ফাতেহ ডেস্ক :
২০০৯-১৮ অর্থবছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে (ইফা) প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ‘নয়ছয়’ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের সরাসরি ক্ষতি হয়েছে ৩৭২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৭ টাকা এবং বিধিবহির্ভূতভাবে খরচ করা হয়েছে ৫১৮ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৮ টাকা। ১৮৬ পৃষ্ঠার প্রাথমিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ১৩৪টি খাতে অনিয়মের চিত্র এসেছে।
সিভিল অডিট অধিদফতরের বিশেষ নিরীক্ষা দলের ২০০৯-২০১৮ অর্থবছরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। চলতি বছরের ৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত এই নিরীক্ষা চলে।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালের মেয়াদকালে (প্রায় ১০ বছর) এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে। ইফার কাছে এসব অনিয়মের জবাব চেয়েছে নিরীক্ষা দল।
যে সব খাতে অনিয়ম : বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এমন খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল : আর্থিক বছরের শেষদিনে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে ৬৪ জেলায় অর্থ ছাড় করা হয় ৩১ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার ২২০ টাকা; যা অনিয়ম। আর্থিক বছর শেষে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে না দেয়ায় ক্ষতি ১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭৩ টাকা।
গণশিক্ষা কেন্দ্রের জন্য পাঠ্যবই মুদ্রণে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০ কোটি ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৭ টাকা এবং কোরআনুল কারিম মুদ্রণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অতিরিক্ত মূল্যে কার্যাদেশ দেয়ায় ১২ কোটি ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৪১৭ টাকা ক্ষতি হয়েছে। কার্যাদেশের পরিমাণের চেয়ে কম কোরআন শরিফ নেয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা। বোগদাদিয়া কায়দায় ক্ষতি এক কোটি টাকা। জিওবির বরাদ্দের অব্যয়িত টাকা জমা না দেয়ায় ২২ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার ৫০৯ টাকা ও সিপিটিইউর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন ছাড়াই বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানকে ১৬ কোটি ৩০ লাখ ১০০ টাকা দেয়া হয়।
অব্যয়িত পুঞ্জীভূত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ায় ক্ষতি ৯৯ কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৭৪৪ টাকা। প্রকল্পের অব্যয়িত টাকা ইফার স্থায়ী ফান্ডে আমানত করায় সরকারের ক্ষতি ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ ৭ হাজার ৫৬৩ টাকা, বিধিবহির্ভূত ৪৭ জনকে প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেয়ায় ক্ষতি ১৩ কোটি ১৭ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬০ টাকা। একইভাবে আরও ১৬৭ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়ায় ক্ষতি প্রায় ৮ কোটি টাকা।
দৈনিকভিত্তিক কর্মচারীদের রাজস্ব পদে স্কেলভিত্তিক নিয়োগ দেয়ায় ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৫০ হাজার ৯৯৮ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে বরাদ্দের টাকা রেখে দেয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন খাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৫১৮ কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বাজে বরাদ্দেও অতিরিক্ত ১৩৭ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার ৮৫৭ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ইফার পেনশন ফান্ডে ১৪১ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্য একটি খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
ডিপিপিতে বরাদ্দের চেয়ে জেলা অফিসগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করা হয়েছে ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ডিপিপির অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে ২৬ কোটি ১৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। আর্থিক ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রেসের কাঁচামাল কেনা হয়েছে ৪৫ কোটি ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৬ টাকা, বিধি লঙ্ঘন করে দৈনিকভিত্তিক কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
ইফার নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস থাকার পরও বাইরের প্রেস থেকে প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি ছাপানোয় ৩৬ কোটি ৫৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণার অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সিডি ভ্যাটের অব্যয়িত দেড় কোটি টাকাও জমা দেয়া হয়নি। বায়তুল মোকাররমের দোকান ভাড়ার ২ কোটি ৬১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা অনাদায়ী রয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া ৩ কর্মকর্তাকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়ায় পরিশোধ করতে হয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।
অগ্রিম পরিশোধ করা প্রায় দেড় কোটি টাকা সমন্বয় করা হয়নি। এ ছাড়া ক্রয়সীমার বাইরে খরচ করা হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। প্রাধিকারবহির্ভূত একটি ব্যাংকে রাখা হয়েছে ২৯ কোটি ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ টাকা। বিধিবহির্ভূতভাবে একটি প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজারদের বেতন-ভাতাদি দেয়া হয়েছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা। অনুশীলন ও ড্রয়িং খাতা মুদ্রণ বাবদ অব্যয়িত প্রায় ৬ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ইফা ডিজির ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তলব করে। গত জুন মাসে অনিয়মের অভিযোগে ধর্ম মন্ত্রণালয় ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তার অনিয়মের বিষয় আলোচনায় আসে। ওই শোকজ নোটিশেও অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলে ঊর্র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানোর বিষয় স্থান পায়। পরে অবশ্য ইফা বোর্ড কিছুটা নমনীয় হয় এবং ডিজির কিছু ক্ষমতা কমিয়ে তার চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৯ সাল থেকে ইফার ডিজির দায়িত্ব পালন করে আসছেন বিচার বিভাগের কর্মকর্তা সামীম মোহাম্মদ আফজাল। এ সময়ে দুই দফা তাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়।
