লাফিয়ে বাড়ছে বিজেপির ভারতের বাংলাদেশি হত্যা

মুসান্না মেহবুব

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার জুড়ে ব্যাপৃত। বাংলাদেশকে মোটামুটি তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে বিশাল এই রাষ্ট্রটি। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমাদেরকে বন্ধুরাষ্ট্র বলে আসছে ভারত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা বাদ দিলে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে বন্ধুপ্রতীম আর কোনো আচরণ করেছে বলে মনে হয় না। সীমান্তের আচরণে উল্টো আরও শত্রুতারই প্রমাণ দিয়ে আসছে রাষ্ট্রটি।

ভারতের নেপাল ও ভুটান সীমান্তে এসএসবি নামের সাধারণ একটি ফোর্স মোতায়েন থাকলেও বাংলাদেশ সীমান্তে তারা মোতায়েন রেখেছে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ভারি অস্ত্রে সজ্জিত বিএসএফ বাহিনী। যেমনটা তাদের শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েন আছে।

সীমান্তে চোরাচালান এবং বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী এই ফোর্সকে বিতর্কিত শ্যুট-অন-সাইটের (দেখামাত্র গুলি) অর্ডার দেওয়া আছে দেশটির কেন্দ্রীয় অথরিটি থেকে। এই অর্ডারের ভিত্তিতে কয়দিন পরপরই সীমান্তে নির্বিচার গুলি করে হত্যা করে বাংলাদেশি নাগরিকদের। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে চলতি শতাব্দীতে, অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ অবধি প্রায় দেড় হাজার বাংলাদেশিকে গুলিসহ নানা কায়দায় নির্বিচার হত্যা করেছে বিএসএফ।

শুধু গুলিই নয়, কোনো কোনো সময় গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পে নিয়ে ভয়ানক মাত্রার নির্যাতনও চালায় পাষণ্ড এই বাহিনী।

২০১৪-তে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর হত্যা এবং পাশবিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগের বছর, ২০১৩-তে সীমান্তহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৯ জন বাংলাদেশি। বিজেপির ক্ষমতারোহণের বছর, ২০১৪-তে এই সংখ্যা বেড়ে ৩৩ জনে দাঁড়িয়েছিল। ১৫-তে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৫ জনে। ২০১৬ ও ১৭ সালে প্রাণ হারিয়েছেন যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ জন। ২০১৮-তেও প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৪৩ জন বাংলাদেশি। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন বাংলাদেশি। আর চলতি জুন মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ জন।

পাশবিক অত্যাচারের মুখোমুখিও হতে হয়েছে অনেককে। এই তো গত এপ্রিলে নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত থেকে আজিম উদ্দীন নামের এক বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার দুই হাতের দশ আঙুলের নখ উপড়ে ফেলেছে। কদিন পরপরই শোনা যায় এরকম নির্মম নির্যাতনের খবর।

আজিম উদ্দিনের হাতের সবগুলো নখ উপড়ে নিয়েছিল বিএসএফ

ভারতের মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সাধারণ সম্পাদক কিরিটি রয় সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা ভারতীয় আইনে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷ কিন্তু বিএসএফ হত্যা করছে এবং তারা এর জন্য বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেনা৷ তাদের ইমপিউনিটি দেয়া হচ্ছে৷ তারা ট্রিগার হ্যাপি৷’

নতুন সরকারের সময়ে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভারতের এ সরকার নতুন নয়, পুরনো সরকার৷ একই সরকার৷ আমি দুর্ভাগ্যজনক হলেও একজন ভারতীয় হিসেবে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, বাংলাদেশ একটি বন্ধু রাষ্ট্র হলেও যেহেতু এখানে মুসলমানরা বেশি, তাই তারা বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র মনে করে না৷ আর এজন্যই বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) আছে৷ কিন্তু নেপাল বা ভুটান সীমান্তে কোনো বিএসএফ নেই৷ সেখানে আছে এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)৷’

তিনি বলেন, ‘১৯৬৮ সালে বিএসএফ-এর জন্ম৷ পাকিস্তান সীমান্তেও বিএসএফ আছে৷ একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হলো৷ শেখ মুজিব সরকারের সময়ই থেকেই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক, খালেদা জিয়া সরকারের সময় ভালো সম্পর্ক ছিলো৷ হাসিনা সরকারের সময়ও সুসম্পর্ক৷ কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএসএফ-ই আছে৷ সীমান্তে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হত্যা চলছে৷ ধর্ষণ চলছে৷’

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, ‘বিএসএফ-এর যে সকল সদস্যকে বাংলাদেশের সীমান্তে নিয়োগ দেয়া হয় তারা বাংলা ভাষা বোঝেন না৷ সময়ে সময়ে পাকিস্তান সীমান্ত থেকে এনে তাঁদের বাংলাদেশ সীমান্তে দায়িত্ব দেয়া হয়৷ যাদের মধ্যে উগ্রতা আছে৷ লক্ষ্যনীয় যে, পাকিস্তান সীমান্তে দায়িত্ব পালনের সময়ও কিন্তু তারা এতটা উগ্রতা দেখায় না, যেটা বাংলাদেশ সীমান্তে তারা করে থাকে৷ তারা হয়তো সামরিক শক্তির সামর্থ্য বিবেচনা করে৷’

তিনি বলেন, ‘ভারতে আরেকটি নির্বাচন হলেও এখনো কিন্তু সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমছে না৷ নিরীহ বাংলাদেশিদেরকে হত্যা করা হচ্ছে৷ বার বার সীমান্ত হত্যাকান্ড বন্ধে ভারতের সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিএসএফ কিন্তু তা আমলে নিচ্ছে না৷ এখানে আসলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার অনে ফারাক আছে৷’

তিনি বলেন, ‘ভারত যে আন্তরিক নয় তা বিএসএফ-এর মহাপরিচালকের কথায়ই বোঝা যায়৷ তিনি সীমান্ত হত্যায় উদ্বেগ ও দু:খ প্রকাশ করছেন, আবার বলছেন বাধ্য হয়ে গুলি ছুড়ছে৷ আসলে সীমান্তে চোরাচালানই বড় ঘটনা৷ এর জন্য গুলি করার কোনো দরকার নেই৷ আমরা বলছি, অপরাধ করলে আটক করো৷ কিন্তু তারা গুলিতেই সামাধান বেছে নিয়েছে৷’

আগের সংবাদবরগুনায় হত্যার ঘটনায় সরকার দ্রুত সুষ্ঠু বিচার করবে: আইনমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাদরাসার ছাত্ররা ঠিক কী করেন?