লাস্ট জেনারেশন: ইজরাইল যেভাবে খৃস্টানদের বিতাড়িত করছে

লাস্ট জেনারেশন: ইজরাইল যেভাবে খৃস্টানদের বিতাড়িত করছে

মুজাহিদুল ইসলাম :

ফিলিস্তিন খোলা আকাশের এক কারাগার। একটু পরপর নিরাপত্তা চৌকি। চারপাশে মোটা কংক্রিটের দালান। কারাগারের একমাত্র প্রশাসক বা কর্তা ইহুদিরা। মুসলিম ও খৃস্টান বন্দী। এখানে নবি হজরত ঈসা আলায়হিস সালামের জন্মস্থান। তাঁর জন্মস্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম গির্জা। বড়দিন উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে আসছে বহু মানুষ। কিন্তু তাদের মনে দুই হাজার বছর আগের নবি হজরত ঈসা আলায়হিস সালামের জন্মস্থান গ্যারিসনে পরিণত হওয়া এবং তাদের মতো স্থানীয় ঈসাপ্রেমীদের সামান্য অংশগ্রহণ চিন্তার উদ্রেক করছে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার মনে। তিনি ভাবছেন, ফিলিস্তিনের ভূমিতে রোমান, বাইজেন্টাইন, ইসলামি খেলাফত আমলে খৃস্টানরা নিজেদের রক্ষা করেছে। উসমানি খেলাফতে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। অথচ এখন ইজরাইল কীভাবে খৃস্টানদের বিতাড়িত করছে এ পবিত্র ভূমি থেকে। ১৯৪৭ সালে যেখানে ইজরাইল ও ফিলিস্তিনি খৃস্টানরা ৭.৪ পার্সেন্ট ছিল, সেখানে ২০১৯ সালের পরিসংখ্যন অনুযায়ী তাদের মোট জনসংখ্যার মাত্র দুই পার্সেন্টেরও কম।

পশ্চিম তীরের লুথেরান গির্জার পাদ্রী ইসহাক বলেন, আমি অকপটেই বলছি, ইতিহাসের চরম সত্য, আমরা এই ভূমির শেষ প্রজন্ম। পরিকল্পিত বিভিন্ন মাধ্যমে ইজরাইল তাদের বিতাড়িত করছে। এর কয়েকটি উদাহরণ এই–

বৈবাহিক প্রতিবন্ধকতা

আমেরিকান নাগরিক ইলান পশ্চিম তীরের খৃস্টান নেতার স্ত্রী। ত্রিশ বছর থেকে তাদের সংসার। বিভিন্ন সময় আসছেন স্বামীর নিকট। কিন্তু ছেলের বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিমানবন্দরে তাকে আটকে রাখা হয় বারো ঘন্টা। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। প্রবেশের জন্য তিন মাসের ভিসা এবং জামানত স্বরূপ গুণতে হয় ২০ হাজার ডলার। তার ভাষায়, আমার স্বামীর বাপ-দাদার ভিটায় বাস করাকে ‘ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন’ বলছে দখলদার ইজরাইল! আমার ও আমার স্বামীর স্থায়ী বসবাসের আবেদন গত ৩০ বছর থেকে করে আসছি আমরা, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের সাময়িক সময় দানের ওপর চলছে আমাদের জীবন। কিন্তু এখন হয়তো তাও চলে যাওয়ার পথে।’

তিনি জানান, তার মতো আরো অনেক পরিবার এমন সমস্যায় ভুগছে। স্বামী-স্ত্রীর কেউ ফিলিস্তিনি অপরজন জার্মানি, গ্রীস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের। আপনি যদি ফিলিস্তিনি হন, আপনাকে হয় সাময়িকভাবে আপনার পার্টনারকে নিয়ে ফিলিস্তিনে থাকতে হবে, নতুবা স্থায়ীভাবে পার্টনার ও সন্তানদের নিয়ে বিদেশে কাটাতে হবে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক খৃস্টান জানান, তার সদ্য সন্তান হওয়া স্ত্রীর প্রবেশের জন্য এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

চলাফেরা ও প্রার্থনায় বাধা প্রদান

গাজার খৃস্টান যুবকদের ২০১৪ সাল থেকে বড়দিনে বেথলেহেম ও আল কুদসে প্রবেশের কোনো অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কখনো এমন সময় অনুমতি দেয়া হয়, যখন আর তাদের পক্ষে প্রস্ততি নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

পশ্চিম তীরের আমেরিকান নাগরিক ও খৃস্টান নেতার স্ত্রী ইলান বলেন, আল কুদস মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।

খৃস্টীয় সংস্কৃতি চর্চায় বিচারক ব্যবস্থা

বর্তমানে নেতানিয়াহু সরকার খৃস্টীয় সংস্কৃতি চর্চাকারীদের বিচারের জন্য আইন প্রণয়ন করছে। ২০০৪ সালে খৃস্টানদের আরামীয় সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু তাদের আরব খৃস্টান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। ইজরাইলে বাস করা রিয়াহ আবুল আসাল বলেন, আমার ভাইবোন সকলে এই ভূমি ত্যাগ করেছে। আমরাই হয়তো এখানে শেষ প্রজন্ম। যেসব ফিলিস্তিনি খৃস্টান যুবক দখলদারদের বিরোধিতা করে, তাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, পবিত্র স্থানে যেতে বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন পন্থায় দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

খৃস্টান বিতাড়নের উদ্দেশ্য

ইজরাইলে বসবাসরত পাদ্রী রিয়াহ বলেন, ‘যখন এই পবিত্র ভূমি থেকে সকল খৃস্টানকে বিতাড়িত করা সম্ভব হবে, ইজরাইলের জন্য তখন আমাদের অবশিষ্ট ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করা খুবই সহজ হবে। তাদের জন্য ইসলাম ও ইহুদিদের মধ্যে ধর্মীয় যুদ্ধ বাঁধানো সহজ হবে। খৃস্টান বিশ্বকে তারা খুব সহজেই এ যুদ্ধে যুক্ত করতে পারবে। অথচ খৃস্টান ছাড়া এই ভূমি আর বৈচিত্রপূর্ণ থাকতে পারবে না।

গাজার খৃস্টান

গাজায় ১৫ বছর আগে চার হাজার খৃস্টান থাকলেও বর্তমানে মাত্র হাজারের মতো আছেন। পোপ মারিয়ো ২০১২ সালের পর গাজার গির্জায় এসেছিলেন। বলেছিলেন, ভাবলাম হয়তো সবকিছু একটু একটু ভালো হবে, বরং এখন তো দেখি সব আরও খারাপ হচ্ছে!

সংখ্যা হ্রাসের কারণ

হয়তো কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, খৃস্টানদের সংখ্যা এতো দ্রুত কেন কমছে? উত্তরে বলা যায়, এই হ্রাসের কারণ মুসলিমরা নয় কখনো। কারণ, গাজা, পশ্চিম তীর ও আল কুদসের সব জায়গায় খৃস্টানরা নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। তারা মুসলমানদের থেকে পরিবার-সংখ্যায় কম হওয়ায়, পাশ্চাত্য বিশ্ব তাদের সহজে গ্রহণ করায় এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকার কারণে তারা সহজেই বাইরে চলে যেতে পারছে। তাছাড়া ফিলিস্তিনি খৃস্টানরা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভবিষ্যত হুমকির মুখে পড়া সত্ত্বেও পাশ্চাত্যে তাদের খৃস্টান গির্জাগুলো নিন্দা পর্যন্ত জ্ঞাপন করে না। এই চুপ থাকা ইজরাইলকে যা ইচ্ছে করার সুযোগ করে দেয়।

খৃস্টানদের সাথে ইহুদিদের প্রতারণা

আমেরিকান বিভিন্ন ইহুদি নেতা খৃস্টান-বিশ্বের নিকট তুলে ধরছে, ইজরাইলে ইহুদি জনগণের বসতি স্থাপনের মধ্যেই মূলত খৃস্ট-ধর্মের ভবিষ্যত। কারণ, এখানেই শেষ যুগে ‘যিশুখ্রিষ্ট’ আসবেন। এ প্রচারণায় পশ্চিমা বিশ্ব ইজরাইলের দখলদারিত্বকে দেখেও না দেখার ভান করে। তাছাড়া খৃস্টানদের ফিলিস্তিন ত্যাগের কারণ হিসেবে মুসলিমদের দায়ী করে প্রচারণা চালায় জায়নবাদী ইহুদিরা। অথচ প্রত্যেক ফিলিস্তিনি খৃস্টান, যাদের সাথে পিটারের কথা হয়েছে, তারা খৃস্টান ও মুসলিমদের সহাবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। তারা দখলদারদের বিরুদ্ধে একসাথে প্রতিবাদ করছেন, একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। তবে গাজাসহ ফিলিস্তিন ও ইজরাইলের কিছু খৃস্টান এখনো তাদের মাতৃভূমিতে থেকে যাওয়ার লড়াই করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। কিন্তু এর মধ্যে মুসলিমদের জন্য আশংকার বিষয় হলো, খৃস্টান-গির্জা গাজার অসহায় মুসলিমদের সহযোগিতার নামে খৃস্টবাদে যুক্ত করছে।

আগের সংবাদজল্লাদের প্রতি ভালোবাসা: পশ্চিমা মিডিয়ায় ইজরাইলের পক্ষে সাফাই
পরবর্তি সংবাদআমীন আল হুসাইনী : ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতির শেষ লড়াই