
রাকিবুল হাসান
ডয়েচে ভেলের একটা সংবাদ পড়ছিলাম। শিরোনাম : ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৩ রোহিঙ্গা ‘সন্ত্রাসী’ নিহত। কোনো শব্দকে কোটেশনে আবদ্ধ করে দিলে মর্ম খানিকটা পালটে যায়। চেনা অর্থের বাইরে অচেনা অর্থ কিংবা নিশ্চিত কোনকিছুকে সন্দেহের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়া। রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে এই পর্যন্ত যতজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, আসলেই এগুলো বন্দুকযুদ্ধ ছিলো নাকি বন্দুকযুদ্ধ বলে চালিয়ে দেয়া? আসলেই কি তারা সন্ত্রাসী না সন্ত্রাসী বলে পাঠককে খাইয়ে দেয়া?
খবরটা পড়ে কমেন্টবক্সে উঁকি দিলাম। একজন লিখেছে, ‘সব মাইরা ফেলে না কেন? যেদিন দেখবো সকালের পত্রিকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ বিস্ফোরণে হাজারের অধিক প্রাণহানি হয়েছে, সেদিন মনটা শান্তি পাবে।’ আরেকজন লিখেছে, ‘একদম ঠিক করেছে। আরও বেশি করে মারা উচিত ছিলো। ৩০ জন কম হয়ে গেছে।’ আরেক পাঠক লিখেছে, ‘আরও বেশি মারা উচিত ছিলো।’ আরেক পাঠকের মন্তব্য, ‘প্রতিদিন একটা করে মারতে থাকুন।’
এই কমেন্টবক্সের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়, পুরো রোহিঙ্গা জাতির প্রতি কেমন তীব্র জাতিবাদী ঘৃণা লালন করছি আমরা। অপরাধ কিন্তু সবাই করে না, করে দু’একজন। ওই দু’একজনের অপরাধ পুরো অসহায় রোহিঙ্গা জাতির প্রতি চাপিয়ে দিয়ে আমরা এখন মারণনেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছি। ওদেরকে মেরেকেটে ভাসিয়ে দিতে পারলেই যেন শান্ত হয়ে যাবে দেশ, বোঝা নেমে যাবে মাথার ওপর থেকে।
আসলে এই জাতিবাদী ঘৃণা জিনিসটা কী? সহজভাবে বললে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যখন শুধুমাত্র নিজের জাতির উন্নতি কামনা করে, নিজের দেশ, জাতি, ভাষা কিংবা পতাকা নিয়ে গর্ব বোধ করে, অন্যান্য দেশ ও জাতিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিচার করে, অন্য জাতিকে ঘৃণা করে কিংবা কম ভালোবাসে–যদিও তারা মুসলিম হয়–তাকেই বলে জাতিবাদী ঘৃণা। রোহিঙ্গাদের প্রতি আমরা এই ঘৃণাটাই লালন করছি।
এই ঘৃণাটা একদিনে একদিনে তৈরি হয়নি। আমরাই কিন্তু একদিন ওদের জায়গা দিয়েছিলাম। নিজের পাতের লোকমা তুলে দিয়েছিলাম ওদের মুখে। রোহিঙ্গারা যখন যাবার জন্য প্রস্তুত, দফায় দফায় প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারিত হচ্ছে, তখনই কেন এই ঘৃণার এমন তীব্র প্রকাশ?
তারা চলে যেতে চায়। চলে যেতে হলে তার কী ব্যবস্থা হতে পারে, তাদের চলে যাবার দাবি কিভাবে আরও পোক্ত হতে পারে, কিভাবে চাপ সৃষ্টি করে ওদের ভূমি ওদের ফিরিয়ে দেয়া যায়—এইসব আলোচনা না করে মিডিয়া ঘৃণা ছড়াচ্ছে। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা টাইমলাইনে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। ফিরে যাবার সহায়তা না করে ঘৃণা উসকে দিচ্ছে কেন?
আসলে সাম্রাজ্যবাদীরা রোহিঙ্গাদের তাদের ভূমি থেকে বের করে এনেছে এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার জন্য। তাদের দিয়ে আরও খেলা বাকি আছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গারা যদি একজন নেতা ঠিক করে, সমাবেশ করে নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার দাবি তুলে নিজেরাই, সেটা সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য একটা থ্রেট। অপরদিকে মায়ানমার এতদিন যে কাজগুলো (একত্রিত হওয়া, নেতা ঠিক করা) করতে দেয়নি, সেটা যদি তারা করতে পারে, তবে অবশ্যই এটা রোহিঙ্গাদের অনেক বড় একটি অর্জন। এক্ষেত্রে সবচে বেশি দরকার আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। সহযোগিতা না পেলে রোহিঙ্গারা কিছুই করতে পারবে না। তাই রোহিঙ্গারা যেন বাংলাদেশের সহযোগিতা পেতে না পারে, সেজন্য একটি মহল বাংলাদেশিদের মনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। ‘ত’ কে ‘তাল’ বানিয়ে গেলাচ্ছে মানুষদের। এই ঘৃণার পেছনে সবচে তপ্ত লাভা উদগীরণকারী অভিযোগ—রোহিঙ্গাদের স্বভাব চরিত্র ভালো না। ওরা অসভ্য। আমাদের ‘সাধু মিডিয়া’ দিনরাত চিৎকার বলছে, ‘রোহিঙ্গারা ডাকাত, মাদক চালানকারী। বাংলাদেশ দখল করতে চায় তারা।’ কেউ যখন শুনবে শরণার্থীরা দেশ দখল করতে চায়, ঘৃণা তো জন্মাবেই বৈকি!
রোহিঙ্গারা অপরাধ করছে না, এমন নয়, করছে। কিছু লোক করছে। কিন্তু সেই মুষ্ঠিমেয় লোকের অপরাধের কারণে পুরো জাতিকেই দোষী ভাবা অন্যায়। জাতিগতভাবে কোনো গোষ্ঠী অসভ্য হতে পারে না, পরিবেশ ও পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে অসভ্যতা তৈরি করে। যে পরিবেশ থেকে রোহিঙ্গারা উঠে এসেছে, যুগের পর যুগ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত করছে, অশিক্ষা ও দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তাদের স্বভাব অবশ্যই সভ্য সমাজের স্থিতিশীলতার সাথে মিলবে না। রুক্ষতা, ছিনিয়ে নেয়া, রেগে যাওয়া এইসব তাদের স্বভাবে থাকবেই। আমরা যারা সভ্য, এতটুকু ‘সভ্যতা’ আমাদের বোঝা উচিত।
মিডিয়া হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের গোলাম। সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই ক্রমাগত ঘৃণার বাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদেরকে সত্যিটা বুঝে উঠতে দিচ্ছে না। কারণ বুঝে উঠলেই তো সমস্যা। কেননা ইসলাম ধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্মের অনেক জাতি কম জনসংখ্যা আর কম নির্যাতিত হয়েও পৃথক ভূমির দাবি আদায় করছে। এক্ষেত্রে অন্য ধর্মের জাতিগুলো তাদের জাতিভেদ দ্বন্দ্ব ভুলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করেছিলে বলেই পৃথক ভূমি লাভ করতে পেরেছে। কিন্তু মুসলমানরা জাতিগত দ্বন্দ্ব ও ঘৃণার কারণে এটা পেরে ওঠে না।
এই জাতিবাদী ঘৃণা এক মারাত্মক রোগ। এর কারণে ইসলামের একটি মূলনীতি ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ’ সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ’-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা। একজন মুসলিমের প্রতি আরেকজন মুসলিমের ভালোবাসা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী কাফির-মুনাফিকদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। কোনো পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়। কিন্তু জাতিবাদী ঘৃণা মুসলিমদের এই সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তৈরি করে দেয়। ভিনদেশের মুসলিমকে তখন আর আপন ভাবা যায় না। অন্যদিকে নিজ দেশের আল্লাহদ্রোহীর প্রতিও সহানুভূতি চলে আসে।
.
দ্বিতীয়ত, জাতিবাদী ঘৃণা মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একজন মুসলিমের কষ্টে সমস্ত পৃথিবীর মুসলিমের অন্তরে কষ্ট অনুভূত হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। অথচ জাতিবাদী ঘৃণা আমাদের সেই অনুভূতি নষ্ট করে দেয়। নিজ দেশের কিংবা নিজ জাতির মানুষ সুখে থাকলেই আমরা খুশি। আর এরূপ স্বার্থপরতাই হচ্ছে জাতিবাদী ঘৃণার মূল শিক্ষা।
তৃতীয়ত, জাতিবাদী ঘৃণা ন্যায়-অন্যায় বোধকে নষ্ট করে দেয়। জাতিবাদী ঘৃণার দাবিই হলো–নিজের জাতিকে সাহায্য করা হবে যদিও সে অন্যায় করে এবং অন্য জাতিকে সাহায্য করা হবে না, যদিও তারা নিরপরাধ হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা হবে যদিও সে নিজ সম্প্রদায় কিংবা নিজ দেশের নাগরিক হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের আচরণ এই জাতিবাদী ঘৃণার উলঙ্গ প্রকাশ।
তাই এখন আমাদের ভাবা দরকার—সরকারি বন্দীশিবিরে নয়, তাদের ভূমিতে কীভাবে নিরাপত্তার সাথে তাদের ফিরিয়ে দেয়া যায়। আমরা মারলেই যে তারা চলে যাবে, বিষয়টা এমন না। বরং তাদের পাশে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়াতে হবে। তারা যেহেতু একত্রিত হয়েছে, তাদের কণ্ঠেই এখন তাদের ফিরে যাওয়ার দাবি তীব্র করে তুলতে হবে। এতদিন বাংলাদেশ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতনের কথা বলেছে। এখন তাদের দিয়ে প্রত্যাবাসন ও নাগরিক সুবিধা দেয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে দাবি তোলা হোক। তাহলেই তাদের প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত হবে।
