
মূল: খালিদ বেগ
ভাষান্তর: উম্মে মারিয়াম
বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র, মুক্তবাজার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সার্বজনীন মানবাধিকারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা হয়। শিক্ষা এমনই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়। শিল্পোন্নত দেশগুলি এসকল ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে।
এই সকল বিষয়গুলো সাধারণ জনগনের কাছে এত বেশি সমাদৃত যে যখনই কেউ সংস্কৃতি বা সংস্কারের মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে চায়, তখন এগুলোর দোহাই দিলেই তা গৃহীত হয়ে যায়। এসব বিষয়ের যে অবৈধ গ্রহণযোগ্যতা আমাদের ভিতরে চলছে বা চলে আসছে, সেই দ্বিধাহীন, ভিত্তিহীন গ্রহণযোগ্যতার ফলে পঙ্গু হয়ে পড়ছে আমাদের দূরদৃষ্টি, আমাদের সামাজিক অবস্থান। একই সাথে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনাসমূহ।
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের বেশিরভাগ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু স্বাক্ষরতার পরিসংখ্যানকে ঘিরে। সেই মানদণ্ডই নির্ধারণ করে দিয়েছ যে একটা শিল্পোন্নত দেশে কতগুলো স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর, কতগুলো পিএইচডি, কতগুলো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার থাকতে হবে। তাদের মানদণ্ডের পেছনে আমরা এমনভাবে ছুটছি যে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রীয় আলোচনা আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তারা ইতিমধ্যে আমাদের গায়ে উন্নত বিশ্বের তকমা লাগিয়েছে। আর আমরা কী করছি? আমরা তাদের অগ্রগতি স্তর অর্জনের জন্য নিরলসভাবে, একনিষ্ঠভাবে তাদের পদক্ষেপ অনুসরণ করে যাচ্ছি। আর এটাই আমাদের একমাত্র কাজ!
উন্নত বিশ্বে শিক্ষাই হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রসার ও সফলতার প্রধান হাতিয়ার। কারণ এর মাধ্যমই উৎপাদনের জন্য দক্ষ কর্মী এবং পন্যগুলোর জন্য আগ্রহী গ্রাহক সরবরাহ করা সম্ভব। তাদের মতে শিক্ষার উদ্দেশ্যই হল কোন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন করা। আর ব্যক্তি জীবনে শিক্ষার উদ্দেশ্য হল সম্মানজনক জীবন যাপনে সক্ষম হওয়া।
হালাল জীবিকা উপার্জন এবং একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করাও অবশ্যই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে বর্তমানে আর্থিক লক্ষ্যের সাথে শিক্ষার যে যোগসূত্র ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যা শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং চেতনায় শিক্ষাকে শুধুমাত্র পেশাদারিত্বের বা উপার্জনের সাথে সম্পৃক্ত করে। যার ফলে শিক্ষার অবক্ষয় ঘটে এবং এর মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয়ের ও সূচনা হয়।
শিক্ষায় কেন্দ্রীয় বা মূল উদ্দেশ্যকে আমরা ভুলতে বসেছি। সেইসব বিস্মৃত উদ্দেশ্যকে আমাদের জীবনে প্রয়োগের জন্য আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শুধুমাত্র প্রবৃত্তি এবং শারীরিক চাহিদার কারণেই পিঁপড়া, মৌমাছি বা অন্য যে কোন পশু পুরোপুরি কার্যকর প্রাণী সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
পাার নসন কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে তা হয়না। প্রকৃতির তৈরী নিয়ম মানতে মানুষ বাধ্য নয়, তবে তারা যদি একটি কার্যকর, সমৃদ্ধশীল সমাজ গঠন করতে চায় তাহলে অবশ্যই তাদেরকে প্রাকৃতিক নিয়মের মুখাপেক্ষী হতে হব। আর সাথে থাকতে হবে সাধারণ লক্ষ্য, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাগাভাগি করে নেওয়ার ক্ষমতা। কিছু সাধারণ নিয়মাবলী এবং কিছু বাধ্যবাধকতা ছাড়া কখনো মানব সমাজ টিকে থাকতে পারবে না। যদি এসব মূলনীতি সে বর্জন করে তবে সেই সমাজের নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না, তা হয়ে যায় অন্যের অংশ। তদুপরি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সমাজকে টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই তাদের একটি নির্দিষ্ট সীমানা থাকতে হয় যাকে আমরা সমাজ, দেশ, ভূমি নামে আখ্যায়িত করতে পারি। এসকল অনুভুতি অনুধাবন করানোই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। একটি সমাজের শিক্ষাব্যবস্থাই সেই সমাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক, যোগ্য নেতা তৈরি করে, করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। আর তাই শিক্ষাব্যবস্থার স্বাস্থ্য বা অসুস্থতা সরাসরি সামাজিক স্বাস্থ্য বা অসুস্থতার সাথেই সম্পৃক্ত।
আমরা যদি মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, তাহলে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত সমাজের চিত্র আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে। যেমন: দুর্নীতি, অবিচার, নিপীড়ন, দারিদ্র ইত্যাদি। ভালোভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে এসব সমস্যাগুলোর বেশির ভাগই মানব-সৃষ্ট। অন্যভাবে বলা যায়, এটা সেই শিক্ষা ব্যবস্থার সাথেই সম্পৃক্ত। যার ফলে এমন শিক্ষিত শ্রেণী তৈরি হয় যারা এ সকল সমস্যা তৈরি অব্যাহত রাখে। যে শাসকেরা নিজের দেশ ও জনগণকে পরাধীন করে বিদেশি শক্তির কাছে বিক্রি হয়ে যায়, যে সকল আমলারা অন্যায় আইন প্রয়োগ করে, জেনারেলরা নিজেদের লোকদের সাথে যুদ্ধ করে, যেসকল ব্যবসায়ীরা প্রতারণা,করে, যেসব সাংবাদিকেরা মিথ্যা বলে, অশ্লীলতা প্রচার করে -তারা সবাই শিক্ষিত মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিতও বটে। তাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক জীবনের ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত হওয়া। ভূমিকা পালন তো তারা ঠিকই করছে কিন্তু খুবই অপ্রত্যাশিত উপায়ে।
এই সমস্যায় জর্জরিত সমাজের প্রতিটি স্তর, এই মুসলিম সম্প্রদায় কেন আজ বস্তুবাদের দখলে? আমাদের সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা যখন বস্তুবাদের প্রশংসায় ভেসে যাচ্ছে তখন আমাদের কি আশা করা উচিত? কেন আমাদের জনজীবনে ইসলাম উপেক্ষিত হচ্ছে, হচ্ছে অবহেলিত? কারণ আমরা সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থাকে যথাযথভাবে রেখে দিয়েছি। সামাজিক আচরণে, মেলামেশায় ইসলামী শিষ্টাচার ও নৈতিকতার ব্যবহার এত কম কেন? কারণ আমাদের আমদানি করা শিক্ষাব্যবস্থা সমস্ত নৈতিক প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত। আমাদের সমাজ কেন অসুস্থ? কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই অসুস্থ।
এটাই শিক্ষার আসল সংকট। এই সংকটের মূল কারণ আমদানিকৃত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা। এই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা জনপ্রিয় হওয়ার পূর্বে, আমাদের সমাজের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থাই ছিল মানুষের সর্ব প্রকার উন্নয়নের মাধ্যম। নৈতিক প্রশিক্ষণ ও তারবিয়াত ছিল এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষকতা তখন শুধু কোন পেশা ছিল না বরং একজন শিক্ষক ছিলেন পরামর্শদাতা ও নৈতিক শিক্ষার গুরু। আমরা তখন একটি হাদীসের কথা মনে করে রেখেছিলাম। আর তা হলো-
“কোন পিতা তাঁর সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো উপহার দেননি”-তিরমিযী।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এই হাদিস দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আমাদের দারুল উলুম এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্যালয়ের তুলনায় তাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট কম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের স্কুলগুলো চার্চ দ্বারা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে পুঁজিবাদীশক্তি স্কুলগুলো দখল করে নেয়। নিজেদের গড়া ছাঁচে তারা সেগুলোকে নতুন রূপ দেয়। যেহেতু পুঁজিবাদ এবং রাজনৈতিক, অর্থনীতির ব্যবস্থাগুলোর অধীনে কাজ করার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল যোগ্য কর্মীর তাই তাদের ক্ষেত্রে নাগরিকের প্রশিক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রম মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল না। তাদের তৈরি নৈতিক প্রশিক্ষণ ছিল এক দুর্ঘটনার মত। কেননা তারা তৈরি করেছিল ধর্মমুক্ত নৈতিক প্রশিক্ষণ। বর্তমান বিশ্বে নাগরিকতা বলতে আমরা যা কিছু দেখি, যা কিছু বুঝি তা মূলত সেই নৈতিক প্রশিক্ষণের ফলাফল। যদিও মুসলিম দেশগুলো পরবর্তীতে সেই প্রশিক্ষণের কিছু পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। যার ফলাফল এখন বিভিন্ন দেশে পরিলক্ষিত হয়।
আমরা তখনই সমস্যাটির সমাধান করতে পারব যখন আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হবে ইসলামী সমাজের জন্য যোগ্য নাগরিক ও যোগ্য নেতা তৈরি করা। আর প্রকৃত ইসলামিক নৈতিক প্রশিক্ষণ ও তারবিয়াহ অবশ্যই এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে। যা হবে আমাদের শিক্ষার প্রাণ, আনুষ্ঠানিক কোন বিষয় নয়। যদি এই মূল বিষয় আমরা না বুঝি, তাহলে শিক্ষার উন্নতির সমস্ত পরিকল্পনা অকেজো হয়ে পড়বে। এর জন্য আমাদের দরকার পাঠ্যক্রম নতুন করে সংশোধন করা, পাঠ্যপুস্তকগুলো নতুন করে লেখা, শিক্ষকদেরকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি। আমাদের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। আমরা যদি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বুঝে আমাদের পদ্ধতিতে এগিয়ে যাই, তবেই আমাদের সফলতা সম্ভব। অন্য কোন পদ্ধতির অনুসরণ কি কখনো আমাদেরকে সেই গৌরবময় ইতিহাস ফিরিয়ে দিতে পারবে?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি কী?
যদি প্রশ্ন করা হয়, আমেরিকা কে আবিষ্কার করেছিল ? সবাই অবশ্যই বলবে-“কলম্বাস”। অবশ্য কিছু মেধাবী ছাত্র সেই পুরাতন গল্পটি জানতে পারে যে কলম্বাস আসলে ভেবেছিল সে ইন্ডিয়ায় পৌঁছেছে, তাই সে সেখানকার লোকদেরকে ইন্ডিয়ান নামে ডেকেছিল।
যদি কোন শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য থাকে যথাযথ জ্ঞান সরবরাহ করা এবং সমালোচনামূলক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটানো, তবে সেক্ষেত্রে উত্তরটি আজও মুসলিম বিশ্বের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দেয়। কলম্বাস ছিলেন ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম যিনি আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তিনি আমেরিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রথম মানুষ নয়। কয়েক হাজার নারী-পুরুষ তার আগের সেখানে পৌঁছে ছিল এবং বহু শতাব্দী ধরে জীবন যাপন করছিল। কেউ কখনো জানতেও চাইনা, যে কেন ইতিমধ্যে জনবহুল একটি ভূমি আবিষ্কার করার জন্য নতুন করে একজন মানুষকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়? এটি আসলে ইউরোপ কেন্দ্রিক পক্ষপাতগ্রস্ত মানসিকতার প্রকাশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের পক্ষপাতিত্ব কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে।
এটাই একমাত্র প্রশ্নবিদ্ধ সত্য নয়, যা আমাদের স্কুল-কলেজ, আমাদের শিক্ষক বা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে শিখিয়েছে। শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা তাদের দেওয়া তথ্য, ধারণা, মূল্যবোধ, অনুমান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হয়েছি। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে সত্যতা এবং প্রশ্নবিদ্ধ নীতি, যেমন ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামবিরোধী নীতিসমূহের শিক্ষা আমরা তাদের মতো করেই শিখছি। যদিও এসব বিষয় খুবই মৌলিক কিন্তু শুধুমাত্র প্রচার-প্রসারের প্রভাবে তারা এখানে এক দুর্দান্ত নজির স্থাপন করে যাচ্ছে।
শিক্ষা একটি চমৎকার জিনিস। তবে প্রকৃতপক্ষে আমরা কি শেখাচ্ছি?
আধুনিক বিজ্ঞান ছাত্রদেরকে মহাবিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এমন দৃষ্টিতে যে দৃষ্টিকোণ সৃষ্টিকর্তাকে চিনেনা।
আল্লাহ পাক বলেছেন, “আকাশ ও পৃথিবীতে তারা কত নিদর্শন অতিক্রম করে তবুও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়”-সূরা ইউসুফ
বিজ্ঞানের যথাযথ জ্ঞান তো একজন মানুষকে আল্লাহর বড়ত্ব,মহত্ব ও তার সৃষ্টির শক্তিকে বুঝতে সাহায্য করবে। একই সাথে সে মানব জ্ঞান ও মানুষের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও জানতে পারবে। ফলে সে বারবার আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির প্রশংসা করবে। কিন্তু আধুনিককালের বিজ্ঞান শিক্ষা এর একেবারেই বিপরীত চিত্র প্রদর্শন করে। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, এটার পার্থক্য নিরূপণ করতে তারা ব্যর্থ হয়। যদি প্রশ্ন করা হয় মুসলিম বিশ্বের এমন কোন ইসলামিক স্কুল আছে কি যার গ্র্যাজুয়েটরা ডারউইন তত্ত্বের বিবর্তনকে বৈজ্ঞানিক কারণে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে?
আমরা যখন বাচ্চাদেরকে বিজ্ঞান শেখাই, তখন কি এর অবস্থান ও সীমাবদ্ধতাগুলো তাদের জানাই? তারা কি দক্ষতার সাথে প্রযুক্তির অপরিহার্যতার বুঝতে পারে?
কোন চিকিৎসক যদি তার ব্যবহৃত ওষুধ ও পদ্ধতিরগুলোর সীমাবদ্ধতা না জানেন, তাহলে তিনি কখনো উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন না। তেমনি কোন ইঞ্জিনিয়ার যদি তার সরঞ্জামগুলোর সীমাবদ্ধতা না জানেন, তিনিও অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তাহলে কেন বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে আমাদের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না?
কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বিজ্ঞানই চূড়ান্ত হাতিয়ার। সত্য ও মিথ্যাচারের সবচেয়ে বড় বিচারক বা নিয়ামক। এমনকি এটা উপলব্ধি না করেই আমরা তা গ্রহণ করছি এবং আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষা সেই অজ্ঞতাকেই প্রতিফলিত করে।
সমস্যাটি কেবল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের এমবিএ গ্রাজুয়েটরা শিখছে যে কোন ব্যবসায়ের মূল লক্ষ্য হলো সর্বাধিক মুনাফা অর্জন এবং মার্কেটিংয়ের জন্য চাহিদা তৈরি করা। ব্যবসায় ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঠিক উপায় হল ব্যয় বেনিফিট বিশ্লেষণ করা। এগুলো সব কিছুই তাদের চোখে একেবারে বাস্তব সদৃশ, যেমন বাস্তব কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের বিষয়টা। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো আসলে সংশয়পূর্ণ।
আমাদের সাংবাদিকতার গ্র্যাজুয়েটরা পশ্চিমাদের উপস্থাপিত সাংবাদিকতার চেয়ে আলাদা কিছু শিখছে না। খবরের নিজস্ব সংজ্ঞা, তা সংগ্রহ করা বা উপস্থাপন করার জন্য তাদের নিজস্ব কোনো নৈতিক মান নেই যা তাদের দিতে পারে স্বকীয়তা, করতে পারে সম্মানিত এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে খবরের প্রচার-প্রসারকে। অর্থনীতি আমাদের শিখিয়েছে যে “মাসলোর হায়ারার্কি তত্ত্ব” অনুসারে মানুষই সর্বাধিক ইউটিলিটি সম্পন্ন প্রাণী। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা এমন অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখতে পাই যেখানে নৈতিকতার কোন বালাই ছিল না। ছিল না আল্লাহর আইনের কোনো প্রয়োগ যা জাতির উত্থান পতনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মনোবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞান, মেডিসিন বা ইঞ্জিনিয়ারিং, নাগরিক বা ভূগোলের ক্ষেত্রে একই চিত্র।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্কুল এবং কলেজগুলো ইসলামী সমাজকে সেকুলারিজেশন করার মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে। তারা খুবই কার্যকরভাবে শিখিয়ে যাচ্ছে যে, ইসলাম এই পৃথিবী বোঝার জন্য বা এর সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। যদিও তাদেরই তৈরি অনেক গ্রাজুয়েটরা তাদের বিশ্বাসকে ভুল ও সংশয়পূর্ণ মনে করে। এমনকি তারা অনেক ভালো প্র্যাকটিসিং মুসলিম হয়ে ওঠে। তবে দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, তাদের পাঠ্যক্রমে এমন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না বা তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষিত করা হয় না যে তারা ধর্মনিরপেক্ষ, বস্তুবাদী বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
সাম্প্রতিক এই দুরবস্থার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সহায়ক হতে পারে। বহু শতাব্দী ধরে আমাদের সমাজ সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্মীয় দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত ছিল। আমাদের স্কুলগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই সমস্ত বিষয়গুলোকে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হতো। যতদিন মুসলমানরা বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং রসায়নের মত বিজ্ঞানের সমস্ত বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় ছিল, ততদিন সেকুলারদের ধর্মীয় নিরপেক্ষতার এই পক্ষপাতিত্ব বিকাশ করতে পারে নি।
এই বিভক্তি শুরু হয়েছিল পশ্চিমা রেনেসাঁর সময়ে। যখন বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদ তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ যে কোন পদ্ধতির সাহায্যে বস্তুবাদী সমাজের জন্য অগ্রগতির একটি দ্রুততম পথ খুঁজে পেতে চেয়েছিল। সেই চাওয়া আরো বেশি ত্বরান্বিত হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে। তারপর উপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে এই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ মুসলিম ভূখন্ডের ভাগ্যে এসে জোটে।
সেসময় মুসলিমেরা নানাবিধ কারণে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। আর সেজন্যই তারা পাশ্চাত্যের জ্ঞান-গরিমা, শিক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। এমনকি তারা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তার একটি জয়-পরাজয়হীন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল। যদি তারা পশ্চিমা বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণ করে তবে তা তাদেরকে ইসলামবিরোধী মতবাদ পড়তে বাধ্য করে। অপরপক্ষে যদি তারা এ শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে তবে বিজ্ঞান এবং বৈষয়িক অগ্রগতিতে তারা পিছিয়ে পড়বে।
ফলশ্রুতিতে মুসলিম বিশ্বে দুটি পদ্ধতির বিকাশ ঘটে। আমাদের দারুল উলুমরা পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেরাই ইসলামী জ্ঞান ও মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করেছেন। আর তাদের এই প্রচেষ্টার ফলেই ইসলাম আজকের রূপ হিসেবে টিকে আছে। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন আরব দেশ নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে শীতলতা অবলম্বন করেছিল। পরবর্তীতে দেখা যায় যে তাদের শিক্ষার মানের কোন উন্নতি ঘটেনি অযথা তারা ইসলামী মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছে। এমনকি তারা সমাজের বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্ব দেয়ার মতো উপযোগী হয়েও উঠতে পারেনি। নেতৃস্থানীয় জায়গাটা দখল করেছে পশ্চিমা ধাঁচের স্কুল এবং কলেজ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটরা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসকল স্কুল এবং তাদের পাঠ্যক্রম বিশ্বকে দেখার এবং এর সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষ উপায়গুলিকেই লালন করে। এরকম দুটি বিপরীতধর্মী শিক্ষাব্যবস্থার টানাপোড়নের ফলে জর্জরিত সমাজের চিত্র আজ প্রতিটি মুসলিম দেশে বিদ্যমান।
এই দ্বিতত্ত্ব / দ্বৈতত্ত্ব অবশ্যই শেষ হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না করে আমরা এগিয়ে যেতে পারিনা। একটি ইসলামী সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় নেতৃবৃন্দ এবং শিক্ষিত নাগরিক তৈরি না করে আমরা আমাদের সমাজগুলিতে পুরোপুরি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। এখনই সময় সমন্বিত ইসলামিক পাঠ্যক্রমগুলিকে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং আমাদের সমস্ত শিক্ষা থেকে ধর্মনিরপেক্ষ পক্ষপাতিত্বকে সরিয়ে নেওয়ার। শুধু নতুন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা এর সমাধান নয়। আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে যারা ইসলামী প্রেক্ষাপট থেকে প্রতিটি বিষয় শিখিয়ে দিতে পারবে। তবেই তা হয়ে উঠবে একটি স্মরণীয় কাজ। আর যদি আমরা এটা করতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা শিক্ষার নামে অজ্ঞতাকেই ছড়াতে থাকবো।
-এ
