লড়াকু বিডিএস: বাংলাদেশে ইজরাইলি পণ্য বর্জনের কার্যক্রম নেই কেন?

লড়াকু বিডিএস: বাংলাদেশে ইজরাইলি পণ্য বর্জনের কার্যক্রম নেই কেন?

মাহদি হাসান:

ইজরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার ইহুদি ও মুসলিম সংঘাত চলছে কয়েক শতাব্দী ধরেই। তবে ৭২ বছর হলো তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই সংঘাতে পশ্চিমা মদদপুষ্ট হানাদারদের হাতে প্রতিনিয়তই নির্যাতিত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম ভাই-বোন। ওদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না পবিত্র অবয়বের নিষ্পাপ শিশুও। পবিত্র ধর্মীয় স্থান মসজিদকেও গুড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করছে না তারা। ইজরাইলের এই সহিংস আক্রমণের মুখে একদল লড়াকু মুজাহিদ প্রবল প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠা করেছেন ঠিকই, কিন্তু এর জন্য তাদেরকে স্বীকার করতে হচ্ছে বিশাল ত্যাগ।

কিন্তু সারাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি মুসলিমের যেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই। যেন কোনো অদৃশ্য হাতছানির কারণে তারা নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ঘরের কোণে আর নাটক-সিনেমার দৃশ্য দেখার মতো গিলে যাচ্ছে স্বজাতীয় ভাইবোনদের নির্যাতিত হওয়ার নিদারুণ দৃশ্য। নির্যাতিত মুসলিম ভাই-বোনদের সাহায্য তো তারা করছেই না, উল্টো একদিক থেকে তারা ইজরাইলের সহযোগী বনে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তা কীভাবে? এর উত্তর খুবই সোজা।

বিশ্ব মানচিত্রে ইজরাইলের উত্থানের খুব বেশিদিন হয়নি। এই অল্প কদিনের মধ্যেই অতি ক্ষুদ্র আয়তনের এই দেশটি আজ বিশ্বের কলকাঠি নাড়ছে। এর পেছনে কী কারণ? মোটাদাগে দুইটি কারণের কথা উল্লেখ করব। প্রথম কারণ হচ্ছে, তাদের সাংগঠনিক ভিত অনেক মজবুত। এর পাশাপাশি বিশ্বের বর্তমান পরাশক্তিদের লাগামহীন লেজুড়বৃত্তি করার কারণে তারা এ অবস্থানে যেতে পেরেছে। আর দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, ইজরাইলের অর্থনৈতিক এস্টাবলিশমেন্ট। আজকের বিশ্বে ফিন্যান্সিয়ালি প্রমিনেন্ট রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম হচ্ছে ইজরাইল। মানচিত্রে যাদের অবস্থান অতি ক্ষুদ্র। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে এদের পণ্য। তাদের অর্থকড়ি লাভের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে এটিই। আর তাদের এ অর্থের সিংহভাগই খরচ করা হয় মুসলিম নিধনের পেছনে। অথচ মুসলিম বিশ্বের বাজারসমূহও মুক্ত নয় ইজরাইলি পণ্যের প্রাদুর্ভাব থেকে। আর উদাসীন মুসলিমরা সেই পণ্য দেদারসে ক্রয় করে ভাগীদার হচ্ছে স্বজাতীয় ভাইদের নিধনযজ্ঞে।

আমরা যারা সাধারণ মুসলিম আছি তারা হয়তো ইজরাইলকে সামরিক দিক দিয়ে প্রতিরোধ করতে পারব না। কিন্তু আমরা চাইলে তাদেরকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কোণঠাসা করে দিতে পারি এটা ধ্রুব সত্য। এ ছাড়া তাদের পণ্য বর্জন আমাদের ঈমানের দাবি, আমাদের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দাবি। এ লক্ষ্যেই ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠিত হয় বিডিএস মুভমেন্ট। যার মূল রূপ হচ্ছে Boycott, Divestment and Sanctions (BDS) Movement। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং সমতার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিতি অন্যতম প্রধান আন্দোলন হচ্ছে এটি।

বিডিএস মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠা

২০০৫ সালে ফিলিস্তিনি সিভিল সোসাইটি তথা নাগরিক সমাজ সংস্থা শান্তিপূর্ণ এবং অনাগ্রাসীভাবে ইজরাইলের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিডিএস মুভমেন্ট অর্থাৎ ইজরাইলকে বয়কট করা, তাদের ব্যবসায়িক পণ্য বর্জন করে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং এর অনুমোদনের লক্ষ্যে আন্দোলনের আহ্বান জানায়। ১৭০টি ফিলিস্তিনি সংগঠন, অভিবাসী নেটওয়ার্ক, নারী সংস্থা, পেশাদার সংস্থা এবং অন্যান্য নাগরিক সংস্থার সমন্বয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। বিডিএস দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইজরাইলের উপর শান্তিপূর্ণভাবে চাপ সৃষ্টি করবে বলে জানায়। তাদের দাবীগুলো ছিল–

এক. আরবের সকল অঞ্চল থেকে ইজরাইলের কলোনাইজেশন তথা উপনিবেশবাদ এবং দখলদারিত্ব দূর করা এবং এ অঞ্চলের মধ্যকার সীমান্ত-দেয়াল উঠিয়ে দেয়া। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ওয়েস্ট ব্যাংক তথা পূর্ব জেরুসালেম, গাজা এবং সিরিয়ার গোলান উপত্যকা ইজরাইলের দখলদারিত্বের আওতায় পড়েছে। ইজরাইল ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বিভিন্ন ভূখণ্ড দখল করে সেখানে অবৈধভাবে ব্যারিকেড, ওয়াচ টাওয়ার ইত্যাদি বসিয়ে দেয়। ইজরাইল গাজার উপর অবরোধ আরোপ করে গাজাকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওপেন এয়ার প্রিজন তথা উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করেছে। এমনিভাবে ইজরাইল প্রতিনিয়ত গাজার উপর হামলা করে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হচ্ছে।

দুই. সম্পূর্ণ সমতা বিধানের সাথে ইজরাইলের আরব-প্যালেস্টাইন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। বর্তমান ইজরাইলের এক পঞ্চমাংশ নাগরিকই হচ্ছেন ফিলিস্তিনি। যারা ১৯৪৮-এর সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময় ইজরাইলেই রয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে তারা এক তীব্র জাতিগত বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পঞ্চাশেরও অধিক আইনের লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাদের সাথে। ইজরাইলি সরকার জোরপূর্বক ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরকে তাদের বসতভিটা থেকে উৎখাত করার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে আর ইজরাইলি নেতারা নিয়মিত উন্মুক্তভাবে তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে।

তিন. জাতিসংঘের ১৯৪ ধারা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি অভিবাসীদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি এবং সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করা। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের প্রায় অর্ধেক নাগরিকের জাতিগত নিধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চলমান এই সংঘাত। সেই থেকে ইজরাইল ফিলিস্তিনের আরো ভূমি দখল করে প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদেরকে আরো বেশি করে নিধনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের এই সিস্টেম্যাটিক জোরপূর্বক নিধনের ফলে বর্তমানে ৭.২৫ মিলিয়নেরও অধিক ফিলিস্তিনি অভিবাসী জীবনযাপন করছে। ইজরাইলিরা তাদের ঘর-বাড়ি ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছে। কারণ ফিলিস্তিনিরা ইহুদি নয়।

বিডিএস মুভমেন্ট কী?

বিডিএস মুভমেন্টের রয়েছে তিনটি অংশ। Boycott, Divestment and Sanctions। Boycott-এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজরাইলের জাতিগত বিদ্বেষপূর্ণ শাসনকে সমর্থন না করা এবং ইজরাইলি সংস্কৃতি, অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান এবং ফিলিস্তিনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ইজরাইলি সকল প্রতিষ্ঠানকে বয়কট করা।

Divestment তথা বর্জনের মাধ্যমে উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক, লোকাল কাউন্সিল, চার্চ, পেনশন ফান্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি থেকে ইজরাইল রাষ্ট্রের এবং অন্যান্য ইজরাইলি ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি, যারা ইজরাইলের জাতি-বিদ্বেষকে সমর্থন করে, তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা।

আর Sanctions-এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকার এবং জাতিসংঘকে ফিলিস্তিনিদের বৈধ চাহিদা পূরণে এবং ইজরাইলি জাতিগত বৈষম্যের নিস্পত্তিকরণে চাপ প্রয়োগ করা। ইজরাইলের অবৈধ দখলদারিত্ব এবং ব্যবসাকে অফিসিয়ালি ব্যান করা, তাদের সামরিক এবং বেসামরিক সকল চুক্তি বাতিল করা এবং এর পাশাপাশি জাতিসংঘ এবং ফিফার মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে ইজরাইলের সদস্যপদ বাতিল করা।

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই আন্দোলন তাদের দাবি পূরণের লক্ষ্যে নির্ভীকভাবে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী একটি জাগ্রত গ্লোবাল মুভমেন্টে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বে এর অনেক শাখা, অ্যাকাডেমিক সংস্থা, ধর্মীয় সংস্থা এবং তৃণমূল সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইজরাইলে উপনিবেশবাদী এবং জাতিবিদ্বেষপূর্ণ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্তর্জাতিকভাবে একটি চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে ইসরাইলি পণ্য বর্জনের কার্যক্রম নেই কেন?

অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইজরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রয়েছে বিডিএস মুভমেন্টের সতেজ কার্যক্রম। কিন্তু বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের এই আন্দোলনের সাথে নেই কোনো সংশ্লিষ্টতা। জাতিগতভাবে বাংলাদেশিরা বড্ড বেশি স্বার্থবাদী আর উদাসীনতায় মত্ত। বিডিএস মুভমেন্ট একটি সামগ্রিক আন্দোলন। এটি শুধু ইজরাইলি পণ্য বর্জনই নয়, সাথে ইজরাইলি কৃষ্টি-কালচার, অ্যাকাডেমিক, সামরিক–সব ক্ষেত্রে ইজরাইলকে বয়কট এবং বর্জন করে অবৈধ রাষ্ট্রটিকে কোণঠাসা করে দিতে বদ্ধ পরিকর।

ইজরাইলি পণ্য আমরা কীভাবে বর্জন করবো বা চেনার কী উপায়?

অনেকেই ইজরাইলি পণ্য বলতে মনে করে থাকেন ইজরাইলে উৎপাদিত পণ্য। এমনটি মনে করা ভুল। তাদের নিজস্ব পণ্য এবং কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অসংখ্য কোম্পানির সাথে রয়েছে তাদের অর্থনৈতিক লেনদেন। এসব কোম্পানির আয়ের একটি মোটা অংক লাভ করে ইজরাইল। এদের মধ্যে রয়েছে অনেক বিখ্যাত কোম্পানি। যেমন, কোকাকোলা, পেপসি, স্প্রাইট, সেভেন আপ, মিরিন্ডা, মাউন্টেন ডিউ নামক পানীয়গুলো। অজ্ঞাতসারে এ সকল পানীয় পান করে আমরাও শরিক হচ্ছি ইজরাইলিদের পরিচালিত হত্যাযজ্ঞে। এ ছাড়া নেসলে, নকিয়া, এইচপি, কেএফসি, পিজা হাট, ডাভ, হেড এন্ড শোল্ডারস, এক্স প্রভৃতি কোম্পানিগুলোর পণ্য ক্রয় করে আমরা নিজেদের অজ্ঞাতসারে স্বজাতীয় ভাই-বোনের হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করছি। তাই আমাদের ইজরাইলি পণ্যসমূহের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার জন্য আমরাও যোগ দিতে পারি বিডিএস মুভমেন্টে। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে ফলো করতে পারেন https://bdsmovement.net/ এই সাইটটি। আমাদের সচেতনতার মাধ্যমেই ইসরাইলি আগ্রাসন রুখে দেয়া সম্ভব।

আগের সংবাদপশ্চিম তীরে ইসরাইলিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষ
পরবর্তি সংবাদনীতি শিথিল করার পরও জন্মহার বাড়ছে না চীনে