির লড়াইয়ের মধ্যে ঢুকতে রাজী ছিল না।

দশজন বেলজিয়ান সৈনিক নিহত হওয়ার পর বেলজিয়ামের সব সৈন্য এবং জাতিসংঘের বেশিরভাগ সৈনিককে রোয়ান্ডা থেকে সরিয়ে আনা হয়।

হুতু সরকারের বন্ধু ফরাসিরা তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্য একটি বিশেষ সেনাদল পাঠায়। তারা পরবর্তীতে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করলেও অভিযোগ রয়েছে যে, ওই এলাকায় গণহত্যা বন্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।

রোয়ান্ডার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, তারা গণ হত্যাকারীদের মদদ দিয়েছে, যদিও প্যারিস ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

কীভাবে এর শেষ হয়েছিল?
সুসংগঠিত বাহিনী আরপিএফ উগান্ডার সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্রমেই রোয়ান্ডার বেশিরভাগ এলাকা দখল করে নেয়। ১৯৯৪ সালের ৪ঠা জুলাই এই বাহিনী রাজধানী কিগালির উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করে।

তখন প্রতিহিংসার ভয়ে প্রায় ২০ লাখ হুতু-যাদের মধ্যে বেসামরিক লোকজন এবং গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরাও ছিল- সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় আশ্রয় নেয়। তখন দেশটির নাম ছিল জায়ার। অনেকে প্রতিবেশী তানজানিয়া এবং বুরুন্ডিতে আশ্রয় নেয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর আরপিএফ যোদ্ধারা হাজার হাজার বেসামরিক হুতু বাসিন্দাকে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে কঙ্গোয় মিলিশিয়াদের ধরতে অভিযান চালানোর সময় আরো অনেক মানুষকে হত্যা করে। তবে আরপিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

কঙ্গোয় যারা আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সাহায্য সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তাদের সহায়তার বেশিরভাগই হুতু মিলিশিয়াদের হাতে পড়েছে।

কঙ্গোর ক্ষেত্রে কী হয়েছিল?
কঙ্গোর সেনাবাহিনী আর হুতু মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যে বাহিনীগুলো যুদ্ধ করছিল, তাদের সহায়তা করতে শুরু করে রোয়ান্ডার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আরপিএফ।

রোয়ান্ডার সহায়তা পুষ্ট বিদ্রোহীরা কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসায় অভিযান শুরু করে এবং মোবুতু সেসে সেকো সরকারকে উৎখাত করে লরেন্ট কাবিলাকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতায় বসানো হয়।

কিন্তু নতুন প্রেসিডেন্ট হুতু মিলিশিয়াদের দমনে ঢিলেমি করায় নতুন আরেকটি যুদ্ধের শুরু হয়, যাতে জড়িয়ে পড়ে ছয়টি দেশ। বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী খনিজ সম্পদ পূর্ণ দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য লড়াই শুরু করে।

২০০৩ সাল পর্যন্ত চলা ওই লড়াইয়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়। এখনো রোয়ান্ডা সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

কারো কি বিচার হয়েছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ২০০২ সালে, যার অনেক আগে রোয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এজন্য দায়ীদের বিচার করতে পারবে না এই আদালত।

তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ওই হত্যাযজ্ঞের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিচারের জন্য তানজানিয়ার শহর আরুশায় একটি আদালত স্থাপন করে যার নাম ‘রোয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’।

লম্বা এবং ব্যয়বহুল বিচারের পর গণহত্যার জন্য এ পর্যন্ত ৯৩জনের বিচার হয়েছে, যাদের অনেকেই ছিলেন হুতু সরকারের আমলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাদের সবাই হুতু সম্প্রদায়ের।

গণহত্যায় অভিযুক্ত লক্ষাধিক ব্যক্তির বিচার দ্রুত করার জন্য রোয়ান্ডা সামাজিক আদালত তৈরি করে, যার নাম গাসাসা।

সংবাদদাতারা বলছেন, বিচার শুরু হওয়ার আগেই অন্তত ১০ হাজার অভিযুক্ত কারাগারে মারা গেছে।

২০১২ সাল পর্যন্ত ১২ হাজার গাসাসা আদালত বসেছে। সাধারণত বাজার বা কোন গাছের নীচে এসব আদালত বসে, যারা প্রায় ১২ লাখ মামলার বিচার করার চেষ্টা করছে।

তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্য বের করা, বিচার এবং পুনর্মিলন ঘটানো। রোয়ান্ডান ভাষায় গাসাসা মানে হচ্ছে একত্রে বাসা এবং আলোচনা করা।

রোয়ান্ডার বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?
ছোট্ট ও বিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠনের জন্য অভিনন্দন পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট কাগামে। তার নীতির কারণে দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তিনি রোয়ান্ডাকে একটি প্রযুক্তিগত কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেও টুইটারে সক্রিয়।

তবে তার সমালোচকরা বলেন, তিনি বিরোধিতা সহ্য করতে পারেন না। দেশে বিদেশে তার বেশ কয়েকজন বিরোধী অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেছেন।

গণহত্যার বিষয়টি এখনো রোয়ান্ডায় খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয় এবং জাতি বা গোত্র নিয়ে কথা বলা বেআইনি।

সরকার বলছে, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ছড়ানো বন্ধ করা এবং রক্তপাত বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য, যদিও অনেকে বলেন এর ফলে আসলে সঠিক পুনর্মিলন হচ্ছে না।

মি. কাগামের বেশ কয়েকজন সমালোচকের বিরুদ্ধে গোত্রগত বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাদের কোণঠাসা করার জন্যই এসব অভিযোগ।

২০১৭ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যে নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ৯৮.৬৩ শতাংশ ভোট।

আগের সংবাদইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরেই সিলেটি তরুণদের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ
পরবর্তি সংবাদখালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির গণঅনশন