মুসান্না মেহবুব:
মিয়ানমার থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পগুলোতে একশ্রেণির রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে অস্থিরতা বাড়ছে। গত মাসেই কেবল আভ্যন্তরীণ বাদানুবাদসহ পাঁচটির মতো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে। তবে অপরাধবিজ্ঞানী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণসহায়তায় তৎপর একাধিকজন বলছেন, রোহিঙ্গাদের এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র, দেশি-বিদেশি কিছু চক্র এই অস্থিরতার পেছনে মদদ দিয়ে যাচ্ছে।
র্যাবের একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, মাদক পণ্য ইয়াবা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি অপরাধী গ্যাং গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তৎপর হাকিম ডাকাত গ্যাং, জকির গ্রুপ এবং সলিম গ্রুপ।
গেল ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পে এরকম দুটো গ্রুপের আভ্যন্তরীণ বিবাদের জেরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত হয়েছে।
১৯ ডিসেম্বর টেকনাফের স্থলবন্দর এলাকায় একজন রোহিঙ্গা এবং ২১ ডিসেম্বর উখিয়ায় দুজন রোহিঙ্গা র্যাব ও বিজিবির তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। র্যাব ও বিজিবির ভাষ্য, বন্দুকযুদ্ধে নিহত এই তিনজন ইয়াবা পাচারসহ নানাধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল।
সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বর নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে রোহিঙ্গা ডাকাত গ্যাংয়ের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে এক রোহিঙ্গা নিহত এবং দুজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন।
অপরাধীরা অস্ত্র ও শক্তি পাচ্ছে কোথা থেকে?
যে সমস্ত রোহিঙ্গা গ্যাং অপরাধের সঙ্গে জড়িত, এরা অস্ত্র ও শক্তির জোগান কোথা থেকে পাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব ১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, গত তিরিশ বছর ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে। যাদের বয়স তিরিশের নিচে এদের মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা আছে যাদের জন্মই বাংলাদেশে। তারা অন্যান্য অনেক বাংলাদেশিদের মতো অপরাধের সাতে জড়িত। বাংলাদেশি যারা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের সাথেও এদের সম্পর্ক রয়েছে।
কক্সবাজারে সবমিলিয়ে ৩৩ টি রোহিঙ্গা শিবির রয়েছে যেখানে এগারো লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস। বিশ্বের সবচাইতে বড় শরণার্থী শিবির এখন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প।
র্যাবের কর্মকর্তা উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলছেন, এর মধ্যে নয়াপাড়া ক্যাম্পে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসী কার্যক্রম হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, রোহিঙ্গারা ইয়াবা চোরাচালান ছাড়াও মানব পাচার ও ডাকাতি সহ নানা ধরনের অপরাধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও অপরাধের সঙ্গে কীভাবে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা?
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোকে ঘিরে নিরাপত্তার কাজে জড়িত রয়েছে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। একসঙ্গে এতগুলো বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কিভাবে একশ্রেণির রোহিঙ্গা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, সব জায়গায় পাহারা শক্ত নয়। এখানে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে তারা পাহাড়ে থাকে। পাহাড় থেকে নেমে এসে এই কাজগুলো করে। তারা ক্যাম্পে অবস্থান করে না।
তিনি আরও বলছেন, ক্যাম্পগুলোর চারদিকে খোলা, ফলে ইচ্ছে করলেই যে কেউ কোনো কোনো দিক দিয়ে বের হতে ও ঢুকতে পারে। এই সুযোগটা অনেক সময় ওরা নেয়।
তিনি বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরের অবস্থা তুলনা করে বলেন, আপনি যদি বিশ্বের অন্যান্য যায়গায় যে ক্যাম্পগুলো আছে সেগুলো একটা সংরক্ষিত যায়গায় থাকে। চারদিকে বেড়া থাকে। বিভিন্নভাবে তাদের আটকানোর একটা ব্যবস্থা আছে। আমাদের সেটা নাই।
অপরাধবিজ্ঞানী ও ত্রাণসহায়তায় নিয়োজিতদের বিশ্লেষণ
রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তায় গত দুই বছর ধরে তৎপর আলেম মাওলানা গাজী ইয়াকুব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাপনে বড় ধরনের বিঘ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাপারগুলো সত্য। তবে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত, যে জনগোষ্ঠী শতাব্দীর নৃশংসতম নির্যাতনের কবল থেকে বেরিয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক ও তাহজিব-তামাদ্দুনের দিকটা খুবই বিপর্যস্ত। তাদের সিংহভাগই নিতান্তই অক্ষরজ্ঞানহীন। এরা দীর্ঘ একটা সময়, প্রায় ৬০ বছরের মতো অনেকটা বন্দীর মতো জীবনযাপন করেছে মিয়ানমারে। নিজের ভূমিতে নিজেরা কারাগারবাস করেছে। পাঁচ কিলোমিটার সীমানার বাইরে তাদের যাতায়াত নিষিদ্ধ ছিল। সরকার নাগরিকত্ব তো কেড়ে নিয়েছেই, উপরন্তু শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা তাহজিব তামাদ্দুন চর্চার নূনতম সুযোগ দেয়নি৷ ফলে এদের ৮০ ভাগ মানুষই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর ধরে মূর্খতার ভেতর বাস করছে। মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়, এটা তাদের অজানা। অশিক্ষার এই আধারই রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে।
প্রায় একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান, যিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এমন একটা জায়গা থেকে এসেছে, এমন একটা নির্যাতন, নিপীড়নের মধ্যে থেকে এসেছে যে সাইকোলজিক্যালি তারা এক ধরনের কনফ্লিক্ট ক্যারি করে। তাদের মধ্যে অনেক ধরনের ট্রমা ডিপ্রেশন কাজ করে। এই ধরনের নেগেটিভ ইমোশন থাকলে আনুপাতিক হারে সেখানে অপরাধ বেশি হবেই। আপনি যদি ১৯৩০ সালের শিকাগোর ইতিহাস পড়ে দেখেন, সেখানেও একই জিনিস ঘটেছিলো। সেখানে ইমিগ্র্যান্টরা আসার পরে তাদের এত নেগেটিভ ইমোশন্স ছিল যে সেখানে ক্রাইম রেট বেড়ে গিয়েছিলো।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। মিয়ানমারেও সেটা হয়েছে, বাংলাদেশেও কখনো রাজনৈতিক গেইন আবার কখনো অর্থনৈতিক কারণে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার বিষয়টাকে আরেকটু খোলাসা করে বলেছেন গাজী ইয়াকুব। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে কিছু এনজিও সংস্থা ও দেশীয় দুষ্ট চক্রের পৃষ্ঠপোষণ ও ইন্ধন রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম ভাঙিয়ে বহির্বিশ্ব থেকে শত শত কোটি টাকা ত্রাণ সহায়তা নিয়ে আসছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান। এসব টাকার কত পার্সেন্ট খরচ করা হয় রোহিঙ্গাদের পেছনে? অল্পকিছু খরচ করে বাকি বিশাল অংকের এমাউন্ট পকেটে ঢুকে ওই সব এনজিও’র হর্তাকর্তাদের। তাই তারা চায় রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে রাখতে। আর এজন্য এদেরকে অশান্ত করে তুললে মিয়ানমার সরকার এদেরকে ফেরত নেবে না, সংকট দীর্ঘায়িত হবে। তাদেরও পকেটে ঢুকতে থাকবে বিদেশি ডলার।
