
মুফতী ফয়জুল্লাহ
পিতার উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমানাধিকার নিশ্চিত করা না-করা নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনা উঠেছে। একপক্ষ বলার চেষ্টা করছেন, শরিয়াহ আইনের দিকে না গিয়ে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমানাধিকার নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন করা হোক। এতে নারীর অধিকার সুরক্ষিত হবে। তাদের এসব কথার দ্বারা বোঝা যায়, ইসলাম বা শরিয়াহ আইনে নারীর অধিকার সুরক্ষিত নেই।
অথচ ইসলাম সর্বদা নারীউন্নয়ন ও নারীঅধিকারের পক্ষে। নারীনির্যাতনের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বের নির্যাতিত, নিগৃহীত, মজলুম নারীর পক্ষে ইসলামই সর্বাগ্রে আওয়াজ বুলন্দ করেছে। জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার আবহ থেকে, পণ্য হিসাবে বাজারে বিক্রি হওয়ার পরিবেশ থেকে উঠিয়ে এনে নারীকে সম্মানের রাজাসনে ইসলামই সর্বপ্রথম আসীন করেছে। সমস্ত জটিলতা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রেখে নারীকে দান করেছে টেনশনমুক্ত হাস্যোজ্বল এক আনন্দময় জীবন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ‘নিসা’ অর্থাৎ ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ‘নিসা’ তথা ‘মহিলা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র বৃহৎ সুরাও রয়েছে। এ ছাড়া কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। দিয়েছে নারীর জান-মালের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান।
ইসলামে নারীর কর্ম, শিক্ষা, মালিকানা ও মতামতের অধিকার অত্যন্ত স্পষ্ট ও শক্তিশালী। প্রসিদ্ধ ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে এমন অবস্থান পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক কালে যদিও অনেক দর্শন ও ব্যবস্থা নারীর অধিকারের দাবি করে, তবে প্রকৃত বিচারে ইসলাম ছাড়া কেউ পরিপূর্ণ অধিকার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম নয়।
তাই উত্তরাধিকারের সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করার চিন্তা না করে, আমাদের শরিয়া আইনে দেয়া তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করলে নারীরা বাবার সম্পত্তিতে ছেলের অর্ধেক পেলেও সবমিলিয়ে সে ছেলের চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হতে পারবে। এবং তাঁর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাই প্রথমত আমার আহ্বান থাকবে, একজন নারীকে শরিয়াহ আইন অনুযায়ী বিভিন্ন সূত্রে যতটা সম্পদ দেওয়া হয়, সেটা আমাদের দেশের আইনে প্রয়োগ করা হোক। তাহলে বাবার সম্পত্তিতে ছেলের অর্ধেক পেয়েও একজন নারী ছেলের চেয়েও বেশি সম্পদের মালিক হতে পারবে, এবং তাঁর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
নারীর মালিকানা তার পিতা ও স্বামীর মালিকানা থেকে আলাদা। তার মালিকানার সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার একমাত্র তার। স্বামী বা বাবা এখান থেকে খরচ করার কোনো অধিকার রাখেন না। বরং বিয়ের আগে বাবা এবং বিয়ের পর স্বামীকেই নারীর সমস্ত খরচের ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হয়। তারা নারীর খরচ নির্বাহ করতে বাধ্য, নয়তো আইনিভাবে দোষী সাব্যস্ত হবে। পক্ষান্তরে নারী খরচ নির্বাহ করার জন্য বাধ্য নন। পিতা ও স্বামীর মালিকানার মধ্যে নাবালেগ সন্তান ও স্ত্রীর আইনি ভাগ আছে। এ কারণেই ইসলামে মালিকানাব্যবস্থায় নারীকে ছেলের অর্ধেক দেবার বিধান এসেছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, পুরুষের ভাগে নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব রয়েছে, অপরদিকে নারীকে কিন্তু কারও খরচ বহন করার দায়িত্ব দেয়নি শরিয়াহ।
মোটকথা, ছেলে বাবার সম্পত্তি থেকে মেয়ের দ্বিগুণ পেলেও তার ওপর শরিয়াহ আইন খরচের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। উপরন্তু স্বামীর কাছ থেকে মোহরানা বাবৎ আরও সম্পত্তি পাচ্ছে সে। সেখানেও তার কোনো খরচ নেই। বিয়ের পর তার যাবতীয় ব্যয়ভার স্বামীর ওপরই বর্তাবে। আবার বিয়ের আগের যাবতীয় ব্যয়ভার বাবা কিংবা ভাইয়ের ওপর অর্পিত। এমনকি নারীকে নিজের অর্থনৈতিক দায়িত্বও বহন করতে হয় না।
তাই, বাহ্যিকভাবে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে দ্বিগুণ পেলেও বাস্তবে কিন্তু সেই দ্বিগুণ সম্পত্তি তার থাকছে না। এটা শরিয়াহ আইনের কথা বললাম। কিন্তু আমাদের সমাজে শরিয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত এসব সোর্সে নারীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার পায় না। স্বামী মোটা অংকের মোহর লেখে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আদায় করে না। বাবার সম্পত্তি ভাইয়েরাই বণ্টন করে নিয়ে যায়, বোনকে তাঁর প্রাপ্য হিসসাটুকু দেয় না। যার কারণে নারীরা নিগৃহীত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে।
এ জন্য আমি বলব, বাবার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমানাধিকারের আইন করার আগে, যে আইন প্রচলিত আছে, সেটাকে কার্যকর করুন। বাবার সম্পত্তি সমাজের একটি অংশের ছেলেরা যেভাবে একা ভোগ করে খায়, স্বামীরা মোহরানার টাকা স্ত্রীকে মাফ করে দিতে যেভাবে বাধ্য করে—এইসব ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হোক, তখন একদিকে নারীরা যেমন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভ করবে, অপরদিকে বঞ্চনার হাত থেকেও তারা রক্ষা পাবে। তখন আর বাবার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমানাধিকারের দরকার পড়বে না। মেয়ে যা পেয়েছে, তা নিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে তার জীবন পার করতে পারবে এবং সে সন্তুষ্ট থাকবে।
মুফতী ফয়জুল্লাহ : মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট; যুগ্ম মহাসচিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
