
(ভারতের চলমান নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছেন সকলেই। বিশেষত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আইনত সেক্যুলার রাষ্ট্র হলেও কার্যত বহুবিধ সাম্প্রদায়িকতার নজির সেখানে বিদ্যমান৷ সংখ্যালঘু হিসেবে নানা অজুহাতে মুসলিমদের হতে হয় নিগ্রহের শিকার৷ ভারতের নির্বাচন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অবস্থা ও মুসলিম স্বার্থ নিয়ে ফাতেহের সঙ্গে কথা বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের সমাজকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ জিম নওয়াজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাগিব রব্বানি।)
পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে?
পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা আপাতত সম্পূর্ণই সুরক্ষিত রয়েছে। এখন অবধি বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বিঘ্নেই নিজের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন। সেভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় না।
শিক্ষা-দীক্ষায় তাঁদের আগ্রহ এবং অগ্রগামিতা কতটুকু?
১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল শিক্ষিত বাঙালি মুসলিমরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান। পশ্চিমবাংলায় যারা রয়ে যান তাদের অধিকাংশই প্রান্তিক গরীব মানুষ। আর্থসামাজিক কারণে প্রান্তিক গরীব মুসলিমরা শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে ছিলেন, এখনো রয়েছেন। মুসলিমদের প্রতি সরকারের উদাসীনতাও এজন্য কম দায়ী নয়। সব সরকার বা সব রাজনৈতিক দলই ভোট পেতে মুসলমদের প্রতি মেকি সহানুভূতি দেখিয়ে এসেছে। এদের লেঠেলবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ২০০৫ সালে প্রকাশিত জাস্টিস সাচ্চার কমিটির রিপোর্টে মুসলিম অনুন্নয়নের ভয়ানক চিত্র ফুটে ওঠে। রিপোর্টে দেখা যায়, দীর্ঘ বাম শাসনে কিছুকিছু ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবস্থা আদিবাসী, দলিতদের থেকেও খারাপ।
অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ধীরেধীরে তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনগুলিতে উল্লেখযোগ্যহারে বাড়ছে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে মহান শিক্ষাব্রতী নুরুল ইসলাম সাহেব-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আবাসিক শিক্ষাঙ্গন আল আমিন মিশন মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিপ্লব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আজ সারা বাংলায় আল আমিন মিশনের ৭০টি শাখা গড়ে উঠেছে। এবং আল আমিনের অনুকরণে ২০০টিরও বেশি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এগুলি থেকে শতশত মুসলিম ছেলেমেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, গবেষক হচ্ছেন। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেশভাগের আগে যেভাবে মধ্যবিত্ত মুসলিম বাঙালির উত্থান শুরু হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম সমাজব্যবস্থার অগ্রগামিতার দিকনির্দেশনা সেদিকেই। তবে এও ঠিক যে, মুসলিম সমাজের অগ্রগতি, উত্থানের সাথে মুসলিম বিদ্বেষের হার সমানুপাতিক। এবং এই সময়ে এই বাংলায় সেটা খুব ভালোভাবেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মুসলিমদের মধ্যে সেখানে পারস্পরিক ঐক্য কতটা সুদৃঢ়?
সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের ঐক্য প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমবাংলার মুসলিমদের একটি বড় অংশ প্রথমশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলির তাবেদারি করে চলে। আর রাজনৈতিক দলগুলিও এদের দলীয় লেঠেলবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। সেকারণে প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই দেখা যায়, রাজনৈতিক কোন্দলে মৃতদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত।
অন্যদিকে নিজ সস্প্রদায়ের সংবিধানসম্মত ন্যায্য অধিকার আদায়, বঞ্চনা, শোষণের বিরুদ্ধে মুসলিমদের তেমনভাবে কখনই একত্রিত হয়ে লড়াই করতে দেখা যায় না। আসলে এ বিষয়গুলি নিয়ে মুসলিমরা সেভাবে সচেতন নয়। তথাকথিত মুসলিম নেতা, আলেম-উলেমা বা শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত বাঙালি মুসলিমদের পক্ষ থেকে অসেচতন মুসলিমদের সচেতন করতে সেই অর্থে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এটা অত্যন্ত হতাশার।
চলমান নির্বাচনের পরিস্থিতি কী? মুসলমানরা প্রধানত কোন দলকে সমর্থন করছে?
এবারের লোকসভা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে। বিজেপি পুনরায় ক্ষমতা দখল করলে, দেশের সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রও ঘোষণা করতে পারে। মুসলিম, দলিত, আদিবাসীদের অধিকার খর্ব করা হবে।
তবে ভারতের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম সরাসরি মুসলিম-বিদ্বেষী রাজনৈতিক দল বিজেপির হয়ে প্রচার করলেও এবারে তাদের পক্ষে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল শক্ত। গত পাঁচ বছরের অপশাসনে দেশের মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ২০১৪ সালে ক্ষমতা দখলের আগে বিজেপি যেসমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার একটিও পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই বিজেপি সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাই শুধুমাত্র ব্যাপকভাবে মুসলিম-বিদ্বেষ প্রচারণার মাধ্যমে বিজেপির পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনা কঠিন হবে।
ভারতের মুসলিমরা নিজেদের সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেবে। এক্ষেত্রে তারা বিজেপি-বিরোধী শক্তিশালী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস বা রাজ্যভিত্তিক শক্তিশালী আঞ্চলিক দলকেই ভোট দেবে বলে আমার ধারণা।
পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে চিত্রটা একটু ভিন্ন। দক্ষিণ বাংলার ক্ষেত্রে মুসলিমদের বেশিরভাগ ভোট মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূলের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মুর্শিদাবাদসহ উত্তর বাংলার ক্ষেত্রে তৃণমূল, জাতীয় কংগ্রেস এবং সিপিএম তথা বামদলগুলির মধ্যে বিভাজনের সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য সার্বিকভাবে বাংলার অধিকাংশ আসন তৃণমূলের পক্ষেই যাবে।
তবে এই নির্বাচনে বাংলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বামপন্থিদের পেছনে ফেলে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সাম্প্রদায়িক বিজেপির উত্থানের সম্ভাবনা। এবারের লোকসভা নির্বাচনে হয়তো তারা দু’চারটে আসন পাবে, কিন্তু ভোটের শতাংশ তারা ব্যাপকভাবে বাড়াতে পারে। বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিজেপির এই শক্তিবৃদ্ধি অত্যন্ত আশঙ্কার।
ভোটে বিজেপি কর্তৃক জালিয়াতির অভিযোগ আসছে, বাস্তবতা কী?
না, ব্যাপকভাবে কারচুপির খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের নির্বাচন কমিশন অনেকটাই সক্রিয় এবং নিরপেক্ষ।ভারতের নির্বাচন কমিশন শুধু খাতায় কলমে নয়, কাজেকামেও স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। তবে বিরোধীদের পক্ষ থেকে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে জালিয়াতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে তারা দাবি তুলেছিল, ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালট পেপারে ভোট করার। যদিও নির্বাচন কমিশন সেই দাবি মানেনি। আমার মনে হয়, ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে ব্যাপককিছু জালিয়াতি করার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তবে সারা ভারতের ক্ষেত্রে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোটের মাধ্যমে ভোট জালিয়াতি হওয়ার সম্ভাবনা তেমন একটা নেই।
প্রশাসন কি বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে?
প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। অবশ্য আগের তুলনায় এবারে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতায় কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন, বিজেপির নেতারা নির্বাচনী সভা-সমিতিতে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সামান্য পক্ষপাতিত্ব দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশাসন সরাসরি বিজেপির পক্ষ নিয়ে বুথ দখল করে ছাপ্পা ভোটে সহায়তা করবে, সেই সম্ভাবনা নেই। কিংবা ভোটের আগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর ঢালাও মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে জেলে ভরার ঘটনাও খুব একটা দেখা যায় না, দেখা যাচ্ছে না।
সমগ্র ভারত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে মুসলিমদের জন্য আলাদা করে ভেবে দেখার সুযোগ আছে?
ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের উপর যেভাবে নির্যাতন হয়, বাকস্বাধীনতা যেভাবে হরণ করা হয়–পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে আপাতত সেই সমস্যা নেই। তবে বাংলাতেও যেভাবে সাম্প্রদায়িক বিজেপির উত্থান হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মুসলিমদের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বরং সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাংলায় বিজেপির উত্থানের অন্যতম কারণ, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের অন্তরে ঐতিহাসিকভাবে পালিত সুপ্ত মুসলিম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সাথে সাথে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একটি অংশের ভেতর মুসলিম বিদ্বেষের পরিমাণ বাড়ছে। অবশ্য বাংলা এবং বাংলার মুসলিমদের ভবিষ্যৎ কোন খাতে বইবে তার সবকিছুই নির্ভর করছে এবার নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দল কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করবে তার উপর। বিজেপি যদি আবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ফেরে, তাহলে তৃণমূলসহ অন্যান্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি দুর্বল হয়ে পড়বে। এমনকি পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কর্তৃক বাংলার ক্ষমতা দখল করার পথ প্রশস্ত হবে। এমনটা হলে, মুসলিমদের শুরু হওয়া এবং চলমান আর্থসামাজিক উত্থান ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের লড়াই শুরু করতে হবে নিজের প্রাণ এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। অবশ্য সবকিছুই নির্ভর করছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করা, না করার উপর।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এই মুহূর্তে বাংলার মুসলিমদের উচিৎ নিজেদের শিক্ষাদীক্ষার মানোন্নয়নের সাথে সাথে সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি। এজন্য দরকার জোটবদ্ধ হয়ে শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কর্তৃক সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। একইসাথে দরকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অন্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে বসে থাকা মুসলিম বিদ্বেষের প্রশমন ঘটানো। লুটেরা ইংরেজ এবং তাদের তাবেদার ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা নির্মিত মুসলিম বিদ্বেষী বিকৃত ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য এবং মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে যেমন মুসলিমদের আত্মবিস্মৃত করা হয়েছে, তেমনি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনে বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হয়েছে। আজকের দিনে ভারত তথা বাংলার বুকে এই যে বিষাক্ত আবহাওয়া, আম সংখ্যাগুরুর মনে যে মুসলিম বিদ্বেষ- এর একটা বড় কারণ এই বানানো বিকৃত প্রচারণা। তাই এখন সময়ের দাবি অনুযায়ী দরকার ইতিহাসের পাল্টা আখ্যান গড়ে তোলা। কয়েক শতক ধরে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ ব্রাহ্মণ্যবাদী মিথ-মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিকল্প ভাষ্য বিনির্মাণ। এই কাজ অনেক দীর্ঘমেয়াদি, অনেক পরিশ্রমসাধ্য। কিন্তু এই কাজ বাংলার শিক্ষিত মুসলিমদের করতেই হবে।
