শাহাদাৎ তৈয়ব :
কাশ্মীরের সাহিত্যে সবথেকে প্রবল ছিল সুফীধারার কবিতা। সম্ভবত এখনো কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক কবিতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের পর থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কবিতার ধারা। তবে রাজনৈতিক কবিতা কথাটা যতোটা নতুন মনে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি পুরনো উপনিবেশ-বিরোধী কবিতা। উপনিবেশ-বিরোধী কবিতা মূলত প্রতিরোধের কবিতা। অর্থাৎ যে উপনিবেশ-বিরোধিতায় জন্ম হয়েছে কাশ্মীরের নতুন কবিতার তা আজও দেশটিতে সব অর্থেই সক্রিয়।
আধুনিকতার ইতিহাসে তৃতীয় বিশ্বে রাজনৈতিক কবিতার সূচনা হয়েছিল মূলত উপনিবেশ-বিরোধিতার মাধ্যমে। আধুনিক রাজনৈতিক কবিতার ধারা কিংবা রাজনীতি নির্ভর সাহিত্য একটি চল হিসেবে শুরু হয় উপনিবেশ-পরবর্তী আত্মনিয়ন্ত্রণপ্রাপ্তির পর থেকে। অর্থাৎ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে আদর্শবাদ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সংকটের ফলে সৃষ্ট বিবদমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে এই ধরনের রাজনৈতিক কবিতার জন্ম।
রাজনৈতিক কবিতা যেকারণে উপমহাদেশে উপনিবেশ-বিরোধী কিংবা উপনিবেশোত্তর (পোস্ট কলনিয়াল) সাহিত্যেরই ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিস্থিতিতে উপনিবেশ-বিরোধিতার সব থেকে মোক্ষম এবং সংবেদনশীল ক্ষেত্র হলো ভাষা। যেখানে বাস্তব প্রতিরোধের পাশে ভাষা ও শিল্পমাধ্যমেও সমানতালে প্রতিরোধ সক্রিয় থাকে। প্রতিরোধ মাত্রই যখন উপনিবেশের একটি প্রাক-অনুমান, ফলে প্রতিরোধের কবিতার ইতিহাসও বেশ পুরনো; সমৃদ্ধ তো বটেই। যাইহোক, কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের মাঝে যে রোমান্টিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে তার বিপরীতে এখানে যে আজাদি বা স্বাধীনতার জন্য এতোকালের লড়াই আর ত্যাগের ইতিহাস জীবন্ত রয়েছে তা হয়তো বিস্ময়কর মনে হবে। কিন্তু ব্যাবহারিক প্রতিরোধের বাইরে কাশ্মীরিদের প্রতিরোধের সত্য যে সজীব এবং অস্তিত্বশীল রয়েছে তার বড় স্বাক্ষর হলো কবিতা-শিল্প কিংবা ভাষা ও চিন্তার সক্রিয়তা।
কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস এবং প্রতিরোধের কবিতার ইতিহাসও সমান এবং সমার্থক। উপমহাদেশে দেশভাগ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সাথে যেমন মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি এবং লড়াইয়ের ইতিহাস যুক্ত রয়েছে সেদিক থেকে কাশ্মীরের ইতিহাস এগিয়ে যায়নি। যার ফলে লড়াই এবং প্রতিরোধ-সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে পড়ে।
কাশ্মীরের আজাদি লড়াইয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তার চেয়েও দীর্ঘ তাদের প্রতিরোধের ঐতিহ্য। কিন্তু এই প্রতিরোধের চিন্তাগত ভিত্তি কী ছিল। ঐতিহাসিকভাবে একটি উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এখানে। ভারতজুড়ে যখন স্বাধীনতার জন্য তীব্র আন্দোলন চলছে, তার বাতাস কতোটা জোরে ধাক্কা দিয়েছে কাশ্মীরে তার ইতিহাস খুব একটা আলোচিত নয়। তবে ১৯৩৩ সনের একটি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করে। যে আন্দোলন শ্রমিক অধিকার থেকে শেষপর্যন্ত স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়। ঘটনাটি ঘটে ১৯২৪ সালের দিকে। অবস্থান শ্রীনগর। তাঁত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। ঠিক তাদের মাধ্যমেই ১৯৩১-এর জুলাইয়ে আরেকটি বিক্ষোভ হয় সেখানকার জমিদার শাসকশ্রেণি ডগরাদের বিরুদ্ধে। এই বিক্ষোভে কমপক্ষে ২২ জন মুসলিম নিহত হয়। এতে পুরো এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে বিক্ষোভ থেকে যে প্রতিরোধের জন্ম হয় তাতে রাজনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এ ঘটনা। যা শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সমর্থিত স্থানীয় ক্ষমতাসীন সিং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের রূপ নেয়। এর সাথে যুক্ত হন আল্লামা ইকবাল। এই প্রতিরোধের চিন্তাগত সমর্থন গড়ে তোলেন তিনি।
ইকবাল শুধু চিন্তা এবং ধারণাগত সমর্থনই দেননি, আক্রান্ত ভিকটিমদের পক্ষে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদলও নিযুক্ত করেন। যে দলটিকে পরে নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি ভিকটিমদের মুক্তির জন্য তিনি ব্রিটিশদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কও গড়ে তোলেন। ১৯৩১-এর ওই ঘটনা তদন্ত করার জন্য তিনি ব্রিটিশদের উপর চাপ সৃষ্টি করেন যাতে তারা একটি কমিশনও গঠন করে। এ কমিশনে যেসব নির্দেশনা এবং সুপারিশমালা ছিল তাতে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের স্বাধিকারের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে ইংগিত দেয়া হয়।
মোটকথা, যে ঊষালগ্নে কাশ্মীরিদের সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা ঘটে তাতে আল্লামা ইকবালের সক্রিয়তা ছিল ঐতিহাসিক। মূলত কাশ্মীরিদের জাতীয় চৈতন্য গঠনে আল্লামা ইকবালের কবিতা এবং চিন্তা ছিল অবিসংবাদিত। যেকারণে বলা হয়, কাশ্মীরের সাহিত্যে প্রতিরোধের যে ভাষা উন্মোচিত হয়েছে তার চিন্তাগত ভিত তৈরি করেছিলেন আল্লামা ইকবাল।
১৯৩১-এর ডগরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ফলাফল হিসেবে গঠিত হয়েছিল ‘অল-ইন্ডিয়া মুসলিমস অব কাশ্মীর কমিটি’। এই কমিটির অনুষ্ঠিত প্রথম কনফারেন্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন আল্লামা কবি ইকবাল। সম্মেলনে ভাষণ দেয়ার সময় ইকবাল কাশ্মীরের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “I appeal to Muslims of Kashmir to beware of the forces that are working against them and to unite their ranks. The time for two or three Muslim political parties in Kashmir has not yet come. The supreme need of the moment is a single party representing all Muslims in the state.”
অল ইন্ডিয়ার অপর এক বৈঠকে বক্তব্য দেয়ার সময় ইকবাল কাশ্মীরিদের অখণ্ড মুসলিম জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, “Kashmiris are an inseparable part of the Muslim nation, and to separate their fate from our national destiny amounts to consign the entire nation to self-destruction.” He also equated the Kashmir movement with the Khilafat movement of 1920 that “reflected the Islamic impulse in practical terms”
পয়য়ামে মাশরিক কাব্যগ্রন্থে কবি বলেন,
Tanam Gulai Zi khayanban-e-Janat-e-Kashmir,
Dil Az Hareemi Hejaze Nawa Ze Sheeraz Ast!
কাশ্মীরের নিসর্গ থেকে উঠে আসে আমার শরীর
তবে আমার হৃদয় হিজাজের পবিত্র মাটি আঁকড়ে আছে,
আর আমার সংগীত ধারণ করে শিরাজের সুর।
aj Woh Kashmir Hai Mehkoom-O-Majboor-O-Faqeer
Kal Jise Ahl-E-Nazar Kehte Thay Iran-E-Sagheer
আজ যে কাশ্মীর শত্রুকবলিত, দরিদ্র, দুর্বল, সহযোগিতাহীন
সেই কাশ্মীর একদিন জ্ঞানীদের মাঝে ছিল ছোট্ট ইরান
কাশ্মীরের প্রতিরোধ কবিতার যে বীজ উদ্গত হয়েছিল আল্লামা ইকবালের সক্রিয় তৎপরতায় তা এখনো অব্যাহত আছে। ইকবাল-পরবর্তী কাশ্মীরের সাহিত্যের ইতিহাসে দেশপ্রেম এবং মুক্তিকামী কবিতা আর প্রতিরোধের ভাষা অনেকদূর নিয়ে গেছেন আগা শাহিদ আলী। শাহিদ আলীর কবিতায় কাশ্মীরের মুক্তির কণ্ঠ আন্তর্জাতিকতা পেয়েছে আলবৎ। কাশ্মীরের সাহিত্যে প্রতিরোধের রাজনীতি যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তা আরো সমৃদ্ধ করেছেন সমকালের আরো অনেক কবি-সাহিত্যিক। তাঁদের কবিতা আর মুক্তিকামী মানুষের মন যেখানে এক হয়ে গেছে। আর তা-ই হলো কাশ্মীর। এবং কাশ্মীরের জাতিসত্তা।
